পৃথিবীর গভীরে সরাসরি নেমে গিয়ে খনিজ উত্তোলনের নতুন দিগন্ত খুলতে যাচ্ছে চীনের এক বিশাল যন্ত্র। ‘গ্যাংতিয়ে জিলিয়াং’ নামের এই যন্ত্রকে এমন এক প্রযুক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা শক্ত পাথরের ভেতর এক হাজার মিটারেরও বেশি গভীরতায় পূর্ণ ব্যাসের উল্লম্ব শ্যাফট খনন করতে পারে। এ ধরনের যন্ত্র আগে কখনও বাস্তবে ব্যবহৃত হয়নি বলেই দাবি করা হচ্ছে।
কেন এই যন্ত্র নিয়ে এত আলোচনা
‘গ্যাংতিয়ে জিলিয়াং’-এর অর্থ দাঁড়ায় ‘ইস্পাতের মেরুদণ্ড’। প্রায় ৫০০ টন ওজনের এই যন্ত্রের প্রস্থ ৮ দশমিক ১ মিটার। আকার-আকৃতি ও সক্ষমতার কারণে একে অনেকেই ভূগর্ভস্থ বিমানবাহী রণতরীর সঙ্গে তুলনা করছেন। চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লিয়াওনিং প্রদেশের একটি লৌহ আকরিক প্রকল্পে এটি ইতোমধ্যে মোতায়েন করা হয়েছে।
এই যন্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো পৃথিবীর গভীরে লুকিয়ে থাকা বিপুল খনিজ সম্পদে পৌঁছানো। চীনের বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূ-পৃষ্ঠের কাছাকাছি যত খনিজ সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে, তার চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ সম্পদ আরও গভীরে লুকিয়ে আছে।
গভীর মাটির নিচে কেন নজর
সহজে উত্তোলনযোগ্য খনিজের ভাণ্ডার অনেকটাই কমে আসায় এখন নজর পড়ছে গভীর স্তরের সম্পদের দিকে। ২০১৮ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, দুই হাজার মিটার পর্যন্ত গভীরে থাকা অ্যান্টিমনির মজুত পরিচিত ভাণ্ডারের তুলনায় ৫ দশমিক ৩ গুণ বেশি হতে পারে। ব্যাটারি, অর্ধপরিবাহী যন্ত্রাংশ ও ধাতব সংকর তৈরিতে এই খনিজের গুরুত্ব অনেক।
সীসা, দস্তা ও সোনার ক্ষেত্রেও গভীর স্তরের মজুত প্রায় চার গুণ বেশি বলে ধারণা করা হয়। টাংস্টেনের মতো মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর ক্ষেত্রেও গভীর স্তরে মজুত ভূ-পৃষ্ঠের কাছের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। একই ধরনের অনুপাতের কথা বলা হচ্ছে লিথিয়াম, বিরল মৃত্তিকা খনিজ ও কয়লার ক্ষেত্রেও।

যন্ত্রটি কীভাবে কাজ করে
এই যন্ত্রটি শক্ত পাথর ভেদ করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি। এতে একটি বিশাল বৃত্তাকার কাটারহেড আছে, যা শ্যাফটের পুরো ব্যাসজুড়ে একসঙ্গে কাটতে পারে। এটি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে নিচের দিকে বিশাল বৈদ্যুতিক ড্রিলের মতো নেমে যায় এবং উল্লম্বভাবে খনন চালায়।
অন্যান্য গভীর খনন পদ্ধতির তুলনায় এটি আলাদা, কারণ এটি শুরু থেকেই গভীর ও শক্ত শিলা ভেদ করার জন্য পরিকল্পিত। এর ফলে প্রচলিত বিস্ফোরণনির্ভর পদ্ধতির ঝুঁকি কমিয়ে আরও নিয়ন্ত্রিত ও ধারাবাহিকভাবে কাজ করা সম্ভব হতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বাধা কোথায় ছিল
প্রধান নকশাকার ডিং ঝাংফেই জানিয়েছেন, এই প্রকল্পে বেশ কয়েকটি বড় প্রযুক্তিগত বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে এবং সেখান থেকে একাধিক নতুন উদ্ভাবনের জন্ম হয়েছে।
সবচেয়ে জটিল সমস্যাগুলোর একটি ছিল খননের সময় ভেঙে পড়া পাথর ও মাটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া। অনুভূমিক টানেল খননযন্ত্রের ক্ষেত্রে ধ্বংসাবশেষ সামনে জমে থাকলেও তা সরানো তুলনামূলক সহজ। কিন্তু উল্লম্ব খননের সময় মাধ্যাকর্ষণের কারণে ভাঙা পাথর সরাসরি কাটারহেডের সামনে জমে যায়। প্রায় ছয় মাস নানা পদ্ধতি পরীক্ষা করেও কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি।
