বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর টোল আরোপ করা হবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অচলাবস্থা এখনও কাটেনি। এর মধ্যেই চীনের কিছু বিশেষজ্ঞ নতুন ধরনের সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের মতে, টোলের হার তেলের দামের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে, অথবা চীন থেকে রপ্তানিযোগ্য ডিজিটাল টোকেন ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী হামলা সাময়িকভাবে থেমে যাওয়ার পর এই প্রণালিকে ঘিরে কৌশলগত আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। চীনের রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের পরিচালক ওয়াং ইওয়ে বলেছেন, যদি হরমুজে টোল চালু করতেই হয়, তাহলে নিষ্পত্তির পদ্ধতিও হতে পারে নতুন ও আলাদা ধরনের। তার ভাষায়, এখানে তেলের দাম, ডলার, নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
টোল প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপকে একটি যৌথ উদ্যোগ হিসেবে ভাবা হচ্ছে। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি উপায় হতে পারে। তার মতে, এই ব্যবস্থায় শুধু প্রণালির নিরাপত্তাই নয়, অন্য পক্ষগুলোর প্রভাবও সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
তবে এই ধারণা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একমত হওয়ার কোনো লক্ষণ এখনও নেই। বিশেষ করে ওমান, যে দেশটি ইরানের সঙ্গে মিলে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ভাগ করে নেয়, তাদের পরিবহনমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, ওমান এ পথে চলাচলকারী জাহাজের ওপর কোনো ফি আরোপ করবে না।

ইরানের হাতে শেষ চাপের কৌশল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা এখনও টানাপোড়েনপূর্ণ। বুধবার তেহরান আবারও অধিকাংশ আন্তর্জাতিক জাহাজের জন্য প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। ওয়াং ইওয়ের মতে, প্রণালিটি খোলা বা বন্ধ রাখার প্রশ্নটি এখন কার্যত ইরানের হাতে থাকা শেষ বড় কৌশলগত চাপের উপায়। তার ব্যাখ্যা, হরমুজ খুলে দিলে যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি চাপ কমে যাবে, আর তখন ইরানের দর-কষাকষির শক্তিও অনেকটা হ্রাস পাবে।
তিনি আরও বলেন, এই পুরো প্রক্রিয়ায় বেইজিং সরাসরি নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার বদলে মধ্যস্থতাকারী বা সেতুবন্ধনের ভূমিকায় থাকতে পারে। তার মতে, সামনে ট্রাম্পের সফর এবং জুনে চীন-আরব শীর্ষ সম্মেলন থাকায় বেইজিং এমন একটি পথ খুঁজছে, যাতে একদিকে ট্রাম্পের জন্য বের হওয়ার রাস্তা থাকে, অন্যদিকে ইরানও অতিরিক্ত ঝুঁকির পথে না যায়।
নিরাপত্তাই আসল শর্ত
ওয়াংয়ের মতে, তেহরান আবার জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করবে কি না, তা মূলত নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক চাপ বজায় রাখবে কি না তার ওপর। তার ভাষায়, আসল প্রশ্ন টোল নয়, আসল প্রশ্ন নিরাপত্তা পরিস্থিতি।
তিনি আরও একটি দীর্ঘমেয়াদি ধারণার কথা বলেছেন। তার মতে, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিকে বৈশ্বিক জনস্বার্থের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এমনকি এটি দেখভালের জন্য একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের কথাও তিনি তুলেছেন, যাতে কোনো একক দেশ একে ইচ্ছামতো বন্ধ করতে না পারে। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা ছাড়া এমন পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত হবে না।

দীর্ঘমেয়াদি টোল ব্যবস্থার বিপক্ষে মত
চীনের জ্বালানি নীতি গবেষক লিন বোকিয়াং অবশ্য মনে করেন, হরমুজ প্রণালিতে স্থায়ী ও আনুষ্ঠানিক টোল ব্যবস্থা টেকসই হবে না। তার যুক্তি, এটি একটি প্রাকৃতিকভাবে গঠিত নৌপথ। যুদ্ধকালীন সময়ে কিছু অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়ে শান্তি ফিরলে নিয়মিত টোলকে বিশ্ব সহজে মেনে নেবে না।
তার মতে, ভবিষ্যতে জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকলেও সেটি সম্ভবত প্রকাশ্য নির্ধারিত ফি কাঠামোর মাধ্যমে নয়, বরং কূটনৈতিক সমঝোতা, অনানুষ্ঠানিক সমাধান বা অস্থায়ী ব্যবস্থার মাধ্যমেই চলবে।
হরমুজ পুরোপুরি খোলা নয়, আবার পুরোপুরি বন্ধও নয়
চীনের আরেক বিশেষজ্ঞ কিন থিয়ান বলেছেন, হরমুজের বর্তমান অবস্থা পুরোপুরি বন্ধ বা পুরোপুরি খোলা— কোনোটিই নয়। বরং ইরান এখানে একটি নমনীয় ধূসর অবস্থা ধরে রেখেছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি ও দর-কষাকষির ধাপ অনুযায়ী তেহরান কখনও চলাচল সংকুচিত করতে পারে, আবার কখনও তুলনামূলক নিরপেক্ষ বা অশত্রুভাবাপন্ন জাহাজকে বেশি সুযোগ দিতে পারে।
তার ব্যাখ্যায়, ইরান আইনগতভাবে পূর্ণ অবরোধ ঘোষণা না করেও নতুন ধরনের যাতায়াত ব্যয় তৈরি করতে সক্ষম। বাছাই করে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া, বাড়তি সমন্বয় প্রক্রিয়া চাপানো, কিংবা ভিন্ন ভিন্ন শর্ত আরোপের মধ্য দিয়ে তেহরান কার্যত ট্রানজিট খরচ বাড়াতে পারে।
![]()
কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের সবচেয়ে স্পর্শকাতর পথগুলোর একটি। তাই এখানে টোল, নিরাপত্তা, আংশিক অবরোধ বা নতুন নিষ্পত্তি পদ্ধতি— সবকিছুই শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। চীনা বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব তাই আপাতত ধারণাগত হলেও, এটি স্পষ্ট করে যে হরমুজ এখন শুধু সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্র নয়, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরীক্ষাগারেও পরিণত হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















