০৯:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
সাগরে ১৬ ঘণ্টা ভেসে থাকার পর বাবা ও দুই ছেলেকে জীবিত উদ্ধার ব্রিটিশ ব্যবসার নীরবতা: রাজনীতিতে কথা না বলার খেসারত দিচ্ছে ব্যবসায়ীরা মোগাদিশুতে ফিরছে স্বস্তি, তবে শান্তির আড়ালে রয়ে গেছে বড় শঙ্কা জাম্বিয়ার তামার সমৃদ্ধি, কিন্তু মানুষের ঘরে স্বস্তি কোথায়? মক্কা চুক্তি: সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা জোটে বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ কলম্বিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে ২৬৫ মৃত্যু, উদ্ধার তৎপরতায় বৈষম্যের অভিযোগ মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ইসলামের পতন, তবু শেষ হয়ে যায়নি মুসলিম ব্রাদারহুড ইউরোপকে এক করার অদৃশ্য কারিগর কারা? লেবার ও ব্যবসা: অ্যান্ডি বার্নহামের সামনে সম্পর্ক মেরামতের নতুন সুযোগ শান্তির কথা বলাই এখন রাশিয়ায় অপরাধ, নির্বাচনের দৌড় থেকে বাদ উদারপন্থী ইয়াব্লোকো

মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ইসলামের পতন, তবু শেষ হয়ে যায়নি মুসলিম ব্রাদারহুড

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে মুসলিম ব্রাদারহুড এখন আর আগের মতো শক্তিশালী নয়। একসময় যে সংগঠন আরব বসন্তের ঢেউয়ে মিসর ও তিউনিসিয়ার রাজনীতিতে বড় উত্থান ঘটিয়েছিল, আজ সেই সংগঠনই দমন-পীড়ন, নেতৃত্বের বিভক্তি, নির্বাসন ও রাজনৈতিক পরাজয়ে গভীর সংকটে। তবু ইতিহাস বলছে, ব্রাদারহুডকে মৃত ঘোষণা করার সময় এখনো আসেনি।

কারাগারের উত্তাপ যেন সংগঠনটির প্রতীক

তিউনিসের উপকণ্ঠে মর্নাগিয়া কারাগারে চলতি গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। সেখানেই গত ১৭ জুলাই ৮৫ বছর বয়সী রশিদ ঘানুশি জ্ঞান হারান। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শে অনুপ্রাণিত তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক দল আননাহদার প্রতিষ্ঠাতা।

ঘানুশির বর্তমান পরিণতি অনেকটা মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির করুণ পরিণতির কথা মনে করিয়ে দেয়। মুরসি ২০১২ সালে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে মিসরের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কারাগারেই ২০১৯ সালে তার মৃত্যু হয়।

ঘানুশির বন্দিত্ব শুধু একজন প্রবীণ ইসলামপন্থী নেতার দুর্দশার গল্প নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের দীর্ঘ রাজনৈতিক পশ্চাদপসরণেরও প্রতিচ্ছবি।

আরব বসন্তে যে উত্থান, পরে তারই পতন

দেড় দশক আগে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মিসরে ব্রাদারহুড-ঘনিষ্ঠ শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছেছিল। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টেও তাদের বড় রাজনৈতিক উপস্থিতি ছিল। কাতারের জনপ্রিয় আল জাজিরা তাদের রাজনৈতিক বার্তা আরব বিশ্বের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিত।

২০১০ সালের শেষ দিকে তিউনিসিয়া থেকে শুরু হয়ে ২০১১ সালে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া আরব বসন্তের প্রথম দিকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের একটি ছিল মুসলিম ব্রাদারহুড।

কিন্তু সেই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আরব বিশ্বের একের পর এক দেশে পুরোনো কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা ফিরে আসে। ব্রাদারহুডের নেতারা কারাগারে যান, অনেকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং সংগঠনের রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ আরও বাড়িয়েছে সংকট

গত এক বছরে সংগঠনটির ওপর চাপ আরও তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাদারহুডের বিভিন্ন শাখাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেয়।

