অমিতাভ ঘোষের নতুন উপন্যাস ‘ঘোস্ট-আই’ মূলত মাছকে ঘিরে এক গভীর প্রেমের প্রকাশ—প্রথমে বাঙালি খাদ্যসংস্কৃতির গভীর আবেগে উদযাপন, তারপর পরিবেশগত শোকের মধ্য দিয়ে তার পুনরাবিষ্কার। এক ধনী, কঠোর নিরামিষভোজী মারওয়ারি পরিবারের ঘরে তিন বছরের শিশু বর্ষা গুপ্তা দুপুরের খাবারে মাছ-ভাত চাইতে থাকে। “আমি মাছ-ভাত খাবো। মাছ দাও,”—এই দাবিতে সে অন্য কিছু খেতে অস্বীকার করে। জৈন ধর্মাবলম্বী পরিবারটি উদ্বিগ্ন হয়ে মনোবিজ্ঞানীর শরণাপন্ন হয়।
সেখানেই গল্পের সূচনা। বর্ষা দাবি করে, তার পূর্বজন্মে সে সুন্দরবনের এক দরিদ্র জেলে পরিবারের মেয়ে ছিল এবং মাছ সম্পর্কে তার অস্বাভাবিক জ্ঞান রয়েছে। মনোবিজ্ঞানী শোমা বিষয়টি যাচাই করতে উদ্যোগী হন। তিনি বাংলার জলজ প্রাণী নিয়ে বই পড়তে শুরু করেন এবং রান্নার জন্য বাজার থেকে বিভিন্ন ধরনের মাছ সংগ্রহ করে শিশুটিকে পরীক্ষা করেন।
তিন ধরনের মাছ দিয়ে তৈরি খাবার পরিবেশন করা হলে বর্ষা নিখুঁতভাবে চিনে ফেলে কোনটি রুই আর কোনটি কাতলা—যা অনেক অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞও আলাদা করতে পারেন না। এমনকি দই মাছে কোন মাছ ব্যবহার হয়েছে তাও সে বুঝতে পারে। তবে আফ্রিকান প্রজাতির তেলাপিয়া, যা নতুন করে কলকাতায় চাষ হচ্ছে, সেটি সে চিনতে পারে না। সেটিকে কই মাছ হিসেবে পরিবেশন করার চেষ্টা করা হলেও বর্ষা বুঝতে পারে এটি অপরিচিত মাছ। তার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে পূর্বজন্মের একটি দৃশ্য—কই মাছ গাছ বেয়ে উঠে ডালের কাছে গিয়ে পাকা ফলের মতো পানিতে পড়ে যাচ্ছে।
পঞ্চাশ বছর পর, মহামারির সময়, শোমার ভাতিজা দিনু—যিনি নিউইয়র্কে বসবাসকারী এক মধ্যবয়সী প্রাচীনপণ্যের ব্যবসায়ী—একটি ফোন পান। ফোন করেন টিপু, সুন্দরবনের এক তরুণ জলবায়ু আন্দোলনকর্মী। তার মতে, জলবায়ু বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে মানুষকে নিজের পরিচিত পরিবেশেই থাকতে হবে, কারণ প্রকৃতি তাকে চিনে এবং বাঁচতে শেখায়।

একটি সাপের কামড়ে টিপুর চোখের রঙ বদলে যায়, এবং সে হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘ঘোস্ট-আই’—যারা একই সঙ্গে দৃশ্যমান ও গভীর এক অন্য জগত দেখতে পারে। এদের একটি নেটওয়ার্কও রয়েছে। একটি ঘূর্ণিঝড় আসছে—প্রকৃতির এই বিপর্যয়ের পূর্বাভাস তারা পায় আগাম। শোমা বৃদ্ধ বয়সে বিভ্রান্তির মধ্যে থেকেও ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। ২০২০ সালে বঙ্গোপসাগরে আঘাত হানা সেই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিঃস্ব করে দেয়।
টিপু দিনুকে অনুরোধ করে বর্ষার খোঁজ বের করতে—কারণ তার স্মৃতিই সুন্দরবন রক্ষার চাবিকাঠি হতে পারে। দিনু কথা বলার বদলে লেখার মাধ্যমে বিষয়টি অনুসন্ধান শুরু করেন। তবে তার মনে প্রশ্ন জাগে—এই সব অলৌকিক বিশ্বাসে ভরসা করে আদৌ কি কোনো বাস্তব ফল পাওয়া সম্ভব?
উপন্যাসটি বাস্তবতা ও জাদুবাস্তবতার এক সূক্ষ্ম সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে। এটি অমিতাভ ঘোষের পূর্ববর্তী কাজগুলোর ধারাবাহিকতায় নির্মিত—বিশেষ করে ‘দ্য হাঙ্গরি টাইড’ ও ‘গান আইল্যান্ড’-এর সঙ্গে এর ভাবগত সম্পর্ক রয়েছে। এখানে পশ্চিমা যুক্তিবাদী আধুনিকতা ও ভারতীয় ঐতিহ্যগত পরিবেশজ্ঞান মুখোমুখি হয়েছে।
লেখক দেখিয়েছেন, আধুনিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পূর্বজন্মের স্মৃতি মানসিক রোগ নয়, ভবিষ্যদ্বাণী উদ্বেগ নয়—বরং এগুলো আরেক ধরনের বাস্তবতা, যা আধ্যাত্মিক হলেও সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। পৃথিবীর বর্তমান সংকট বুঝতে হলে আধুনিকতা যেসব জ্ঞানকে উপেক্ষা করেছে, সেগুলোর দিকে তাকাতে হবে।
ষাট ও সত্তরের দশকের কলকাতার পটভূমিতে এই রহস্যময়তা আরও গভীর হয়ে ওঠে। সেই সময়ের শহরটি ছিল বাস্তুচ্যুতি ও নির্বাসনের ছায়ায় আচ্ছন্ন। আবার মহামারির সময়ের দৃশ্যগুলোতে আকাশে বিশাল ড্রোনের আবির্ভাব কিংবা মাছের দোকানে অদ্ভুত আচরণ করা মাছ—সবকিছু মিলিয়ে এক অস্বস্তিকর অথচ বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি হয়।
গল্পে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতীক হিসেবে টিপু গুরুত্বপূর্ণ—তার আচরণ অদ্ভুত হলেও সে আশার প্রতিনিধিত্ব করে। দিনু তার পারিবারিক স্মৃতি ও ইতিহাস একত্র করে এমন একটি বর্ণনা তৈরি করেন যা বাস্তব পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করে।
এবং এই উপন্যাসে খাবারের বর্ণনাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দিনু শৈশবের স্বাদ ফিরিয়ে আনতে অনলাইনে গ্রামীণ বাঙালি নারীদের রান্নার ভিডিও দেখে সরিষার তেল তৈরি করেন—বীজ ভেজে, পিষে, কাপড়ে বেঁধে চেপে ধরে। এমনকি শেষ পর্যায়ে বাথরুমে পা দিয়ে চাপ দিয়ে তেল বের করার দৃশ্যও রয়েছে।
এই খাদ্যবর্ণনা এতটাই জীবন্ত যে নিরামিষভোজী পাঠকেরও ক্ষুধা জাগে।
সৌদামিনী জৈন 


















