০৪:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
চীনকে পাশে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নজর, ইউরোপীয় কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে অগ্রাধিকার পেল ইরান বগুড়া-৬ উপনির্বাচনে বিএনপির বাদশা জয়ী, জামায়াতের কারচুপির অভিযোগ, সংসদে হট্টগোল চীনের বিদেশি রাষ্ট্রীয় সম্পদে কড়া নজরদারি, অস্থির বিশ্বে নতুন তদারকি দপ্তর সাবমেরিন কেবল মেরামতে ৮০ ঘণ্টা ইন্টারনেটে ধীরগতি, ব্যাহত হতে পারে সেবা চীনের ৫০০ টনের ‘ভূগর্ভস্থ বাহক’ এক কিলোমিটার নিচে নেমে আকরিক তুলবে অপরিশোধিত তেল সংকটে দেশের একমাত্র শোধনাগার ইআরএল বন্ধের মুখে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পারস্য উপসাগরে বদলে যাওয়া শক্তির সমীকরণ: যুদ্ধবিরতি, নতুন চাপ এবং ইরানের বাড়তি প্রভাব আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুই সাবেক পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড, অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড রুশ আকাশ প্রতিরক্ষায় কেন আরও ভরসা রাখছে ভারত

রপ্তানি কম, আমদানি বেশি: বাংলাদেশের বহিঃখাতে চাপ বাড়ছে কেন

বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি আবারও বেড়েছে। একদিকে রপ্তানি আয় কমেছে, অন্যদিকে আমদানি বেড়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়ছে। তবে পুরো বহিঃখাতের ছবি একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, পরিস্থিতি শুধু খারাপ নয়, বরং জটিলও। কারণ বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও প্রবাসী আয় এবং আর্থিক হিসাবের উন্নতির কারণে বড় ধরনের চাপ আপাতত সামলে রাখা গেছে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি সময়ে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে। আগের বছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এই সময়ে রপ্তানি আয় ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ২৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে আমদানি বেড়ে ৪৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে, যা ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।

তবু এই চিত্রের মধ্যে একটি স্বস্তির জায়গাও আছে। প্রবাসী আয় ২১ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১ দশমিক ০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে আর্থিক হিসাবেও বড় উন্নতি হয়েছে। এর ফলে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্য ৩ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্তে ফিরেছে। আগের বছর একই সময়ে এখানে ৮৬৭ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল। অর্থাৎ বাণিজ্য ঘাটতি যতই বাড়ুক, অন্য দুটি জায়গা এখনো কিছুটা ভারসাম্য ধরে রেখেছে।

ফেব্রুয়ারির ২১ দিনে প্রবাসী আয় এসেছে ২৩০ কোটি ডলার

কেন বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি

বিষয়টি বোঝা খুব কঠিন নয়। বাংলাদেশ এখন রপ্তানিতে দুর্বলতা আর আমদানিতে বৃদ্ধির মুখে আছে। রপ্তানি আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রা কম আসে। আবার আমদানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা বেশি বেরিয়ে যায়। এই দুইয়ের ফারাকই বাণিজ্য ঘাটতি।

আমদানি বাড়ার পেছনে কিছু ইতিবাচক কারণও থাকতে পারে। যেমন শিল্পে কাঁচামাল, জ্বালানি বা যন্ত্রপাতির চাহিদা বাড়া। এতে বোঝা যায় অর্থনীতি কিছুটা নড়াচড়া করছে। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন রপ্তানি সেই হারে বাড়তে পারে না। তখন বহিঃখাতে চাপ জমতে থাকে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো খুব বেশি বৈচিত্র্যময় নয়। এখনও তৈরি পোশাক খাতের ওপরই বড় নির্ভরতা রয়ে গেছে। তাই বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা একটু কমলেই রপ্তানি আয়ে প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে জ্বালানি, শিল্পকাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য ও মূলধনী যন্ত্রপাতির জন্য আমদানি নির্ভরতা কমেনি। ফলে রপ্তানি দুর্বল হলেই ঘাটতি দ্রুত বাড়ে।

