জাম্বিয়ার অর্থনীতিতে এখন তামার ঝলকানি। আন্তর্জাতিক বাজারে তামার দাম রেকর্ড উচ্চতায় ওঠায় দেশটির প্রধান তামা উৎপাদন অঞ্চল কপারবেল্টে খনি আবারও ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু খনির এই জৌলুশের খুব সামান্যই পৌঁছাচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। রাজধানী লুসাকা থেকে দূরের কিটওয়ের আশপাশে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের কাছে তামার মূল্যবৃদ্ধি যেন এক দূরের গল্প।
খনির পাশে থেকেও অর্থের দেখা নেই
কিটওয়ের বাইরে প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে মাটির সঙ্গে যুক্ত। কেউ খনিতে কাজ করেন, কেউ কৃষিকাজে। একটি খনি আবার পুরোদমে চালু হয়েছে, যার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে তামার রেকর্ড দাম। কিন্তু খনির ফটকের বাইরে পেঁয়াজের জমিতে কাজ করা নারীদের কাছে এই অর্থনৈতিক উত্থানের সুফল দৃশ্যমান নয়।
তাদের প্রশ্ন, খনি থেকে যে বিপুল অর্থ আসছে, তা যাচ্ছে কোথায়?
জাম্বিয়ার দীর্ঘদিনের সমস্যা এখানেই। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও সেই প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য কমাতে তুলনামূলকভাবে খুব কম ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বের বহু দেশের তুলনায় জাম্বিয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি হয়েছে অত্যন্ত ধীরগতিতে।
ভোটের কেন্দ্রে জীবনযাত্রার ব্যয়
১৩ আগস্ট প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময় সাধারণ মানুষের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়। মূল্যস্ফীতি কমেছে, দেশের মুদ্রা কওয়াচাও শক্তিশালী হয়েছে। তবু মানুষের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো বেশি।
এই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়েছেন প্রধান বিরোধী প্রার্থী ব্রায়ান মুন্ডুবিলে। তরুণদের হতাশার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে তিনি নিজেকে তাদের ‘বড় ভাই’ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাকাইন্দে হিচিলেমার দ্বিতীয় মেয়াদে জয়ের সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের কথা ১৭ আগস্ট।
কিন্তু নির্বাচনী মাঠ পুরোপুরি সমতল ছিল না। বিরোধীরা অভিযোগ করছে, ক্ষমতাসীন দল এমন কিছু কৌশল ব্যবহার করেছে, যেগুলোর সমালোচনা হিচিলেমা নিজেই একসময় করতেন।
অর্থনীতিতে সংস্কার, তবু প্রত্যাশা পূরণ হয়নি
২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার আগে হিচিলেমা দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতিতে ছিলেন। এমনকি রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগেও তাকে কারাবন্দি হতে হয়েছিল। একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশকে ঘুরে দাঁড় করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
ক্ষমতায় এসে তার সরকার বিপুল বৈদেশিক ঋণ পুনর্গঠন করেছে, ভর্তুকি কমিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে সমঝোতা বজায় রেখেছে। তামা শিল্পের করের বোঝাও কমানো হয়েছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসে তামা থেকে।
খনি শিল্পের প্রতিনিধিরা বলছেন, এসব সংস্কার জাম্বিয়াকে প্রবৃদ্ধির জন্য প্রস্তুত করেছে।
তবে বাস্তব প্রবৃদ্ধি সরকারের প্রতিশ্রুত গতির তুলনায় ধীর। ২০৩১ সালের মধ্যে বছরে ৩০ লাখ টন তামা উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু গত বছর উৎপাদন ছিল প্রায় ৮ লাখ ৯০ হাজার টন। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন বলেই মনে হচ্ছে।
তামার জন্য বিশ্বের প্রতিযোগিতা
তামার চাহিদা এখন এত বেশি যে জাম্বিয়ার খনিজসম্পদের প্রতি বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। চীন ভারত মহাসাগরের দিকে যাওয়া একটি রেলপথ আধুনিক করছে। পশ্চিমা দেশগুলো আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত একটি পরিবহন করিডোরকে সমর্থন করছে।
জাম্বিয়া অবশ্য কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে চাইছে না। খনিজসম্পদের বিনিময়ে স্বাস্থ্য সহায়তার মতো প্রস্তাবের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মার্কিন প্রচেষ্টাও দেশটি প্রত্যাখ্যান করেছে।
সরকারের অবস্থান পরিষ্কার—একটি ঝুড়িতে সব ডিম রাখা ঠিক হবে না। অর্থাৎ, তামার বাজার ও বৈদেশিক অংশীদারত্বে বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখাই তাদের লক্ষ্য।

খনির লাভ কতটা থাকবে জাম্বিয়ায়?
তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন আরও মৌলিক। তামার দাম যখন এত বেশি, তখন সেই অতিরিক্ত লাভের কতটা জাম্বিয়ার ভেতরে থাকা উচিত?
অনেক জাম্বিয়ান মনে করেন, বিদেশি মালিকানাধীন খনি কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত সুবিধা পাচ্ছে। এমনকি কেউ কেউ অভিযোগ করেন, হিচিলেমা এসব কোম্পানির প্রতি অতিরিক্ত নমনীয়, কারণ তারা গোপনে তাকে অর্থায়ন করে। তবে প্রেসিডেন্টের সহযোগী ও খনি কোম্পানিগুলো এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
হিচিলেমা সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত অবশ্য ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। সরকারি বিদ্যালয়ের ফি বাতিল করা হয়েছে এবং স্থানীয় সরকারের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এসব সাফল্য সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে তার অভিজাত ভাবমূর্তি পুরোপুরি বদলায়নি।
গণতন্ত্র নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ
হিচিলেমার রাজনৈতিক পথচলায় বড় এক বৈপরীত্যও তৈরি হয়েছে। একসময় কারাগারে বসে জাম্বিয়ার গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করা নেতা এখন রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে সেই গণতন্ত্রকেই দুর্বল করছেন—এমন অভিযোগ উঠছে।
তবে বর্তমান দমন-পীড়ন আগের দশকের দেশটির পরিস্থিতির মতো কঠোর নয়। তৎকালীন দেশপ্রেমিক ফ্রন্ট সরকারের সময়ে বাজার ও বাসস্টেশনে দলীয় কর্মীদের দৌরাত্ম্য ছিল। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটত।
এখন আশঙ্কার ধরন বদলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করলেই সাইবার অপরাধ আইনে গ্রেপ্তার হওয়ার ভয় রয়েছে বলে নাগরিক অধিকারকর্মীরা অভিযোগ করছেন।
বিরোধীদের লড়াই এবং আঞ্চলিক বিভাজন
দেশটির পুরোনো প্রধান বিরোধী দল অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে এবার প্রার্থী দিতে পারেনি। সাবেক সেই দলের নেতা মুন্ডুবিলে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের অধীনে পুরোনো সমর্থকদের একত্র করার চেষ্টা করেছেন।
নির্বাচনী প্রচারে তার সমর্থকদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। কোথাও ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে, পাথর নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। মুন্ডুবিলে অভিযোগ করেছেন, তার কিছু সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
হিচিলেমার শক্ত ঘাঁটি দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চল। অন্যদিকে মুন্ডুবিলের সমর্থন তুলনামূলকভাবে বেশি উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে। ফলে শহরাঞ্চলই হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের ক্ষেত্র, কারণ এসব এলাকায় জাতিগত আনুগত্য তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
দারিদ্র্যের সামনে তামার উত্থান
জাম্বিয়ার গণতন্ত্র এখনো পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে যায়নি। তাই নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত ফলের সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু যে-ই ক্ষমতায় আসুন, তাকে অর্থনীতির পুরোনো প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে।
দেশটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রতিদিন ২ দশমিক ১৫ ডলারের কম আয়ে জীবন কাটান। দারিদ্র্যের এমন উচ্চ হার বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশেই রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবহাওয়ার ঝুঁকি। টানা দুই বছর ভালো ফসলের পর এল নিনোর প্রত্যাবর্তন খরার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালে এমন পরিস্থিতিতে জলবিদ্যুৎ বাঁধে পানির প্রবাহ কমে গিয়েছিল। ফলে অনেক এলাকায় দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যেত।
আসল পরীক্ষা খনির ফটকের বাইরে
জাম্বিয়ার সামনে এখন এক বিরল সুযোগ। তামার দাম বাড়ছে, বিশ্বজুড়ে তামার চাহিদা বাড়ছে এবং দেশটির বিপুল খনিজসম্পদ নতুন করে আন্তর্জাতিক গুরুত্ব পাচ্ছে।
কিন্তু শুধু খনির উৎপাদন বাড়ালেই হবে না। তামার আয় দিয়ে বিদ্যুৎ, শিক্ষা, কৃষি, স্থানীয় সরকার, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্থায়ী পরিবর্তন আনতে হবে।
জাম্বিয়ার পরবর্তী প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তাই তামার দাম নয়, বরং তামার সেই অর্থ কতটা সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছায়। খনির ফটকের ভেতরের সমৃদ্ধিকে যদি ফটকের বাইরের মানুষের জীবনে স্বস্তিতে পরিণত করা না যায়, তাহলে তামার এই উত্থানও তাদের কাছে কেবল আরেকটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হয়েই থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















