চীনে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, আর এই পরিবর্তন দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে বড় ধরনের চাপে ফেলছে। সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশটিতে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ কোটিতে পৌঁছাবে, যা বিশ্বের বৃহৎ জনসংখ্যার একটি বড় অংশের সমান।
এই বাস্তবতায় প্রবীণদের যত্ন, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে সরকার ও বেসরকারি খাতকে।
বয়স্কদের যত্নে বদলে যাচ্ছে ধারণা
একসময় চীনে ধারণা ছিল, পরিবারই বয়স্কদের দেখাশোনা করবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা বদলে যাচ্ছে। এখন অনেক পরিবার কর্মব্যস্ততার কারণে প্রবীণদের দেখভালের সময় পাচ্ছে না। ফলে ধীরে ধীরে বৃদ্ধনিবাস বা প্রাতিষ্ঠানিক যত্নের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

বিশেষ করে করোনা-পরবর্তী সময়ে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, যাঁরা আগে বাড়িতে থাকতে চাইতেন, তাঁরাও এখন পেশাদার সেবার দিকে ঝুঁকছেন।
বাজার বাড়ছে, বাড়ছে বিনিয়োগ
চীনে প্রবীণদের যত্নের বাজার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যে এই খাতের আকার কয়েকশ’ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশজুড়ে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান এই সেবা দিচ্ছে এবং লাখো কর্মী এতে যুক্ত।
দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানও এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। উন্নত সেবা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আরামদায়ক জীবনযাপন নিশ্চিত করতে নতুন ধরনের আবাসন ও সেবার ধারণা চালু হচ্ছে।
পরিবারভিত্তিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
চীনে দীর্ঘদিন ধরে “৯০-৭-৩” মডেল অনুসরণ করা হয়েছে, যেখানে অধিকাংশ বয়স্ক মানুষ পরিবারের সঙ্গেই থাকেন। কিন্তু এক সন্তান নীতি এবং শহরমুখী অভিবাসনের কারণে পরিবার ছোট হয়ে যাওয়ায় এই মডেল এখন চাপের মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থা টেকসই রাখা কঠিন হয়ে পড়বে, তাই বিকল্প সেবা ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া জরুরি।
সরকারি উদ্যোগ ও সংস্কার
বর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। চিকিৎসা ও প্রবীণসেবাকে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, চালু হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি সেবাবিমা। পাশাপাশি প্রবীণদের জন্য ভর্তুকি, পুনর্বাসন সহায়তা এবং খাবার সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
এসব উদ্যোগের ফলে অনেক ক্ষেত্রে সেবার খরচ কমছে এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসছে।
প্রযুক্তি ও নতুন ধারণার ব্যবহার
নতুন প্রজন্মের সেবা প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। যেমন, রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণে সেন্সর, ওষুধ ব্যবস্থাপনায় স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা যুক্ত করা হচ্ছে।
এতে শুধু সেবার মানই বাড়ছে না, বরং কর্মীর ঘাটতিও কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যাচ্ছে।
মানবিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ

প্রবীণদের জন্য শুধু চিকিৎসা নয়, মানসিক ও সামাজিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ভ্রমণ ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে বাসিন্দাদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা করছে।
অনেক প্রবীণই বলছেন, এসব প্রতিষ্ঠানে তাঁরা নতুন পরিবার খুঁজে পাচ্ছেন, যেখানে সেবাকর্মীরাই তাঁদের আপনজন হয়ে উঠছেন।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
তবে এই খাতে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দক্ষ কর্মীর অভাব, খরচের চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত বয়স্ক হওয়া জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিকল্পনা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
চীনের এই অভিজ্ঞতা বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে, কারণ অনেক দেশই একই ধরনের জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের মুখোমুখি হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















