পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহে যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যেই ভারতে সার উৎপাদন ও শিল্পখাতে কিছুটা স্বস্তি ফেরাতে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। সার কারখানাগুলোর জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস বরাদ্দ বাড়িয়ে চাহিদার পঁচানব্বই শতাংশে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি, ওষুধ, রং, সিরামিক, ঢালাইশিল্প ও কাচসহ আরও কয়েকটি খাতে বাণিজ্যিক তরল গ্যাস সরবরাহের অনুমতিও বাড়ানো হয়েছে। ফলে জ্বালানি সংকট সামাল দিয়ে উৎপাদন সচল রাখার একটি স্পষ্ট সরকারি উদ্যোগ সামনে এল।
জ্বালানি নীতিতে দ্রুত পরিবর্তন
সরকারি পর্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে সার খাতের জন্য এটি দ্বিতীয় বড় বরাদ্দ বৃদ্ধি। এর আগে কয়েক দিনের মধ্যেই এই খাতে গ্যাস সরবরাহ প্রায় সত্তর শতাংশ থেকে নব্বই শতাংশে উন্নীত করা হয়েছিল। এবার তা আরও বাড়িয়ে পঁচানব্বই শতাংশ করা হলো। এতে বোঝা যাচ্ছে, কৃষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এই খাতকে সচল রাখা এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।

সার উৎপাদনে গ্যাস কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
সার কারখানায় প্রাকৃতিক গ্যাসের ভূমিকা শুধু জ্বালানি হিসেবে নয়, কাঁচামাল হিসেবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে সরাসরি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেই দিক থেকে এই বাড়তি বরাদ্দ শুধু শিল্পখাতের সিদ্ধান্ত নয়, কৃষি প্রস্তুতি, খাদ্য উৎপাদন এবং বাজার স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সামনে চাষের মৌসুম মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্তকে তাই বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই দেখা হচ্ছে।
কোন কোন খাতে মিলল বাড়তি সুযোগ
নতুন সিদ্ধান্তে বাণিজ্যিক তরল গ্যাস সরবরাহের আওতা আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। কৃষির পাশাপাশি ওষুধশিল্প, রং, সিরামিক, ঢালাইশিল্প, কাচ, ভারী পানি ও ইউরেনিয়াম সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রও এই সুবিধার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে এসব খাতের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর আগে ধাপে ধাপে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল, খাবারের দোকান, ক্যানটিন, কমিউনিটি রান্নাঘর, ইস্পাত, গাড়ি, বস্ত্র, রাসায়নিক ও প্লাস্টিক খাতেও সরবরাহ বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এবার সেই তালিকা আরও দীর্ঘ হলো।
গৃহস্থালি চাহিদার পর শিল্পে স্বস্তি
সরকার শুরুতে গৃহস্থালি গ্রাহকদের চাহিদা পূরণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। বিপুলসংখ্যক পরিবারের রান্নার গ্যাস সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয়, সে কারণেই বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য সরবরাহে কাটছাঁট করা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি কিছুটা সামলে ওঠার পর ধাপে ধাপে শিল্প ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সরবরাহ আবার বাড়ানো হচ্ছে। এই নীতির মধ্যেই স্পষ্ট, সরকার একদিকে সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটাতে চাইছে, অন্যদিকে উৎপাদনশীল খাতেও স্থবিরতা ঠেকাতে চাইছে।
শ্রমজীবী মানুষের দিকেও নজর
ছোট আকারের পাঁচ কেজির মুক্তবাজার তরল গ্যাস সিলিন্ডারের সরবরাহও বাড়ানো হয়েছে। এই সিলিন্ডারগুলো মূলত অভিবাসী ও স্বল্পআয়ের শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বেশি ব্যবহৃত হয়। শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় এই সিলিন্ডারের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ছিল। এমন পরিস্থিতিতে ছোট সিলিন্ডারের সরবরাহ জোরদার করার সিদ্ধান্ত শ্রমবাজারে স্থিতি ফেরাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে শিল্পাঞ্চলগুলোর দৈনন্দিন কর্মচাঞ্চল্য ধরে রাখার একটি বাস্তব প্রয়োজনও পূরণ হচ্ছে।

যুদ্ধের ধাক্কা থেকে স্বস্তির ইঙ্গিত
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত শুরুর পর জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ পড়ে। ভারত যে পরিমাণ তরল গ্যাস আমদানি করে, তার একটি বড় অংশই আসে ওই অঞ্চল থেকে। ফলে সংঘাতের অভিঘাত বাজারে দ্রুত পড়ে এবং জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতি উদ্বেগ বাড়ায়। তবে সাময়িক যুদ্ধবিরতির খবর সামনে আসার পর বাজারে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছে। তেলের আন্তর্জাতিক দামেও তার প্রভাব দেখা গেছে। এতে সরবরাহ শৃঙ্খল কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
কৃষি, শিল্প ও বাজারে কী বার্তা
এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো, সরকার এখন জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে কেবল ভোক্তা পর্যায়ের সংকট হিসেবে দেখছে না; বরং কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের ধারাবাহিকতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত করে দেখছে। সার উৎপাদন সচল থাকলে কৃষিখাত উপকৃত হবে। একই সঙ্গে যেসব শিল্প খাত জ্বালানি সংকটে গতি হারিয়েছিল, তারাও কিছুটা স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারবে। অর্থাৎ এই উদ্যোগের প্রভাব শুধু কারখানার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর প্রতিফলন বাজার, কর্মসংস্থান এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও পড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