মিসর ও জর্ডানের শাখাকে হামাসকে সহায়তার অভিযোগে বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। লেবাননের শাখাকেও বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলে আধুনিক জিহাদবাদের উৎসগুলোর আলোচনায় আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে ব্রাদারহুডের নামও উঠে এসেছে।

জর্ডান ২০২৫ সালের এপ্রিলেই সংগঠনটিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে। এরপর দেশটির রাজনৈতিক শাখা ইসলামিক অ্যাকশন ফ্রন্টের ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হয়।

সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখন অভ্যন্তরীণ বিভাজন

ব্রাদারহুডের সংকট শুধু বাইরের দমন-পীড়নের কারণে নয়। সংগঠনটির ভেতরেও গভীর বিভক্তি তৈরি হয়েছে।

২০২১ সাল থেকে সংগঠনটি কার্যত দুটি প্রধান শিবিরে বিভক্ত। লন্ডনে নির্বাসিত অবস্থায় সংগঠন পরিচালনা করা ইব্রাহিম মুনির তুরস্কে থাকা সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার পর বিরোধ আরও তীব্র হয়। অন্যদিকে মহমুদ হুসেইন দাবি করেন, মুনির নিজেই নেতৃত্ব থেকে অপসারিত হয়েছিলেন।

এখন দুই পক্ষের আলাদা নেতা, আলাদা শুরা পরিষদ এবং আলাদা সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। দুপক্ষই দাবি করে, তারাই প্রকৃত মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিনিধিত্ব করে।

মুনিরের মৃত্যুর পর তার পক্ষের নেতৃত্বে আসা সালাহ আবদেল হক যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে ইস্তাম্বুলভিত্তিক হুসেইনপন্থীরা স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা মনে করে না অন্য পক্ষ পুরো সংগঠনের হয়ে কথা বলার অধিকার রাখে।

ফলে অস্তিত্বের সংকটে থাকা সংগঠনটির দুই অংশও এক কণ্ঠে কথা বলতে পারছে না।

মিসরে ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা

মুসলিম ব্রাদারহুডের ঐতিহাসিক কেন্দ্র মিসরেও সংগঠনটির রাজনৈতিক অধ্যায়কে প্রায় মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।

সংগঠনটির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ বাদি কারাগারে রয়েছেন। প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ধর্মীয় উৎসবগুলোতে অনেক বন্দিকে ক্ষমা করলেও ব্রাদারহুডের নেতাদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ খুবই সীমিত।

একসময় সংগঠনটির সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের অর্থ জোগান দিত যে ব্যবসাগুলো, সেগুলোর বড় অংশও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদও অনেকটা সিসির পথ অনুসরণ করছেন। তার সরকারের হাতে ঘানুশির কারাবন্দিত্ব সেই পরিবর্তনেরই প্রতীক।

I Used to Be in the Muslim Brotherhood. Here's How You Defeat Terrorism |  Opinion - Newsweek

গাজায় হামাসের দুর্বলতাও প্রভাব ফেলেছে

ব্রাদারহুডের ঘনিষ্ঠ আদর্শিক সহযোগী হামাসও বড় ধাক্কা খেয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের দীর্ঘ যুদ্ধ হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ভূখণ্ডটির বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে এবং সংগঠনটির নেতাদের লক্ষ্য করে আঞ্চলিক পর্যায়েও অভিযান চলছে।

হামাস এখনো টিকে আছে, কিন্তু তার শক্তি আগের তুলনায় অনেক কম। গাজার মানুষের একটি অংশও সংগঠনটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

ফলে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা হামাসের দুর্বলতাও সংগঠনটির বৃহত্তর রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলেছে।

সিরিয়াতেও ইসলামপন্থীদের নতুন সমীকরণ

সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পরও ব্রাদারহুড বড় কোনো রাজনৈতিক সুবিধা পায়নি। বরং দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময়ে সংগঠনটি যখন সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল, তখন সুন্নি জিহাদি শক্তিগুলোই দামেস্ক দখলের লড়াইয়ে এগিয়ে যায়।

