কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ২৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ১০ আগস্ট দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পে বহু ভবন ধসে পড়ে। পরবর্তী কম্পনেও নতুন করে বেশ কিছু স্থাপনা ভেঙে পড়ে। ভয়াবহ এই দুর্যোগে দেশটির নতুন সরকারের দ্রুত প্রতিক্রিয়া প্রশংসা পেলেও দুর্গম ও দরিদ্র অঞ্চলগুলোর উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে বড় ধরনের বৈষম্য সামনে এসেছে।
ধ্বংসস্তূপে জীবনের শেষ লড়াই
চোকো প্রদেশের রাজধানী কুইবদো ভূমিকম্পের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। শহরটির একটি চারতলা ভবন ধসে এখন সেখানে পড়ে আছে কেবল কংক্রিটের স্তূপ। উদ্ধারকর্মীরা ভারী যন্ত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভূমিকম্পের পর জীবিত মানুষ উদ্ধারের জন্য প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও কুইবদোতে উদ্ধারকাজের গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও তাঁদের মধ্যে দুজন পরে মারা যান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়েছে। আলবের্তো নামে এক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষায়, স্থানীয় প্রশাসনের অবস্থা এতটাই দুর্বল যে বিপর্যয়ের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো সক্ষমতাও সেখানে সীমিত।
সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশেই সবচেয়ে বড় সংকট
চোকো কলম্বিয়ার সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশ। এখানকার মানুষের বড় একটি অংশ আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। দারিদ্র্যের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র অপরাধী গোষ্ঠীর চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
কুইবদোর হাসপাতালটিই সেখানে মৌলিক অস্ত্রোপচার সুবিধা দেওয়া একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র। ভূমিকম্পের পর হাসপাতাল ও অন্যান্য জরুরি সেবার ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়।
বাসিন্দা রোসা মার্সেদেস ধ্বংস হয়ে যাওয়া নিজের অ্যাপার্টমেন্টের দিকে তাকিয়ে বলেন, তাঁদের পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই, কিছুই নেই। সবচেয়ে বড় হতাশা হলো, বিপর্যয়ের পরও কেউ এসে তাঁদের খোঁজ নেয়নি।
এই অভিজ্ঞতা চোকোর মানুষের দীর্ঘদিনের একটি অভিযোগকে আরও সামনে এনেছে—রাষ্ট্র তাদের যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না।
ধনী অঞ্চলে উদ্ধার তৎপরতা তুলনামূলক দ্রুত
চোকোর পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর চিত্রে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। পাশের ভালে দেল কাউকা অঞ্চলে উদ্ধারকারী দল দ্রুত পৌঁছাতে পেরেছে। রাজধানী বোগোতা থেকেও বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো হয়েছে।
অঞ্চলটির রাজধানী কালিতে ধ্বংসস্তূপ থেকে ৮৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। মানিসালেস ও পেরেইরার মতো ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোতেও স্থলপথে দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধার সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
এখন পর্যন্ত ভূমিকম্পে নিহতদের অর্ধেকেরও বেশি এই তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ অঞ্চলে মারা গেছেন। তবে চোকোর অনেক মানুষ ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঘরে বসবাস করায় সেখানে প্রাণহানি তুলনামূলক কম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় বড় পরীক্ষা
নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় এই ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর সরকারের জন্য এটি ছিল প্রথম বড় জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলার পরীক্ষা।
সরকার দ্রুত পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। মন্ত্রিসভার সদস্যদের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। কুইবদো সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ক্ষতিগ্রস্তদের অস্থায়ী আবাসনের সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে মাঠপর্যায়ে সেই সহায়তা কত দ্রুত পৌঁছাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কারণ দুর্গম চোকোতে প্রশাসনিক দুর্বলতা, অবকাঠামোর অভাব এবং যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা ত্রাণ কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলেছে।
পুনর্গঠনের অর্থ কোথা থেকে আসবে
ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলানোর পাশাপাশি নতুন সরকারকে এখন আরেকটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে—পুনর্গঠনের বিপুল অর্থ আসবে কোথা থেকে।
সরকার ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। এর ফলে সংসদের স্বাভাবিক অনুমোদন প্রক্রিয়া এড়িয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের জন্য বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
কিন্তু দুর্যোগ মোকাবিলার জাতীয় সংস্থাটিও আর্থিক সংকটে রয়েছে। গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে সংস্থাটির অর্থভাণ্ডার দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে ভূমিকম্পে ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি, সড়ক, চিকিৎসাকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্গঠন নতুন সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন আর্থিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতার কঠিন সংঘাত
ভূমিকম্প নতুন প্রেসিডেন্টকে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তব সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি করেছে।
নির্বাচনী প্রচারে তিনি রাজধানী বোগোতার ক্ষমতাকেন্দ্রিক অভিজাত রাজনীতির সমালোচনা করেছিলেন। এমনকি রাজধানীর বদলে নিজের শহর বারানকিয়াকে প্রশাসনের বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের কথাও বলেছিলেন।
কিন্তু জাতীয় দুর্যোগের সময় বাস্তবতা তাঁকে ভিন্ন শিক্ষা দিয়েছে। দেশের মন্ত্রণালয়, বড় সংবাদমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সহযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই বোগোতায় অবস্থিত। ফলে জাতীয় সংকটের সময় রাজধানী থেকে দূরে বসে কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা কতটা কঠিন, সেটিই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ক্ষমতা বদলের প্রস্তুতি না থাকায় বিপাকে নতুন সরকার
নতুন সরকারের আরেকটি দুর্বলতা সামনে এসেছে আগের সরকারের সঙ্গে দায়িত্ব হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না করার কারণে।
ক্ষমতা গ্রহণের আগে পুরোনো সরকারের কাছ থেকে প্রশাসনিক তথ্য, নথি ও কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বুঝে নেওয়ার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার জন্য নেওয়া এই সিদ্ধান্ত এখন সংকট মোকাবিলায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফলে নতুন প্রশাসনের হাতে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোতে এই ব্যবস্থা মোটামুটি কার্যকর হলেও চোকোর মতো দরিদ্র ও দুর্গম এলাকায় তার সীমাবদ্ধতা ভয়াবহভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।
ভূমিকম্প শুধু ভবন নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতাও কাঁপিয়ে দিয়েছে
কলম্বিয়ার এই ভূমিকম্প শুধু প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ধ্বংসের ঘটনা নয়; এটি দেশের সামাজিক ও প্রশাসনিক বৈষম্যও প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।
একদিকে দ্রুত উদ্ধার, বিশেষজ্ঞ দল এবং সরকারি সহায়তা পৌঁছে যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধ অঞ্চলে। অন্যদিকে চোকোর মতো দরিদ্র এলাকায় মানুষ পানি, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা ও উদ্ধার সরঞ্জামের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে।
নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য তাই ভূমিকম্প মোকাবিলা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামলানোর পরীক্ষা নয়। এটি রাষ্ট্রের দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো, দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বৈষম্য, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বাস্তব মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তারও পরীক্ষা।
কুইবদোর ধ্বংসস্তূপের পাশে অপেক্ষা করা মানুষগুলোর প্রশ্ন এখন একটাই—রাষ্ট্র কি সত্যিই তাদের পাশে দাঁড়াবে, নাকি দুর্যোগ কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারাও আবার বিস্মৃত হয়ে যাবে?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















