ব্রিটেনের ব্যবসায়ী নেতারা রাজনীতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই অনেকটা নীরব থেকেছেন। কিন্তু সেই নীরবতার মূল্য এখন তাদেরই দিতে হচ্ছে। শ্রমিকদের অধিকার বাড়াতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ, করনীতি এবং সরকারি ব্যয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যবসায়ী মহল সময়মতো নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেনি।
নির্বাচনের আগে ভুল হিসাব
সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের আগে বড় ব্যবসায়ীদের একটি অংশ লেবার পার্টির প্রতি সমর্থন দেখিয়েছিল। কিন্তু দলটির নীতিগুলো ক্ষমতায় গেলে ব্যবসার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা তারা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেনি।
বিশেষ করে কর্মীদের অধিকার সংক্রান্ত নতুন আইনের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা ধরে নিয়েছিলেন, প্রস্তাবিত কঠোর বিধানগুলো শেষ পর্যন্ত অনেকটাই শিথিল করা হবে। কিন্তু বিষয়টি লেবার দলের সংসদ সদস্য ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেই প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত ছিল না।
নতুন আইন নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দুর্বল দর-কষাকষির দক্ষতা নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে।
রাজনীতিতে কথা বলতে ভয় ব্যবসায়ীদের
অনেক ব্যবসায়ী নেতা মনে করেন, রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে কথা বললে তাদের প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে সরকারি নীতির প্রশংসা করে কয়েকটি নিরপেক্ষ মন্তব্য করা ছাড়া তারা সাধারণত প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে চান না।
ব্যবসা ও রাজনীতি বিষয়ে কাজ করা পরামর্শকেরাও বলছেন, বড় প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের এমন নীতি নিয়ে কথা বলাতে রাজি করানো কঠিন, যা সরাসরি তাদের ব্যবসার জন্য উপকারী হতে পারে। কারণ দাবি পূরণ না হলে তারা হাস্যকর অবস্থায় পড়তে পারেন—এই আশঙ্কা তাদের মধ্যে কাজ করে।
তবে যারা প্রকাশ্যে কথা বলেন, তাদেরও ব্যবসায়ী মহলের অন্যদের বিরক্তির মুখে পড়তে হয়। বিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তা গ্রেগ জ্যাকসন এবং পানশালা ব্যবসায়ী টিম মার্টিন এমন ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বরের উদাহরণ।

কর বাড়লে শেষ পর্যন্ত চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর
ব্রিটিশ ভোটারদের বড় একটি অংশ মনে করেন, সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজন হলে ব্যবসার ওপর করের বোঝা চাপানো গ্রহণযোগ্য। ধনীদের ওপর বেশি কর আরোপের পক্ষে সমর্থন আরও বেশি।
ব্যবসায়ীদের এখন দায়িত্ব হলো রাজনীতিকদের বোঝানো যে ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের শেষ পরিণতি সাধারণ মানুষের জন্যও ভালো হবে না। এর ফলে পণ্যের দাম বাড়তে পারে, বিনিয়োগ কমতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা
নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে এখন ব্যবসায়ী মহল আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হতে চাইছে। কিয়ার স্টারমারের সরকারের সময়ে ব্যবসায়ীরা নিজেদের নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়া থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন মনে করেছিলেন। নতুন সরকারেও যেন একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেটিই তাদের প্রধান উদ্বেগ।
ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা, সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তাদের সঙ্গে আলোচনা না করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে যাবে না। বরং শুরু থেকেই ব্যবসায়ীদের আলোচনায় যুক্ত করা হবে।
একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাও চান। আগের সরকার স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে এক বছরের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিল। এতে ব্যবসায়ীদের অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছিল।
অক্টোবরের বাজেট ঘিরে উদ্বেগ
অক্টোবরে নতুন অর্থমন্ত্রী জন হিলি যে বাজেট দেবেন, সেটিও ব্যবসায়ীদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা কীভাবে পূরণ করা হবে, তা নিয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই।
সরকার যদি ব্যাপক কর বৃদ্ধি এড়িয়ে যায়, আবার বড় ধরনের ব্যয় সংকোচনও না করে, তাহলে ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা—ভবিষ্যতে তাদের ওপর আরও বড় করের বোঝা চাপতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী নেতাদের আরও সাহসী হয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে। রাজনীতির বাইরে থেকে থাকার চেষ্টা হয়তো স্বস্তিদায়ক, কিন্তু নীতিনির্ধারণে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে ব্যবসায়ীদের এখন আর নীরব থাকার সুযোগ নেই।
ব্যবসা ও সরকারের সম্পর্ক কেবল পর্দার আড়ালের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকাশ্য, নিয়মিত ও কার্যকর সংলাপে পরিণত করাই হতে পারে উভয় পক্ষের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















