ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা নিয়ে প্রতিবেদন করা এক ইরানি সাংবাদিক জানিয়েছেন, এই আলোচনার ফলাফল জনমতের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো বিশ্লেষকের মতে, যদি সরকারকে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে অনাগ্রহী হিসেবে দেখা যায়, তাহলে জনগণের সমর্থন কমে যেতে পারে।
বিশাল পাহাড়ের গভীরে, নজরদারি বিমান ও স্যাটেলাইটের দৃষ্টির বাইরে থাকা গোপন সুড়ঙ্গ ও ঘাঁটিগুলোতে ইরান নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদনে ব্যস্ত—এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন দফা সংঘর্ষের প্রস্তুতি হিসেবেই এই কার্যক্রম চলছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ সূত্র ও বিশ্লেষকদের মতে, যদি চলমান শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তাহলে দেশটি ছয় মাস বা তারও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
তেহরানভিত্তিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কৌশলবিদ আলি আহমাদি বলেন, ইরান দীর্ঘদিন ধরে এমন এক শিল্পভিত্তি গড়ে তুলেছে, যা যুদ্ধের সময় প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারে। তিনি বলেন, ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে ভয় যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়া নয়, বরং যুদ্ধ শেষ হয়ে আবার ছয় মাস পর নতুন কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ফিরে আসা।
তেহরানে অবস্থানরত এক আন্তর্জাতিক কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, জানান—ইরান অন্তত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। তার ভাষায়, “কোনো কিছুর ঘাটতি নেই। ইরান দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। তারা এই পরিস্থিতির পূর্বাভাস দিয়েছিল এবং জনগণকে সর্বোচ্চ ছয় মাস খাদ্য সরবরাহ করার মতো মজুত রয়েছে।”
এই দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতি ইসরায়েলের প্রস্তাবিত স্বল্পমেয়াদি সামরিক অভিযানের ধারণার সঙ্গে তীব্রভাবে সাংঘর্ষিক। সেই পরিকল্পনায় কয়েক দিনের মধ্যে শাসন পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল। এছাড়া ব্রিটেনভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ধরনের দীর্ঘ যুদ্ধ ইসরায়েল ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান যদি দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, তাহলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও, ইরানের এই সক্ষমতা নতুন করে সংকট তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ও তেলের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ১১ এপ্রিল শুরু হতে যাওয়া শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দাবি হলো এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটি পুনরায় খুলে দেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এই সংঘাত রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সময়ে দীর্ঘায়িত হতে পারে। গ্রীষ্মকালজুড়ে যুদ্ধ চললে তা দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে নির্বাচনের আগে।
দীর্ঘ ২০ বছরের প্রস্তুতি
বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়সীমার পার্থক্যের পেছনে একটি বড় কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দ্রুত যুদ্ধ শুরু করা, যা যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
যদিও ইসরায়েলের নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কথা বলে আসছিল, বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রকে এতে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ শুরু হয় সাম্প্রতিক সময়ে। অন্যদিকে, ইরান ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও সাদ্দাম হোসেনের পতন দেখার পর থেকেই সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
ইরানের এক আইনজীবী, যিনি তেহরান ও গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করেন এবং সরকারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত, বলেন—“ইরান বহু দশক ধরে এই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেল শোধনাগারসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে, যাতে একযোগে আঘাতে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে।
বর্তমান দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে তাদের ক্ষয়প্রাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ দিচ্ছে। একই সময়ে ইরানও ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো মেরামতের চেষ্টা করছে।
ইরানের যুদ্ধ কৌশলের বড় অংশই গড়ে উঠেছে পাহাড়ের ভেতরে নির্মিত সুরক্ষিত ক্ষেপণাস্ত্র শহরগুলোকে কেন্দ্র করে, যেখানে অস্ত্র মজুত ও উৎপাদনের ব্যবস্থা রয়েছে।
অস্ত্র ভাণ্ডার ও উৎপাদন
ইরান বহু বছর ধরে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করে আসছে। ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশটি সুড়ঙ্গ খননের প্রযুক্তি আমদানি করে, যা পরবর্তীতে তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির অংশ হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষক আহমাদির মতে, এসব গোপন ক্ষেপণাস্ত্র শহরের কিছু অংশে উৎপাদন কারখানাও রয়েছে, যা ইরানকে নজরদারি এড়িয়ে অস্ত্র পুনরায় তৈরি করার সুযোগ দেয়।

তিনি বলেন, “আগে অনেক উৎপাদন কেন্দ্র ভূমির ওপরে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা ভূগর্ভে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।”
২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধ ছিল দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় উত্তেজনার ঘটনা। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটে। সেই সংঘাতে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানের কাছে প্রায় দুই হাজার মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা ইসরায়েলে আঘাত হানতে সক্ষম। এছাড়া স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব।
এছাড়া শাহেদ ড্রোনের বিশাল মজুত রয়েছে, যা তুলনামূলক ছোট বিস্ফোরক বহন করলেও দীর্ঘপথ অতিক্রম করতে সক্ষম।
আহমাদি বলেন, “ড্রোনের মজুত প্রায় সীমাহীন।”
যুদ্ধের আগে প্রতি মাসে প্রায় ৫০টি উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন হতো, যা বর্তমানে বেড়ে প্রায় ১০০টিতে পৌঁছেছে।
তবে চলমান হামলায় কিছু সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসফাহানের কাছে একটি অস্ত্র কারখানা ধ্বংস হয়েছে এবং প্রধান ইস্পাত কারখানাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবুও দেশের বিভিন্ন স্থানে কাঁচামালের মজুত থাকায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
তবে দ্রুত উৎপাদনের কারণে ক্ষেপণাস্ত্রের মান কিছুটা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এক বিশ্লেষকের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধে প্রথমবারের মতো দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই ব্যর্থ হয়েছে।
চীন ও অভ্যন্তরীণ চাপ
ইরানের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার ক্ষেত্রে একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো চীন। দেশটি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদার, বিশেষ করে তেলের ক্রেতা হিসেবে।
চীন একদিকে জাতিসংঘে ইরানকে সমর্থন দিলেও, অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির দিকে চাপ দিয়েছে, কারণ সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো দেশের জনগণের ধৈর্য। তেহরানের এক বাসিন্দা জানান, এখনো শহরের জীবনযাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিক। দোকান, ক্যাফে খোলা রয়েছে এবং খাদ্য সরবরাহও চালু আছে।
তিনি বলেন, “খাদ্যের দিক থেকে পরিস্থিতি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে অবকাঠামোর ওপর নতুন করে হামলা হলে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।”
তেহরানের অধিকাংশ মানুষ বিদ্যুৎ ও পানির ওপর নির্ভরশীল আধুনিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত। তাই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বা পানি সংকট তৈরি হলে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এক আন্তর্জাতিক কর্মকর্তা জানান, এই যুদ্ধ দেশটির জনগণকে কিছুটা ঐক্যবদ্ধ করেছে এবং জাতীয়তাবাদী মনোভাব বাড়িয়েছে। তবে অতীতে সরকারবিরোধী অসন্তোষও ছিল প্রবল।
বিশ্লেষক আহমাদি সতর্ক করে বলেন, “যদি জনগণ মনে করে যুদ্ধ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাহলে তারা সরকারের পাশে থাকবে। কিন্তু যদি মনে হয় সরকার অযথা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছে, তাহলে সেই সমর্থন দ্রুত কমে যেতে পারে।”
এই পরিস্থিতিতে ইরানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে জনসমর্থন ধরে রাখা।
বরজু দারাগাহি 


