ফলে নতুন সিরিয়ার রাজনৈতিক কাঠামোয় ব্রাদারহুডের উপস্থিতি খুবই সীমিত। প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারার উপদেষ্টা আহমদ জেইদান, যার সঙ্গে ব্রাদারহুডের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে, এমনকি সিরীয় শাখার বিলুপ্তির পরামর্শও দিয়েছেন।

সিরীয় ইসলামপন্থী রাজনীতি নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, নতুন সিরিয়ায় রাজনৈতিক ইসলামের আগের ধরনের প্রাসঙ্গিকতা আর নেই।

কিন্তু ইতিহাস ব্রাদারহুডকে বারবার ফিরতে দেখেছে

তবু মুসলিম ব্রাদারহুডকে শেষ হয়ে গেছে বলা ঝুঁকিপূর্ণ। সংগঠনটির ইতিহাসই তার সবচেয়ে বড় কারণ।

১৯৪৮ সালে সংগঠনটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল। ১৯৫৪ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের আবারও কঠোরভাবে সংগঠনটিকে দমন করেন। ব্রাদারহুডের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক সাইয়্যিদ কুতুবকে ১৯৬৬ সালে ফাঁসি দেওয়া হয়।

পরবর্তী প্রায় চার দশক সংগঠনটি নিষিদ্ধ অবস্থায় থেকেছে। তবু ২০০৫ সালে তাদের সমর্থিত প্রার্থীরা মিসরের পার্লামেন্টে ৮৮টি আসন পেয়েছিলেন। মাত্র সাত বছর পর ২০১২ সালে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ব্রাদারহুডের প্রার্থী মুরসি দেশের প্রেসিডেন্ট হন।

অর্থাৎ সংগঠনটি বারবার দমন হয়েছে, কিন্তু পুরোপুরি বিলীন হয়নি।

যে ক্ষতগুলো এখনো ব্রাদারহুডকে টিকিয়ে রাখতে পারে

রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে ব্রাদারহুড দুর্বল হলেও এর জন্ম যে সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ থেকে, সেগুলো এখনো মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূর হয়নি।

মিসরের অর্থনীতি এখনো দুর্বল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থের ওপর দেশটির নির্ভরতা রয়েছে। তরুণ শিক্ষিতদের বড় অংশের কর্মসংস্থানও হতাশাজনক। তিউনিসিয়ার অর্থনৈতিক দুরবস্থাও আরব বসন্তের আগের সময়ের সমস্যাগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গাজা যুদ্ধ। আরব বিশ্বের অনেক মানুষের চোখে তাদের সরকারগুলো হয় দুর্বল, নয়তো ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের প্রতি নীরব বা সহযোগী।

এই পরিস্থিতিতে ব্রাদারহুডের পুরোনো বক্তব্য—আরব বিশ্বের সংকট কেবল অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক নয়, এর গভীরে রয়েছে আত্মমর্যাদা ও আধ্যাত্মিক অপমানবোধ—এখনো অনেক মানুষের কাছে অর্থবহ।

পতন নয়, হয়তো দীর্ঘ পুনর্গঠনের পথে

মুসলিম ব্রাদারহুডের শক্তি আজ অতীতের তুলনায় অনেক কম। নেতৃত্ব দ্বিধাবিভক্ত, রাজনৈতিক প্রভাব সংকুচিত, বহু দেশে সংগঠনটি নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং এর ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলোও বড় ধাক্কা খেয়েছে।

কিন্তু সামাজিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং আরব বিশ্বের আত্মমর্যাদার সংকট এখনো রয়ে গেছে। ব্রাদারহুড যে সামাজিক কল্যাণ ও আরব মর্যাদার আবেদনকে কেন্দ্র করে শিকড় গেড়েছিল, সেই শূন্যতাও পুরোপুরি পূরণ হয়নি।