প্রবাসী আয় এখন বড় ভরসা

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের বহিঃখাতে সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হলো প্রবাসী আয়। এই অর্থপ্রবাহ চলতি হিসাবের ঘাটতি কমিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা সহায়তা করেছে এবং বাণিজ্য ঘাটতির চাপ আংশিকভাবে শোষণ করেছে।

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নও আছে। এই ভরসা কতদিন থাকবে? বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য একাধিক চাপ তৈরি হতে পারে। আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, রপ্তানি দুর্বল হতে পারে, এমনকি প্রবাসী আয়ও চাপে পড়তে পারে। অর্থাৎ যে জায়গা এখন বাংলাদেশকে সামলে দিচ্ছে, সামনে সেই জায়গাও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।

২৩ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে পৌনে ২ বিলিয়ন ডলার

আপাত ভালো খবরের ভেতর লুকানো বাস্তবতা

সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্য উদ্বৃত্তে ফিরেছে—এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো খবর। কিন্তু এই উন্নতির উৎসটাও দেখা দরকার। আর্থিক হিসাবে যে বড় উদ্বৃত্ত দেখা গেছে, তার একটি অংশ এসেছে বাণিজ্য ঋণ, আমদানি পণ্যের চালান আর অর্থ পরিশোধের সময়ের ব্যবধান, এবং ব্যাংকিং খাতের বৈদেশিক সম্পদ ও দায়ের পরিবর্তন থেকে।

এর অর্থ হলো, এই উদ্বৃত্তের সবটাই দীর্ঘমেয়াদি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ফল নয়। কিছু অংশ অস্থায়ী কারণেও হয়েছে। তাই শুধু উদ্বৃত্ত দেখেই নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এই ধরনের সহায়তা সবসময় একইভাবে থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কী বলছে

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলছে, সাম্প্রতিক ধীরগতির পর বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি ২০২৫-২৬ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে ফিরতে পারে। কিন্তু একইসঙ্গে তারা সতর্ক করেছে, দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থা, ব্যাংক খাতের ভঙ্গুরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সংস্কারে ধীরগতি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিশ্বব্যাংক আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তারা বলছে, টানা মন্থর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত, কম রাজস্ব এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকট—সব মিলিয়ে অর্থনীতি চাপের মধ্যে আছে। যদি আঞ্চলিক সংঘাত আরও দীর্ঘ হয়, তাহলে আমদানি ব্যয় বাড়বে, জ্বালানির চাপ বাড়বে, চলতি হিসাব দুর্বল হবে এবং সাধারণ মানুষের কষ্টও বাড়বে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও খুব আশাবাদী ছবি দেখাচ্ছে না। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ০ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। তারা মনে করছে, চলতি হিসাব কিছু সময়ের জন্য সামলানো গেলেও সামনে আমদানি চাহিদা বাড়লে আবার ঘাটতি দেখা দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, জ্বালানি ব্যয় এবং পরিবহন ব্যয় এই ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।

ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকও তাদের কৌশলপত্রে জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, আর্থিক বাজার এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। এর অর্থ হলো, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারেরাও বুঝছে যে, শুধু অস্থায়ী ব্যবস্থায় নয়, বরং অর্থনীতির ভিত শক্ত করা জরুরি।

আইএমএফ কী, কেন এটা এত আলোচিত

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়

বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি বড় ঝুঁকি আছে।

প্রথমত, রপ্তানি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে না পারা।
দ্বিতীয়ত, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়সহ আমদানি খরচ আরও বেড়ে যাওয়া।
তৃতীয়ত, প্রবাসী আয় যদি আগের মতো শক্তিশালী না থাকে, তাহলে চলতি হিসাবের ওপর চাপ আবার বেড়ে যাবে।

