০৭:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
নতুন বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকার লড়াই: প্রযুক্তি, জ্ঞান ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের সময় নেহরুর উত্তরাধিকার মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন মোদি: দীর্ঘতম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দিনে কংগ্রেসের তীব্র আক্রমণ নেহরুকে ছাড়িয়ে টানা সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোদি, মন্ত্রিসভার অভিনন্দন কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মানসিক সক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যায়াম হতে পারে কার্যকর: নতুন গবেষণা সরকারের অনুমোদন: মরক্কো থেকে ৬০ হাজার টন টিএসপি সার আমদানি, ডালও কিনছে সরকার ইসলামী ব্যাংকের অস্থিরতায় উদ্বিগ্ন ব্যাংকাররা, আস্থার সংকটের আশঙ্কা রাজশাহীতে সড়ক দুর্ঘটনায় ব্যাংক কর্মকর্তাসহ নিহত ২ হামে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৬৩৯, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ শিশুর মৃত্যু অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে জোর দেওয়ার আহ্বান, আজ আসছে ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনঃ ভারতের জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে কমতে শুরু করবে 

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকার লড়াই: প্রযুক্তি, জ্ঞান ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের সময়

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান অস্থিরতা কেবল আরেকটি আঞ্চলিক সংঘাতের গল্প নয়। সাম্প্রতিক যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা মিলিয়ে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা ইঙ্গিত দিচ্ছে একটি গভীর পরিবর্তনের দিকে। কয়েক দশক ধরে যে আন্তর্জাতিক কাঠামো একটি মাত্র পরাশক্তিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে, তা দ্রুত রূপ বদলাচ্ছে। তার জায়গায় উঠে আসছে বহু-কেন্দ্রিক এক বিশ্ব, যেখানে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কৌশলগত প্রভাবের মানচিত্র নতুনভাবে আঁকা হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষমতার কেন্দ্র ধীরে ধীরে এশিয়ার দিকে সরে আসা। উৎপাদন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অবকাঠামো ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে এশিয়ার কিছু দেশ এখন শুধু অনুসারী নয়, বরং নেতৃত্বের আসনে বসছে। ফলে যেসব দেশ পুরোনো বাস্তবতায় আটকে থাকবে, তাদের জন্য ভবিষ্যৎ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

এমন এক সময়ে পাকিস্তানের মতো দেশের সামনে একই সঙ্গে সুযোগ ও সংকট উপস্থিত। ভৌগোলিক অবস্থান, বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী, আঞ্চলিক সংযোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব—সব মিলিয়ে দেশটির সম্ভাবনা কম নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব সুবিধা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার নিম্নমান এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা দেশটিকে এগোতে দিচ্ছে না।

সমস্যার শিকড় কেবল অর্থনীতিতে নয়; এটি চিন্তাধারা, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র পরিচালনার গভীরে প্রোথিত। উন্নয়নের জন্য শুধু সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন শাসনব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ যেমন জরুরি, তেমনি জাতীয় পর্যায়ে নীতি নির্ধারণে দক্ষতা ও জ্ঞানের মূল্যায়নও অপরিহার্য।

Poor Quality Education Holding Back South Asia, World Bank says

দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে জনপ্রিয়তার চেয়ে যোগ্যতা বেশি গুরুত্ব পায়। শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য বা শিল্প—প্রতিটি খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের সক্রিয় ভূমিকা থাকতে হবে। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে; ফলে কেবল রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দিয়ে নয়, জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব দিয়েই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব।

তবে এই রূপান্তরের মূল ভিত্তি শিক্ষা। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, কোনো দেশই শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা ও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা ছাড়া টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে এখনো লাখ লাখ শিশু মানসম্মত শিক্ষার বাইরে। পাঠ্যক্রমে মুখস্থবিদ্যার আধিক্য, সমালোচনামূলক চিন্তার ঘাটতি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার দুর্বলতা ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে কল্পনা করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি, রোবোটিক্স, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, তথ্যবিজ্ঞান ও উদ্যোক্তা দক্ষতাকে শিক্ষার মূলধারায় নিয়ে আসা ছাড়া বিকল্প নেই। একই সঙ্গে কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে। শিল্পের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ যত শক্তিশালী হবে, অর্থনীতির ভিত্তিও তত মজবুত হবে।

এখানেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব সামনে আসে। অবকাঠামো নির্মাণের বাইরে গিয়ে প্রযুক্তি হস্তান্তর, গবেষণা সহযোগিতা এবং শিল্প উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা গেলে তা উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবনের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে। শুধুমাত্র কাঁচামাল বা স্বল্পমূল্যের পণ্যের ওপর নির্ভর করে আর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। যে দেশগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং গবেষণাকে অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে পারবে, তারাই আগামী দশকের নেতৃত্ব দেবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও এর প্রভাব | Practiceclub

বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, নগর পরিকল্পনা এবং আর্থিক খাতে এর ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে জাতীয় পর্যায়ে সুসংহত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশল গ্রহণ করা এখন বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন।

একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাও বদলে গেছে। একসময় সামরিক শক্তি ও অস্ত্রভাণ্ডারকে নিরাপত্তার প্রধান উপাদান হিসেবে দেখা হতো। এখন সাইবার নিরাপত্তা, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, উপগ্রহ ব্যবস্থা, ড্রোন, জৈবপ্রযুক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তিগত সক্ষমতা সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী রাখা কঠিন।

এই বাস্তবতায় একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ আর শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ, ভৌগোলিক আয়তন বা সামরিক শক্তি নয়। সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো দক্ষ মানুষ, জ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা চীনের অভিজ্ঞতা দেখায় যে মানবসম্পদে বিনিয়োগই জাতীয় শক্তির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।

বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে যে দেশগুলো দূরদর্শিতা, বৈজ্ঞানিক মনোভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার ওপর ভর করে এগোবে, তারাই ভবিষ্যৎ গড়বে। আর যারা পরিবর্তনের প্রয়োজন বুঝেও পদক্ষেপ নিতে দেরি করবে, তারা কেবল অন্যের তৈরি বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রামে ব্যস্ত থাকবে। নতুন বিশ্বব্যবস্থার যুগে সাফল্যের চাবিকাঠি আর ক্ষমতার প্রদর্শনে নয়, বরং জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং দক্ষতার ওপর নির্মিত রাষ্ট্র গঠনে নিহিত।

জনপ্রিয় সংবাদ

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকার লড়াই: প্রযুক্তি, জ্ঞান ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের সময়

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকার লড়াই: প্রযুক্তি, জ্ঞান ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের সময়

০৭:০০:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান অস্থিরতা কেবল আরেকটি আঞ্চলিক সংঘাতের গল্প নয়। সাম্প্রতিক যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা মিলিয়ে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা ইঙ্গিত দিচ্ছে একটি গভীর পরিবর্তনের দিকে। কয়েক দশক ধরে যে আন্তর্জাতিক কাঠামো একটি মাত্র পরাশক্তিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে, তা দ্রুত রূপ বদলাচ্ছে। তার জায়গায় উঠে আসছে বহু-কেন্দ্রিক এক বিশ্ব, যেখানে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কৌশলগত প্রভাবের মানচিত্র নতুনভাবে আঁকা হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষমতার কেন্দ্র ধীরে ধীরে এশিয়ার দিকে সরে আসা। উৎপাদন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অবকাঠামো ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে এশিয়ার কিছু দেশ এখন শুধু অনুসারী নয়, বরং নেতৃত্বের আসনে বসছে। ফলে যেসব দেশ পুরোনো বাস্তবতায় আটকে থাকবে, তাদের জন্য ভবিষ্যৎ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