তাই ২০২৮ সালের মার্চে মুসলিম ব্রাদারহুড যখন প্রতিষ্ঠার একশ বছর পূর্ণ করবে, তখন সংগঠনটি হয়তো আগের মতো ঐক্যবদ্ধ বা শক্তিশালী থাকবে না। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা বলছে, তাকে একেবারে মৃত মনে করাও ভুল হবে। নেতৃত্ব যতই বিভক্ত হোক, রাজনৈতিক ইসলাম হয়তো নতুন কোনো রূপে আবারও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক পতন ঘটেছে, কিন্তু তার সামাজিক ভিত্তি ও আদর্শিক উত্তরাধিকার এখনো পুরোপুরি নিঃশেষ হয়নি।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাগরে ১৬ ঘণ্টা ভেসে থাকার পর বাবা ও দুই ছেলেকে জীবিত উদ্ধার

মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ইসলামের পতন, তবু শেষ হয়ে যায়নি মুসলিম ব্রাদারহুড

০৮:২৯:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে মুসলিম ব্রাদারহুড এখন আর আগের মতো শক্তিশালী নয়। একসময় যে সংগঠন আরব বসন্তের ঢেউয়ে মিসর ও তিউনিসিয়ার রাজনীতিতে বড় উত্থান ঘটিয়েছিল, আজ সেই সংগঠনই দমন-পীড়ন, নেতৃত্বের বিভক্তি, নির্বাসন ও রাজনৈতিক পরাজয়ে গভীর সংকটে। তবু ইতিহাস বলছে, ব্রাদারহুডকে মৃত ঘোষণা করার সময় এখনো আসেনি।

কারাগারের উত্তাপ যেন সংগঠনটির প্রতীক

তিউনিসের উপকণ্ঠে মর্নাগিয়া কারাগারে চলতি গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। সেখানেই গত ১৭ জুলাই ৮৫ বছর বয়সী রশিদ ঘানুশি জ্ঞান হারান। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শে অনুপ্রাণিত তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক দল আননাহদার প্রতিষ্ঠাতা।

ঘানুশির বর্তমান পরিণতি অনেকটা মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির করুণ পরিণতির কথা মনে করিয়ে দেয়। মুরসি ২০১২ সালে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে মিসরের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কারাগারেই ২০১৯ সালে তার মৃত্যু হয়।

ঘানুশির বন্দিত্ব শুধু একজন প্রবীণ ইসলামপন্থী নেতার দুর্দশার গল্প নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের দীর্ঘ রাজনৈতিক পশ্চাদপসরণেরও প্রতিচ্ছবি।

আরব বসন্তে যে উত্থান, পরে তারই পতন

দেড় দশক আগে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মিসরে ব্রাদারহুড-ঘনিষ্ঠ শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছেছিল। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টেও তাদের বড় রাজনৈতিক উপস্থিতি ছিল। কাতারের জনপ্রিয় আল জাজিরা তাদের রাজনৈতিক বার্তা আরব বিশ্বের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিত।

২০১০ সালের শেষ দিকে তিউনিসিয়া থেকে শুরু হয়ে ২০১১ সালে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া আরব বসন্তের প্রথম দিকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের একটি ছিল মুসলিম ব্রাদারহুড।

কিন্তু সেই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আরব বিশ্বের একের পর এক দেশে পুরোনো কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা ফিরে আসে। ব্রাদারহুডের নেতারা কারাগারে যান, অনেকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং সংগঠনের রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ আরও বাড়িয়েছে সংকট

গত এক বছরে সংগঠনটির ওপর চাপ আরও তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাদারহুডের বিভিন্ন শাখাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেয়।

মিসর ও জর্ডানের শাখাকে হামাসকে সহায়তার অভিযোগে বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। লেবাননের শাখাকেও বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলে আধুনিক জিহাদবাদের উৎসগুলোর আলোচনায় আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে ব্রাদারহুডের নামও উঠে এসেছে।

জর্ডান ২০২৫ সালের এপ্রিলেই সংগঠনটিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে। এরপর দেশটির রাজনৈতিক শাখা ইসলামিক অ্যাকশন ফ্রন্টের ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হয়।

সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখন অভ্যন্তরীণ বিভাজন

ব্রাদারহুডের সংকট শুধু বাইরের দমন-পীড়নের কারণে নয়। সংগঠনটির ভেতরেও গভীর বিভক্তি তৈরি হয়েছে।

২০২১ সাল থেকে সংগঠনটি কার্যত দুটি প্রধান শিবিরে বিভক্ত। লন্ডনে নির্বাসিত অবস্থায় সংগঠন পরিচালনা করা ইব্রাহিম মুনির তুরস্কে থাকা সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার পর বিরোধ আরও তীব্র হয়। অন্যদিকে মহমুদ হুসেইন দাবি করেন, মুনির নিজেই নেতৃত্ব থেকে অপসারিত হয়েছিলেন।

এখন দুই পক্ষের আলাদা নেতা, আলাদা শুরা পরিষদ এবং আলাদা সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। দুপক্ষই দাবি করে, তারাই প্রকৃত মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিনিধিত্ব করে।

মুনিরের মৃত্যুর পর তার পক্ষের নেতৃত্বে আসা সালাহ আবদেল হক যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে ইস্তাম্বুলভিত্তিক হুসেইনপন্থীরা স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা মনে করে না অন্য পক্ষ পুরো সংগঠনের হয়ে কথা বলার অধিকার রাখে।

ফলে অস্তিত্বের সংকটে থাকা সংগঠনটির দুই অংশও এক কণ্ঠে কথা বলতে পারছে না।

মিসরে ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা

মুসলিম ব্রাদারহুডের ঐতিহাসিক কেন্দ্র মিসরেও সংগঠনটির রাজনৈতিক অধ্যায়কে প্রায় মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।

সংগঠনটির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ বাদি কারাগারে রয়েছেন। প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ধর্মীয় উৎসবগুলোতে অনেক বন্দিকে ক্ষমা করলেও ব্রাদারহুডের নেতাদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ খুবই সীমিত।

একসময় সংগঠনটির সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের অর্থ জোগান দিত যে ব্যবসাগুলো, সেগুলোর বড় অংশও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদও অনেকটা সিসির পথ অনুসরণ করছেন। তার সরকারের হাতে ঘানুশির কারাবন্দিত্ব সেই পরিবর্তনেরই প্রতীক।

I Used to Be in the Muslim Brotherhood. Here's How You Defeat Terrorism |  Opinion - Newsweek

গাজায় হামাসের দুর্বলতাও প্রভাব ফেলেছে

ব্রাদারহুডের ঘনিষ্ঠ আদর্শিক সহযোগী হামাসও বড় ধাক্কা খেয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের দীর্ঘ যুদ্ধ হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ভূখণ্ডটির বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে এবং সংগঠনটির নেতাদের লক্ষ্য করে আঞ্চলিক পর্যায়েও অভিযান চলছে।

হামাস এখনো টিকে আছে, কিন্তু তার শক্তি আগের তুলনায় অনেক কম। গাজার মানুষের একটি অংশও সংগঠনটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

ফলে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা হামাসের দুর্বলতাও সংগঠনটির বৃহত্তর রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলেছে।

সিরিয়াতেও ইসলামপন্থীদের নতুন সমীকরণ

সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পরও ব্রাদারহুড বড় কোনো রাজনৈতিক সুবিধা পায়নি। বরং দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময়ে সংগঠনটি যখন সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল, তখন সুন্নি জিহাদি শক্তিগুলোই দামেস্ক দখলের লড়াইয়ে এগিয়ে যায়।

ফলে নতুন সিরিয়ার রাজনৈতিক কাঠামোয় ব্রাদারহুডের উপস্থিতি খুবই সীমিত। প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারার উপদেষ্টা আহমদ জেইদান, যার সঙ্গে ব্রাদারহুডের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে, এমনকি সিরীয় শাখার বিলুপ্তির পরামর্শও দিয়েছেন।

সিরীয় ইসলামপন্থী রাজনীতি নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, নতুন সিরিয়ায় রাজনৈতিক ইসলামের আগের ধরনের প্রাসঙ্গিকতা আর নেই।