এর সঙ্গে দেশের ভেতরের দুর্বলতাও আছে। রাজস্ব আদায় কম, ব্যাংক খাত নাজুক, আর বিনিময় হার ব্যবস্থায় এখনও পুরো আস্থা ফিরেনি। বাইরের ধাক্কা এলে এই ভেতরের দুর্বলতাই সমস্যাকে আরও বড় করে তুলতে পারে।

জেনে নিন রপ্তানি করার নিয়ম - PriyoCareer

কী করা দরকার

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে আরও বাস্তবভিত্তিক করা। বিনিময় হারকে নমনীয় ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে, যাতে বাজারে কৃত্রিম চাপ না বাড়ে। একইসঙ্গে মুদ্রানীতিকে এমনভাবে চালাতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতি ও আমদানি-চাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।

এর পাশাপাশি রাজস্ব বাড়ানো খুব জরুরি। কারণ বৈদেশিক খাতে চাপ বাড়লে সরকারকে ভর্তুকি, সামাজিক সুরক্ষা এবং অন্যান্য ব্যয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। রাজস্ব দুর্বল থাকলে সেই চাপ গিয়ে পড়ে ঋণ, রিজার্ভ এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর।

ব্যাংক খাতের সংস্কারও জরুরি। কারণ একটি দুর্বল ব্যাংক খাত বহিঃখাতের চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একইসঙ্গে রপ্তানিকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে হবে, যাতে একটি বা দুটি খাতের ওপর পুরো দেশ নির্ভর না থাকে।

বাংলাদেশের বহিঃখাত এখন একইসঙ্গে সতর্কবার্তা ও সাময়িক স্বস্তির গল্প বলছে। একদিকে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে, রপ্তানি দুর্বল, আমদানি বাড়ছে। অন্যদিকে প্রবাসী আয় ও আর্থিক হিসাব আপাতত পরিস্থিতি সামলে দিচ্ছে।

কিন্তু এই স্বস্তি স্থায়ী নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রায় সবার বার্তাই একই—বাংলাদেশের পুনরুদ্ধার সম্ভব, কিন্তু তা খুব নাজুক। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত দীর্ঘ হলে বহিঃখাতে চাপ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি শুধু প্রবাসী আয়ের জোরে সময় পার করবে, নাকি এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি, রাজস্ব, ব্যাংকিং ও নীতি-কাঠামোর বড় সংস্কার করবে? এই উত্তরই ঠিক করে দেবে বাণিজ্য ঘাটতি সাময়িক চাপ হয়ে থাকবে, নাকি সামনে আরও বড় সংকট ডেকে আনবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনকে পাশে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নজর, ইউরোপীয় কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে অগ্রাধিকার পেল ইরান

রপ্তানি কম, আমদানি বেশি: বাংলাদেশের বহিঃখাতে চাপ বাড়ছে কেন

০২:৩৩:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি আবারও বেড়েছে। একদিকে রপ্তানি আয় কমেছে, অন্যদিকে আমদানি বেড়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়ছে। তবে পুরো বহিঃখাতের ছবি একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, পরিস্থিতি শুধু খারাপ নয়, বরং জটিলও। কারণ বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও প্রবাসী আয় এবং আর্থিক হিসাবের উন্নতির কারণে বড় ধরনের চাপ আপাতত সামলে রাখা গেছে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি সময়ে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে। আগের বছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এই সময়ে রপ্তানি আয় ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ২৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে আমদানি বেড়ে ৪৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে, যা ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।

তবু এই চিত্রের মধ্যে একটি স্বস্তির জায়গাও আছে। প্রবাসী আয় ২১ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১ দশমিক ০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে আর্থিক হিসাবেও বড় উন্নতি হয়েছে। এর ফলে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্য ৩ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্তে ফিরেছে। আগের বছর একই সময়ে এখানে ৮৬৭ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল। অর্থাৎ বাণিজ্য ঘাটতি যতই বাড়ুক, অন্য দুটি জায়গা এখনো কিছুটা ভারসাম্য ধরে রেখেছে।