এমন এক সময়ে পাকিস্তানের মতো দেশের সামনে একই সঙ্গে সুযোগ ও সংকট উপস্থিত। ভৌগোলিক অবস্থান, বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী, আঞ্চলিক সংযোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব—সব মিলিয়ে দেশটির সম্ভাবনা কম নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব সুবিধা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার নিম্নমান এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা দেশটিকে এগোতে দিচ্ছে না।

সমস্যার শিকড় কেবল অর্থনীতিতে নয়; এটি চিন্তাধারা, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র পরিচালনার গভীরে প্রোথিত। উন্নয়নের জন্য শুধু সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন শাসনব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ যেমন জরুরি, তেমনি জাতীয় পর্যায়ে নীতি নির্ধারণে দক্ষতা ও জ্ঞানের মূল্যায়নও অপরিহার্য।

Poor Quality Education Holding Back South Asia, World Bank says

দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে জনপ্রিয়তার চেয়ে যোগ্যতা বেশি গুরুত্ব পায়। শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য বা শিল্প—প্রতিটি খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের সক্রিয় ভূমিকা থাকতে হবে। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে; ফলে কেবল রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দিয়ে নয়, জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব দিয়েই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব।

তবে এই রূপান্তরের মূল ভিত্তি শিক্ষা। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, কোনো দেশই শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা ও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা ছাড়া টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে এখনো লাখ লাখ শিশু মানসম্মত শিক্ষার বাইরে। পাঠ্যক্রমে মুখস্থবিদ্যার আধিক্য, সমালোচনামূলক চিন্তার ঘাটতি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার দুর্বলতা ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে কল্পনা করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি, রোবোটিক্স, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, তথ্যবিজ্ঞান ও উদ্যোক্তা দক্ষতাকে শিক্ষার মূলধারায় নিয়ে আসা ছাড়া বিকল্প নেই। একই সঙ্গে কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে। শিল্পের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ যত শক্তিশালী হবে, অর্থনীতির ভিত্তিও তত মজবুত হবে।

এখানেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব সামনে আসে। অবকাঠামো নির্মাণের বাইরে গিয়ে প্রযুক্তি হস্তান্তর, গবেষণা সহযোগিতা এবং শিল্প উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা গেলে তা উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবনের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে। শুধুমাত্র কাঁচামাল বা স্বল্পমূল্যের পণ্যের ওপর নির্ভর করে আর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। যে দেশগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং গবেষণাকে অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে পারবে, তারাই আগামী দশকের নেতৃত্ব দেবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও এর প্রভাব | Practiceclub

বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, নগর পরিকল্পনা এবং আর্থিক খাতে এর ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে জাতীয় পর্যায়ে সুসংহত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশল গ্রহণ করা এখন বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন।

একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাও বদলে গেছে। একসময় সামরিক শক্তি ও অস্ত্রভাণ্ডারকে নিরাপত্তার প্রধান উপাদান হিসেবে দেখা হতো। এখন সাইবার নিরাপত্তা, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, উপগ্রহ ব্যবস্থা, ড্রোন, জৈবপ্রযুক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তিগত সক্ষমতা সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী রাখা কঠিন।

এই বাস্তবতায় একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ আর শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ, ভৌগোলিক আয়তন বা সামরিক শক্তি নয়। সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো দক্ষ মানুষ, জ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা চীনের অভিজ্ঞতা দেখায় যে মানবসম্পদে বিনিয়োগই জাতীয় শক্তির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।

বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে যে দেশগুলো দূরদর্শিতা, বৈজ্ঞানিক মনোভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার ওপর ভর করে এগোবে, তারাই ভবিষ্যৎ গড়বে। আর যারা পরিবর্তনের প্রয়োজন বুঝেও পদক্ষেপ নিতে দেরি করবে, তারা কেবল অন্যের তৈরি বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রামে ব্যস্ত থাকবে। নতুন বিশ্বব্যবস্থার যুগে সাফল্যের চাবিকাঠি আর ক্ষমতার প্রদর্শনে নয়, বরং জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং দক্ষতার ওপর নির্মিত রাষ্ট্র গঠনে নিহিত।