মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউয়ানে লেনদেনের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি চীনের সীমান্তপারের পেমেন্ট ব্যবস্থা সিআইপিএস-এ রেকর্ড পরিমাণ লেনদেনের অন্যতম বড় কারণ। দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক বিস্তারের যে প্রচেষ্টা বেইজিং চালিয়ে আসছিল, বর্তমান সংকট সেই প্রক্রিয়াকে আরও গতি দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকট কেন প্রভাব ফেলছে
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বৃহত্তর চীন ও উত্তর এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ডিং শুয়াং মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এক ধরনের অনুঘটকের কাজ করেছে। বিশেষ করে তেলবাণিজ্যে ইউয়ানে নিষ্পত্তির আগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তার মতে, শুধু ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাই নয়, ইউয়ানের তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থান, সীমান্তপারের পেমেন্ট অবকাঠামোয় চীনের বিনিয়োগ এবং সিআইপিএস-এ অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধিও এই উল্লম্ফনের পেছনে কাজ করেছে।
রেকর্ড গড়ল সিআইপিএস
চীনের সীমান্তপারের আন্তঃব্যাংক পেমেন্ট ব্যবস্থা সিআইপিএস সম্প্রতি এক দিনে ১ দশমিক ২২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান সমমূল্যের লেনদেন প্রক্রিয়া করেছে। একই দিনে প্রায় ৪২ হাজার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
এর আগে মার্চ মাসেও এই ব্যবস্থায় গড় দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে। ওই মাসে গড় দৈনিক লেনদেনের মূল্য দাঁড়ায় ৯২০ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ইউয়ান, যা ফেব্রুয়ারির ৬১৯ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ইউয়ানের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। একই সময়ে দৈনিক গড় লেনদেনসংখ্যাও ২৫ হাজার ৯৩০ থেকে বেড়ে ৩৫ হাজার ৭৪০-এ পৌঁছায়।

ইউয়ানের অবস্থান কেন শক্ত হচ্ছে
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউয়ান ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরের লেনদেনে অফশোর ইউয়ানের দর ছিল প্রতি ডলারে প্রায় ৬ দশমিক ৮৩৪ ইউয়ান। অর্থাৎ এক ডলার কিনতে আগের তুলনায় কম ইউয়ান লাগছে, যা চীনা মুদ্রার শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, কোনো মুদ্রার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে শুধু রাজনৈতিক ইচ্ছা যথেষ্ট নয়, শক্তিশালী লেনদেন অবকাঠামোও প্রয়োজন। সেই জায়গায় চীন ধীরে ধীরে নিজের ভিত্তি মজবুত করেছে। ফলে কোনো বড় বৈশ্বিক সংকট দেখা দিলে ইউয়ানের ব্যবহার দ্রুত বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
নেটওয়ার্ক যত বড়, প্রভাবও তত বেশি
ডিং শুয়াংয়ের মতে, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কও বিস্তৃত হয়। একবার অবকাঠামো দাঁড়িয়ে গেলে, পরে কোনো অনুঘটক দেখা দিলে প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
সিআইপিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৬৬। এই নেটওয়ার্ক ১৯০টি দেশ ও অঞ্চলে বিস্তৃত। ২০২০ সালের শেষে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯২। অর্থাৎ পাঁচ বছরে এর পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ডলারনির্ভরতা কমানোর কৌশল
বেইজিং অনেক দিন ধরেই ডলারনির্ভর আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থার বিকল্প গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং ডলারকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা চীনের এই তৎপরতাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে সিআইপিএসকে শুধু ইউয়ানভিত্তিক লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নয়, আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার চিন্তা করছে চীন। সম্প্রতি আট বছর পর সিআইপিএসের ব্যবসায়িক নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে যেখানে মূল জোর ছিল ইউয়ানভিত্তিক অর্থপ্রদানে, এখন বিশ্লেষকেরা বলছেন, বেইজিং একে বহু-মুদ্রাভিত্তিক বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করার দিকে এগোচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদে কী হতে পারে
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ শু থিয়ানছেন মনে করেন, বিশ্বের অন্য কিছু অঞ্চলে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় চীনকেন্দ্রিক বাণিজ্য বেড়েছে, আর সেটিও সিআইপিএস লেনদেন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে ইউয়ানভিত্তিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক যত বিস্তৃত হবে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইউয়ানের গ্রহণযোগ্যতাও তত বাড়বে।
সারসংক্ষেপ
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা চীনের ইউয়ানভিত্তিক সীমান্তপারের লেনদেন ব্যবস্থাকে নতুন গতি দিয়েছে। তবে এটিকে শুধু তাৎক্ষণিক সংকটের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। বরং এটি দেখাচ্ছে, বহু বছর ধরে তৈরি করা আর্থিক অবকাঠামো, অংশগ্রহণকারী নেটওয়ার্কের বিস্তার এবং ডলারনির্ভরতা কমানোর কৌশল এখন বাস্তব ফল দিতে শুরু করেছে। ইউয়ানের আন্তর্জাতিক যাত্রায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