কিন্তু ইতিহাস ব্রাদারহুডকে বারবার ফিরতে দেখেছে

তবু মুসলিম ব্রাদারহুডকে শেষ হয়ে গেছে বলা ঝুঁকিপূর্ণ। সংগঠনটির ইতিহাসই তার সবচেয়ে বড় কারণ।

১৯৪৮ সালে সংগঠনটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল। ১৯৫৪ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের আবারও কঠোরভাবে সংগঠনটিকে দমন করেন। ব্রাদারহুডের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক সাইয়্যিদ কুতুবকে ১৯৬৬ সালে ফাঁসি দেওয়া হয়।

পরবর্তী প্রায় চার দশক সংগঠনটি নিষিদ্ধ অবস্থায় থেকেছে। তবু ২০০৫ সালে তাদের সমর্থিত প্রার্থীরা মিসরের পার্লামেন্টে ৮৮টি আসন পেয়েছিলেন। মাত্র সাত বছর পর ২০১২ সালে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ব্রাদারহুডের প্রার্থী মুরসি দেশের প্রেসিডেন্ট হন।

অর্থাৎ সংগঠনটি বারবার দমন হয়েছে, কিন্তু পুরোপুরি বিলীন হয়নি।

যে ক্ষতগুলো এখনো ব্রাদারহুডকে টিকিয়ে রাখতে পারে

রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে ব্রাদারহুড দুর্বল হলেও এর জন্ম যে সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ থেকে, সেগুলো এখনো মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূর হয়নি।

মিসরের অর্থনীতি এখনো দুর্বল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থের ওপর দেশটির নির্ভরতা রয়েছে। তরুণ শিক্ষিতদের বড় অংশের কর্মসংস্থানও হতাশাজনক। তিউনিসিয়ার অর্থনৈতিক দুরবস্থাও আরব বসন্তের আগের সময়ের সমস্যাগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গাজা যুদ্ধ। আরব বিশ্বের অনেক মানুষের চোখে তাদের সরকারগুলো হয় দুর্বল, নয়তো ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের প্রতি নীরব বা সহযোগী।

এই পরিস্থিতিতে ব্রাদারহুডের পুরোনো বক্তব্য—আরব বিশ্বের সংকট কেবল অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক নয়, এর গভীরে রয়েছে আত্মমর্যাদা ও আধ্যাত্মিক অপমানবোধ—এখনো অনেক মানুষের কাছে অর্থবহ।

পতন নয়, হয়তো দীর্ঘ পুনর্গঠনের পথে

মুসলিম ব্রাদারহুডের শক্তি আজ অতীতের তুলনায় অনেক কম। নেতৃত্ব দ্বিধাবিভক্ত, রাজনৈতিক প্রভাব সংকুচিত, বহু দেশে সংগঠনটি নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং এর ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলোও বড় ধাক্কা খেয়েছে।

কিন্তু সামাজিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং আরব বিশ্বের আত্মমর্যাদার সংকট এখনো রয়ে গেছে। ব্রাদারহুড যে সামাজিক কল্যাণ ও আরব মর্যাদার আবেদনকে কেন্দ্র করে শিকড় গেড়েছিল, সেই শূন্যতাও পুরোপুরি পূরণ হয়নি।

তাই ২০২৮ সালের মার্চে মুসলিম ব্রাদারহুড যখন প্রতিষ্ঠার একশ বছর পূর্ণ করবে, তখন সংগঠনটি হয়তো আগের মতো ঐক্যবদ্ধ বা শক্তিশালী থাকবে না। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা বলছে, তাকে একেবারে মৃত মনে করাও ভুল হবে। নেতৃত্ব যতই বিভক্ত হোক, রাজনৈতিক ইসলাম হয়তো নতুন কোনো রূপে আবারও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক পতন ঘটেছে, কিন্তু তার সামাজিক ভিত্তি ও আদর্শিক উত্তরাধিকার এখনো পুরোপুরি নিঃশেষ হয়নি।