প্রাচীন জলচক্র থেকে এলো সমাধান
শেষ পর্যন্ত সমাধান আসে এক অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে। চাংশার একটি জলাভূমি উদ্যানে হাঁটার সময় দলটি প্রাচীন ধাঁচের ড্রাগন-বোন জলচক্র দেখে অনুপ্রাণিত হয়। দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এই সেচযন্ত্রের কাঠামো দেখে প্রকৌশলীরা একই ধরনের নীতিতে একটি বুদ্ধিমান উল্লম্ব বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা তৈরি করেন।
এই ব্যবস্থার পরিবহনক্ষমতা ঘণ্টায় একসঙ্গে কাজ করা ১০টি ট্রাকের সমান বলে দাবি করা হচ্ছে। অর্থাৎ গভীর খননের বড় বাধাগুলোর একটি কাটিয়ে উঠতে তারা পুরোনো প্রযুক্তির ধারণাকে আধুনিক যন্ত্রে রূপ দিয়েছেন।

গভীর খননের নিরাপত্তা কতটা কঠিন
এক কিলোমিটার বা তারও বেশি গভীরে খনন মানেই প্রচণ্ড ভূস্তরচাপ এবং উচ্চ জলচাপের মুখোমুখি হওয়া। কাটার সঙ্গে সঙ্গেই দেয়ালকে সমর্থন না দিলে শিলাস্তর বিকৃত হতে পারে, এমনকি ধসে পড়ার ঝুঁকিও থাকে। গভীর নির্মাণকাজে একে অনেক সময় নিরাপত্তার অভিশাপ বলা হয়।
দেশের কয়েকটি বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণার মাধ্যমে দলটি এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেছে, যা খননের সঙ্গে সঙ্গেই শ্যাফটের দেয়ালকে শক্তিশালী করতে পারে। ফলে গভীরে কাজের সময় তাৎক্ষণিক ধসের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
চীনের জন্য এর কৌশলগত গুরুত্ব
চীনের গবেষকদের মতে, অগভীর খনিজসম্পদ কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টিকিয়ে রাখতে এখন এক হাজার মিটারের বেশি গভীরে থাকা সম্পদের দিকে যেতেই হবে। দেশে ইতোমধ্যে এক হাজার মিটারের বেশি গভীরতার ৪০টিরও বেশি কয়লাখনি শ্যাফট এবং প্রায় ২০টি ধাতব খনির শ্যাফট নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে ৭টির গভীরতা ১ হাজার ৫০০ মিটারেরও বেশি।
এই বাস্তবতা থেকেই নিরাপদ, উন্নত এবং স্বয়ংক্রিয় খননযন্ত্র তৈরির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। প্রচলিত ড্রিলিং ও বিস্ফোরণনির্ভর পদ্ধতিতে ঝুঁকি বেশি থাকায় নতুন প্রযুক্তিকে এখন জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।
খনির বাইরে আর কোথায় ব্যবহার হতে পারে
এই যন্ত্রের গুরুত্ব শুধু খনিজ উত্তোলনেই সীমাবদ্ধ নয়। চীনের কিছু জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মনে করেন, দেশের পশ্চিমাঞ্চলে কৌশলগত স্থাপনা সুরক্ষায় ভূগর্ভে বিস্তৃত অবকাঠামো নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা স্থাপনাগুলোকে অনেক গভীরে স্থাপন করলে সেগুলো আরও নিরাপদ থাকবে এবং সহজে শনাক্তও করা যাবে না।
সে অর্থে ‘গ্যাংতিয়ে জিলিয়াং’ শুধু একটি খনিযন্ত্র নয়, ভবিষ্যতের ভূগর্ভস্থ কৌশলগত অবকাঠামো নির্মাণেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
চীনের এই বিশাল যন্ত্র দেখিয়ে দিচ্ছে, খনিজ উত্তোলনের প্রতিযোগিতা এখন কেবল মাটির ওপরে নয়, বরং পৃথিবীর গভীরতাতেও পৌঁছে গেছে। অগভীর ভাণ্ডার ফুরিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে গভীর ভূগর্ভে পৌঁছানোর সক্ষমতা আগামী দিনের অর্থনীতি, শিল্প ও কৌশলগত শক্তির এক গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