ফেব্রুয়ারির ২১ দিনে প্রবাসী আয় এসেছে ২৩০ কোটি ডলার

কেন বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি

বিষয়টি বোঝা খুব কঠিন নয়। বাংলাদেশ এখন রপ্তানিতে দুর্বলতা আর আমদানিতে বৃদ্ধির মুখে আছে। রপ্তানি আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রা কম আসে। আবার আমদানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা বেশি বেরিয়ে যায়। এই দুইয়ের ফারাকই বাণিজ্য ঘাটতি।

আমদানি বাড়ার পেছনে কিছু ইতিবাচক কারণও থাকতে পারে। যেমন শিল্পে কাঁচামাল, জ্বালানি বা যন্ত্রপাতির চাহিদা বাড়া। এতে বোঝা যায় অর্থনীতি কিছুটা নড়াচড়া করছে। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন রপ্তানি সেই হারে বাড়তে পারে না। তখন বহিঃখাতে চাপ জমতে থাকে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো খুব বেশি বৈচিত্র্যময় নয়। এখনও তৈরি পোশাক খাতের ওপরই বড় নির্ভরতা রয়ে গেছে। তাই বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা একটু কমলেই রপ্তানি আয়ে প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে জ্বালানি, শিল্পকাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য ও মূলধনী যন্ত্রপাতির জন্য আমদানি নির্ভরতা কমেনি। ফলে রপ্তানি দুর্বল হলেই ঘাটতি দ্রুত বাড়ে।

প্রবাসী আয় এখন বড় ভরসা

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের বহিঃখাতে সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হলো প্রবাসী আয়। এই অর্থপ্রবাহ চলতি হিসাবের ঘাটতি কমিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা সহায়তা করেছে এবং বাণিজ্য ঘাটতির চাপ আংশিকভাবে শোষণ করেছে।

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নও আছে। এই ভরসা কতদিন থাকবে? বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য একাধিক চাপ তৈরি হতে পারে। আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, রপ্তানি দুর্বল হতে পারে, এমনকি প্রবাসী আয়ও চাপে পড়তে পারে। অর্থাৎ যে জায়গা এখন বাংলাদেশকে সামলে দিচ্ছে, সামনে সেই জায়গাও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।

২৩ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে পৌনে ২ বিলিয়ন ডলার

আপাত ভালো খবরের ভেতর লুকানো বাস্তবতা

সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্য উদ্বৃত্তে ফিরেছে—এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো খবর। কিন্তু এই উন্নতির উৎসটাও দেখা দরকার। আর্থিক হিসাবে যে বড় উদ্বৃত্ত দেখা গেছে, তার একটি অংশ এসেছে বাণিজ্য ঋণ, আমদানি পণ্যের চালান আর অর্থ পরিশোধের সময়ের ব্যবধান, এবং ব্যাংকিং খাতের বৈদেশিক সম্পদ ও দায়ের পরিবর্তন থেকে।

এর অর্থ হলো, এই উদ্বৃত্তের সবটাই দীর্ঘমেয়াদি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ফল নয়। কিছু অংশ অস্থায়ী কারণেও হয়েছে। তাই শুধু উদ্বৃত্ত দেখেই নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এই ধরনের সহায়তা সবসময় একইভাবে থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কী বলছে

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলছে, সাম্প্রতিক ধীরগতির পর বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি ২০২৫-২৬ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে ফিরতে পারে। কিন্তু একইসঙ্গে তারা সতর্ক করেছে, দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থা, ব্যাংক খাতের ভঙ্গুরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সংস্কারে ধীরগতি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিশ্বব্যাংক আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তারা বলছে, টানা মন্থর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত, কম রাজস্ব এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকট—সব মিলিয়ে অর্থনীতি চাপের মধ্যে আছে। যদি আঞ্চলিক সংঘাত আরও দীর্ঘ হয়, তাহলে আমদানি ব্যয় বাড়বে, জ্বালানির চাপ বাড়বে, চলতি হিসাব দুর্বল হবে এবং সাধারণ মানুষের কষ্টও বাড়বে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও খুব আশাবাদী ছবি দেখাচ্ছে না। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ০ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। তারা মনে করছে, চলতি হিসাব কিছু সময়ের জন্য সামলানো গেলেও সামনে আমদানি চাহিদা বাড়লে আবার ঘাটতি দেখা দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, জ্বালানি ব্যয় এবং পরিবহন ব্যয় এই ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।

ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকও তাদের কৌশলপত্রে জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, আর্থিক বাজার এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। এর অর্থ হলো, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারেরাও বুঝছে যে, শুধু অস্থায়ী ব্যবস্থায় নয়, বরং অর্থনীতির ভিত শক্ত করা জরুরি।

আইএমএফ কী, কেন এটা এত আলোচিত

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়

বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি বড় ঝুঁকি আছে।

প্রথমত, রপ্তানি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে না পারা।
দ্বিতীয়ত, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়সহ আমদানি খরচ আরও বেড়ে যাওয়া।
তৃতীয়ত, প্রবাসী আয় যদি আগের মতো শক্তিশালী না থাকে, তাহলে চলতি হিসাবের ওপর চাপ আবার বেড়ে যাবে।

এর সঙ্গে দেশের ভেতরের দুর্বলতাও আছে। রাজস্ব আদায় কম, ব্যাংক খাত নাজুক, আর বিনিময় হার ব্যবস্থায় এখনও পুরো আস্থা ফিরেনি। বাইরের ধাক্কা এলে এই ভেতরের দুর্বলতাই সমস্যাকে আরও বড় করে তুলতে পারে।

জেনে নিন রপ্তানি করার নিয়ম - PriyoCareer

কী করা দরকার

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে আরও বাস্তবভিত্তিক করা। বিনিময় হারকে নমনীয় ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে, যাতে বাজারে কৃত্রিম চাপ না বাড়ে। একইসঙ্গে মুদ্রানীতিকে এমনভাবে চালাতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতি ও আমদানি-চাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।

এর পাশাপাশি রাজস্ব বাড়ানো খুব জরুরি। কারণ বৈদেশিক খাতে চাপ বাড়লে সরকারকে ভর্তুকি, সামাজিক সুরক্ষা এবং অন্যান্য ব্যয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। রাজস্ব দুর্বল থাকলে সেই চাপ গিয়ে পড়ে ঋণ, রিজার্ভ এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর।

ব্যাংক খাতের সংস্কারও জরুরি। কারণ একটি দুর্বল ব্যাংক খাত বহিঃখাতের চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একইসঙ্গে রপ্তানিকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে হবে, যাতে একটি বা দুটি খাতের ওপর পুরো দেশ নির্ভর না থাকে।

বাংলাদেশের বহিঃখাত এখন একইসঙ্গে সতর্কবার্তা ও সাময়িক স্বস্তির গল্প বলছে। একদিকে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে, রপ্তানি দুর্বল, আমদানি বাড়ছে। অন্যদিকে প্রবাসী আয় ও আর্থিক হিসাব আপাতত পরিস্থিতি সামলে দিচ্ছে।

কিন্তু এই স্বস্তি স্থায়ী নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রায় সবার বার্তাই একই—বাংলাদেশের পুনরুদ্ধার সম্ভব, কিন্তু তা খুব নাজুক। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত দীর্ঘ হলে বহিঃখাতে চাপ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি শুধু প্রবাসী আয়ের জোরে সময় পার করবে, নাকি এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি, রাজস্ব, ব্যাংকিং ও নীতি-কাঠামোর বড় সংস্কার করবে? এই উত্তরই ঠিক করে দেবে বাণিজ্য ঘাটতি সাময়িক চাপ হয়ে থাকবে, নাকি সামনে আরও বড় সংকট ডেকে আনবে।