সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে এখন একটাই কথা — বেশি বেশি প্রোটিন খাও, বেশি বেশি ফাইবার খাও, তাহলেই সুস্থ থাকবে। ইনফ্লুয়েন্সারদের হাতে চিয়া সিডের বাটি আর ওটসের বাটি দেখে অনেকেই ভাবছেন, এটাই বুঝি সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি। কিন্তু পুষ্টিবিদরা বলছেন, এই “বেশি মানেই ভালো” ধারণাটা সবসময় সঠিক নয়।
কী এই ‘ম্যাক্সিং’ ট্রেন্ড?
কয়েক বছর ধরে ‘প্রোটিনম্যাক্সিং’ নামে একটা ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইনে। মাংস, দুগ্ধজাত খাবার আর বাদামের মতো খাবার থেকে যত বেশি সম্ভব প্রোটিন নেওয়াটাই এই ট্রেন্ডের মূল কথা। এখন সেই জায়গায় আসছে ফাইবারও। যত বেশি ফাইবার খাবে, পেট তত পরিষ্কার থাকবে, খিদেও কম লাগবে — এমনটাই দাবি করছেন অনলাইন স্বাস্থ্য-উৎসাহীরা।
বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। এখন প্রায় প্রতিটি প্যাকেটজাত খাবারেই লেখা থাকছে ‘হাই প্রোটিন’। এমনকি মিষ্টি সিরিয়ালের গায়েও এখন প্রোটিনের বিজ্ঞাপন। একটি বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকার প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন বেশি প্রোটিন খাওয়ার চেষ্টা করছেন। আর ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ তরুণ প্রজন্ম পেটের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ফাইবারের দিকে ঝুঁকছেন।
পুষ্টিবিদরা কী বলছেন?
নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আন্দ্রেয়া গ্লেন মনে করেন, ফাইবার নিয়ে আগ্রহ তৈরি হওয়াটা মোটেই খারাপ কিছু নয়। অন্যান্য অনেক স্বাস্থ্য ট্রেন্ডের তুলনায় এটাকে তিনি অনেক বেশি যুক্তিসংগত বলে মনে করেন।
ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির পুষ্টিবিদ সামান্থা স্ন্যাশল বলেছেন, প্রোটিন অনেকদিন ধরেই সবার মনোযোগ পেয়ে আসছে, কিন্তু ফাইবারকে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাই এখন মানুষ ফাইবারের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে দেখে তিনি খুশি।
তবে ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আর্চ মেইনাস সতর্ক করে বলেছেন, প্রতিদিনের চাহিদামতো পুষ্টি নেওয়া এক জিনিস, আর “একটা ভালো তো পাঁচটা আরও ভালো” — এই মানসিকতা সম্পূর্ণ আলাদা। দ্বিতীয়টা মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়।

ইনফ্লুয়েন্সারদের পরামর্শে কতটা ভরসা রাখা উচিত?
অধ্যাপক মেইনাস আরও বলেছেন, অনলাইনে যারা স্বাস্থ্য পরামর্শ দেন তাদের বেশিরভাগই প্রশিক্ষিত বিজ্ঞানী নন। অনেকের নিজস্ব পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্য থাকে। “নিজেই গবেষণা করব” — এই মনোভাব সাধারণ মানুষকে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।
তাহলে কতটুকু খাওয়া উচিত?
আন্দ্রেয়া গ্লেন জানাচ্ছেন, বয়স ও লিঙ্গভেদে দিনে ২৫ থেকে ৩৮ গ্রাম ফাইবার খাওয়া যথেষ্ট। মটরশুঁটি, ফল, সবজি, বাদাম এবং ওটস বা কিনোয়ার মতো গোটা শস্য খেলে ক্যানসারের ঝুঁকি কমে, রক্তে কোলেস্টেরল ও চিনির মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে থাকে।
সহজ নিয়ম হলো — সকালের নাস্তায় কিছু গোটা শস্য বা ফল রাখুন, আর দুপুর ও রাতের খাবারে অর্ধেক থালা সবজি দিয়ে ভরুন। এভাবে কষ্ট করে গণনা না করেও প্রতিদিনের ফাইবারের চাহিদা মিটে যাবে।
তবে হঠাৎ করে অনেক বেশি ফাইবার খাওয়া শুরু করলে হজমে সমস্যা হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সামান্থা। ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ানোটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
সবশেষ কথা হলো, পাউডার বা সাপ্লিমেন্ট কখনোই আস্ত প্রাকৃতিক খাবারের বিকল্প হতে পারে না। আর কোনো একটি পুষ্টি উপাদান আপনার সব সমস্যার সমাধান করে দেবে — এই ধারণাটা মাথা থেকে বের করে দেওয়াই ভালো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















