“মূর্খ, মাতাল এবং যুক্তরাষ্ট্র—এই তিনের জন্য ঈশ্বরের বিশেষ আশীর্বাদ রয়েছে।” উনিশ শতকের শেষভাগে অট্টো ফন বিসমার্কের এই মন্তব্যটি বর্তমান যুদ্ধের প্রভাবের দিকে তাকালে আবার মনে পড়ে।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট যাই ভুল সিদ্ধান্ত নিন না কেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই তুলনামূলক দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এর অর্থনীতির শক্তি, ব্যাপ্তি এবং আমাদের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগুলিতে এর অগ্রগতি সেই পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করবে। কিন্তু এই নতুন বিশ্বে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ কীভাবে টিকে থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক বেশি।
বৈপরীত্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় আমরা অনেক বেশি বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতি—যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে মোট দেশজ উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশ বাণিজ্যনির্ভর, সেখানে আমাদের ক্ষেত্রে তা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। ফলে ‘প্যাক্স আমেরিকানা’ বা যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভাঙন আমাদের জন্য বেশি ক্ষতিকর হতে পারে।
যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব থেকে বড় সুবিধা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে এবং আন্তর্জাতিক পণ্য ও সেবা সরবরাহের স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে—যেমন সমুদ্রপথে চলাচলের স্বাধীনতা। কিন্তু সেই পুরনো ব্যবস্থাটি এখন ভেঙে পড়ছে। যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে পারেনি এবং এখনও আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সংগ্রাম করছে। বর্তমান অবরোধ ব্যর্থ হলে তারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একসময় বলা হতো, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের মূল কারণ ছিল তেল। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই জ্বালানির নেট রপ্তানিকারক দেশ। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার প্রয়োজনীয় জ্বালানির ৫৭ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্য ৪৪ শতাংশ আমদানি করে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ০.৫ শতাংশ কমতে পারে, ইউরোজোনে তা ০.৪ শতাংশ কমবে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি ০.৩ শতাংশ বাড়তে পারে। এটি দেখায়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ এবং শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য এমন সংকট মোকাবিলা করা তুলনামূলক সহজ।
মধ্যমেয়াদে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো—জ্বালানিতে স্বনির্ভর যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ রক্ষার দায়িত্ব অন্যদের ওপর ছেড়ে দিতে পারে। স্বনির্ভরতা সহজেই স্বার্থপরতায় পরিণত হতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে বারবার বলছেন যে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখা অন্য দেশগুলোর প্রয়োজন, যুক্তরাষ্ট্রের নয়—এটি তারই ইঙ্গিত।
এটা ভাবা ভুল হবে যে চীন সহজেই এই দায়িত্ব নেবে। বরং চীন জ্বালানি প্রবাহকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যেমনটি তারা অন্য ক্ষেত্রেও করে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে সবকিছু করতে হবে—উত্তর সাগরে নতুন খনন, পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ। এই কঠোর বাস্তবতার বিশ্বে জ্বালানি নীতিতে আদর্শিক হওয়ার সুযোগ নেই।
এই যুদ্ধের স্পষ্ট ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে একটি হলো ন্যাটো। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিল যে অনেক দেশ জোটে যথেষ্ট অবদান রাখছে না, তবে এখন সেই পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। ২০২৫ সালে ন্যাটো সদস্যরা ২০২৪ সালের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি প্রতিরক্ষা ব্যয় করেছে।
আমি চাইতাম বলতে যে ২০২৪ সালে পোল্যান্ডে আমার বক্তব্য—যেখানে আমি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেছিলাম এবং অন্যদেরও তা অনুসরণ করতে বলেছিলাম—এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ। তখন আমি সতর্ক করেছিলাম, “আমরা যদি নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় ত্যাগ স্বীকার না করি, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সবসময় সব দায়িত্ব নেবে—এমনটা ভাবা ঠিক নয়।”
তবে যেকোনো কারণেই হোক, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ছে—এটি ইতিবাচক। এখন ন্যাটোর কয়েকটি দেশ তাদের জিডিপির বড় অংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের থেকেও বেশি। কিন্তু যুক্তরাজ্যের দোদুল্যমান অবস্থান এই প্রেক্ষাপটে আরও ক্ষতিকর। যথাযথ অর্থায়ন ছাড়া কৌশলগত পর্যালোচনা কোনো কাজে আসে না। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমরা নিজেদের গুরুত্বই কমিয়ে ফেলতে পারি।
যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ন্যাটোকে “কাগুজে বাঘ” বলে উল্লেখ করেন, তখন জোটের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। বর্তমান মহাসচিব মার্ক রুটে জোটকে এই সংকট থেকে বের করে আনতে কাজ করছেন, কিন্তু তিনি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য পরিবর্তন করতে পারবেন না।

আগামী কয়েক মাস ন্যাটোর জন্য আরও কঠিন হবে। যুক্তরাষ্ট্র তার ঘাঁটিগুলোর ওপর বিধিনিষেধের প্রতিক্রিয়ায় গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তারা যুক্তি দিতে পারে, এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা যুক্তরাষ্ট্রের হওয়া উচিত।
কিছু সমাধান হয়তো সম্ভব—যেমন সাইপ্রাসে যুক্তরাজ্যের সার্বভৌম ঘাঁটির মতো কোনো ব্যবস্থা। কিন্তু এমন সমাধানে পৌঁছানোর সদিচ্ছা আছে বলে মনে হয় না। বরং মিত্রদের মধ্যে নতুন বিভক্তি তৈরি হতে পারে, যা কেবল মস্কোর জন্যই সুবিধাজনক হবে।
এই সবকিছু ঘটছে এমন সময়ে, যখন ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে যুদ্ধ চলছে। ইরান সংঘাত ইউক্রেনের কৌশলগত গুরুত্বও তুলে ধরেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার ইউক্রেনের সঙ্গে দশ বছরের প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে—ড্রোন মোকাবিলায় ইউক্রেনের দক্ষতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবুও ওয়াশিংটন কিয়েভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে—যে অঞ্চল তারা হারায়নি, সেটি ছেড়ে দিয়ে শান্তি চুক্তি করতে। এমনকি মস্কো সাম্প্রতিক সময়ে তেহরানকে সহায়তা দেওয়ার পরও এই চাপ অব্যাহত রয়েছে।
ইউরোপের নিরাপত্তা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল—এটাই বাস্তবতা। তাই নানা সমস্যার মধ্যেও ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চায়।
এই যুদ্ধ আবারও দেখিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সীমিত। জ্বালানিতে স্বনির্ভর যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভবিষ্যতে নিজস্ব অঞ্চলে মনোযোগ দেবে। কিন্তু এতে নতুন অস্থিরতা তৈরি হবে। খুব শিগগিরই আমরা বুঝতে পারব, কেন যুক্তরাষ্ট্রকে অপরিহার্য দেশ বলা হয়।
ঋষি সুনাক 



















