বিশ্বের ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে সম্পদের ব্যবধান কমানোর নানা প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে সেই ব্যবধান আরও বাড়ছে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘের একটি নতুন প্রতিবেদন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ও অঙ্গীকারগুলোর বেশিরভাগই বাস্তবায়ন না হওয়ায় এই বৈষম্য আরও গভীর হচ্ছে।
সেভিল চুক্তির অগ্রগতি মূল্যায়ন
স্পেনের সেভিল শহরে হওয়া একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির অগ্রগতি মূল্যায়ন করেই এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল বৈশ্বিক বৈষম্য কমানো এবং ২০৩০ সালের উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন করা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের আসন্ন বসন্তকালীন বৈঠকের আগে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানিয়েছেন, বিশ্ব অর্থনীতির উন্নতির যে আশা করা হচ্ছিল, তা ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের কর্মকর্তা লি জুনহুয়া বলেছেন, বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
বাণিজ্য বাধা ও জলবায়ু সংকটের প্রভাব
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাড়তি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এবং ঘন ঘন জলবায়ুজনিত দুর্যোগ বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এসব কারণে দরিদ্র দেশগুলোর অর্থনৈতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
সেভিল অঙ্গীকার ও অর্থায়নের সংকট
গত বছরের সেভিল সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র বাদে অধিকাংশ দেশ ‘সেভিল অঙ্গীকার’ অনুমোদন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল উন্নয়ন খাতে বছরে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ঘাটতি পূরণ করা। এজন্য দরিদ্র দেশগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের কথা বলা হয়।
![]()
তবে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বারবার অভিযোগ করেছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক ধনী দেশগুলোর পক্ষেই বেশি কাজ করছে এবং কোভিড মহামারির সময় দরিদ্র দেশগুলোকে যথেষ্ট সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ২৫টি দেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা কমিয়েছে। ফলে আগের বছরের তুলনায় সহায়তা ২৩ শতাংশ কমে যায়, যা একটি রেকর্ড পতন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কাটছাঁট করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যারা তাদের সহায়তা ৫৯ শতাংশ কমিয়েছে। ২০২৬ সালেও এই সহায়তা আরও কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শুল্ক বৃদ্ধি ও দরিদ্র দেশের ক্ষতি
প্রতিবেদনে শুল্ক বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে আগের মার্কিন প্রশাসনের সময় চালু হওয়া শুল্কনীতির কারণে দরিদ্র দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর ক্ষেত্রে রপ্তানি শুল্ক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রেও শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন স্পষ্ট করে বলছে, প্রতিশ্রুতি থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে বৈশ্বিক বৈষম্য কমার বদলে আরও বেড়েই চলেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















