রাশিয়ায় যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নেওয়া এখন শুধু রাজনৈতিক ঝুঁকিই নয়, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির সবচেয়ে পুরোনো উদারপন্থী রাজনৈতিক দল ইয়াব্লোকোকে আসন্ন আইনসভা নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে নিষিদ্ধ করেছে রাশিয়ার সুপ্রিম কোর্ট। দলটির অপরাধ—তারা প্রকাশ্যে শান্তি, যুদ্ধবিরতি ও ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
আগস্টের ১০ তারিখে মস্কোর সুপ্রিম কোর্টের সামনে কয়েক শ তরুণ জড়ো হয়েছিলেন। তাদের হাতে ছিল শান্তির পক্ষে লেখা বার্তা, ইউক্রেনীয় ভাষায় ভালোবাসা ও নির্ভয়ের আহ্বান। কেউ কেউ হাতে আপেল নিয়ে বসেছিলেন, কারণ ইয়াব্লোকো শব্দের অর্থই আপেল। কেউ রুশ পতাকার সঙ্গে সবুজ আপেল তুলে ধরেছিলেন। আর এক তরুণী প্রকাশ্যে ফ্রানৎস কাফকার বই পড়ছিলেন।
আদালতের ভেতরে তখন চলছিল ইয়াব্লোকোর ভাগ্য নির্ধারণের শুনানি। শেষ পর্যন্ত বিচারক ভ্যাচেস্লাভ কিরিলভ দলটিকে নির্বাচনের বাইরে ছুড়ে দেন।
শান্তির পক্ষে দাঁড়িয়েই বিপদে ইয়াব্লোকো
ইয়াব্লোকোর নির্বাচনী ঘোষণাপত্র ছিল মাত্র ৪৩ শব্দের। তার শুরুতেই ছিল দুটি জোরালো ঘোষণা—শান্তি ও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান এবং ভয়মুক্ত জীবনের দাবি।
দলটির নেতা নিকোলাই রিবাকভ জুলাইয়ের ২৭ তারিখে ঘোষণা করেছিলেন, ইয়াব্লোকো এবার শান্তির দল হিসেবে নির্বাচনে লড়বে। তিনি দ্রুত যুদ্ধবিরতি, কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেন। একই সঙ্গে তিনি মানুষের জীবন, স্বাধীনতা এবং দমন-পীড়ন থেকে মুক্তিকে সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়ার কথা বলেন।
এই অবস্থানই দলটির জনপ্রিয়তায় নাটকীয় পরিবর্তন আনে।
কয়েক সপ্তাহেই জনপ্রিয়তার বিস্ফোরণ
দীর্ঘদিন ধরে ইয়াব্লোকোর জনসমর্থন ছিল খুবই সীমিত। ২০০৭ সালের পর থেকে দলটি সংসদে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ৫ শতাংশ ভোটের সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। চলতি বছরের গ্রীষ্ম পর্যন্ত বিভিন্ন জনমত জরিপে তাদের সমর্থন ছিল প্রায় ৩ শতাংশ।
কিন্তু যুদ্ধ ও শান্তি নিয়ে সরাসরি অবস্থান নেওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়।
জরিপে দলটির সমর্থন প্রথমে ৫ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছায়। নিষিদ্ধ হওয়ার সময় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশে। তরুণ রুশদের মধ্যে ইয়াব্লোকোকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। আপেল খাওয়া, আপেলের গান গাওয়া কিংবা শুধু আপেলের প্রতীক ব্যবহার করে প্রকাশিত বিভিন্ন পোস্ট লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছায়।
এমনকি ইয়াব্লোকোর বার্তাবাহক চ্যানেলের অনুসারীর সংখ্যা ক্ষমতাসীন ঐক্যবদ্ধ রাশিয়া দলের চেয়েও বেশি হয়ে যায়।
বিদেশে অবস্থানরত রুশ বিরোধী রাজনীতিকদের মধ্যেও দলটির প্রতি সমর্থন দেখা দেয়। তাদের মধ্যে ছিলেন প্রয়াত আলেক্সেই নাভালনির বিধবা ইউলিয়া নাভালনায়াও।
ক্রেমলিনের হিসাব বদলে গেল
ইয়াব্লোকোকে শুরুতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়াটাই ছিল কিছুটা বিস্ময়কর। জুলাইয়ের ২৯ তারিখে দলটি নিবন্ধিত হওয়ার পর রুশ সরকারের রাজনৈতিক কৌশলবিদেরা হয়তো মনে করেছিলেন, এটি কোনো বাস্তব হুমকি তৈরি করবে না।
কারণ দলটির নেতৃত্বের ওপর এরই মধ্যে নানা চাপ তৈরি করা হয়েছিল। পরিচিত কয়েকজন প্রার্থীকে তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কেউ গ্রেপ্তার হন, কেউ বিদেশি এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত হন। ফলে ইয়াব্লোকোকে এমন একটি দুর্বল বিরোধী শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছিল, যাকে নির্বাচনের মাঠে রাখলেও ক্ষমতাসীনদের তেমন ক্ষতি হবে না।
কিন্তু শান্তির পক্ষে সরাসরি প্রচার শুরু করার পর সেই হিসাব ভেস্তে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইয়াব্লোকোর আসল বিপদ ছিল তারা সংসদে আসন পেতে পারে—এমনটা নয়। বরং তারা বৈধ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশের সর্বত্র প্রকাশ্যে যুদ্ধ বন্ধের দাবি তুলতে পারত। আর সেটিই ক্রেমলিনের কাছে অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ নিয়ে রুশ জনমতের পরিবর্তন
ইয়াব্লোকোর উত্থানের পেছনে রুশ সমাজে যুদ্ধ নিয়ে তৈরি হওয়া ক্লান্তি ও পরিবর্তিত মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, রাশিয়ার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ও সমঝোতার পক্ষে। অর্থাৎ সরকারের কঠোর যুদ্ধনীতি এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
ইয়াব্লোকো সেই ব্যবধানকে রাজনৈতিক ভাষা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
আর ঠিক সেই কারণেই দলটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
‘চরমপন্থা’র অভিযোগ
ইয়াব্লোকোর বিরুদ্ধে মামলা করেছিল ক্রেমলিন-নিয়ন্ত্রিত জাতীয়তাবাদী দল রোদিনা। দলটি ইয়াব্লোকোর বিরুদ্ধে ‘চরমপন্থা’র অভিযোগ তোলে।
রোদিনার নেতা আলেক্সেই ঝুরাভলভ ইয়াব্লোকোর নেতাদের ‘জাতীয় বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যা দেন এবং অভিযোগ করেন, তারা পশ্চিমা মূল্যবোধ গ্রহণ করেছে ও রাশিয়ার আত্মসমর্পণ দাবি করছে।
অভিযোগের তালিকায় ছিল আরও অদ্ভুত কিছু বিষয়। পুরোনো সোভিয়েত শান্তিবাদী গান ব্যবহারের পাশাপাশি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিরোশিমায় বোমা হামলার ছবি প্রদর্শনের বিরুদ্ধেও কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে এসব অভিযোগের চেয়ে বড় বিষয় হলো, শান্তির পক্ষে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থানই শেষ পর্যন্ত দলটির নির্বাচনী পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
আদালতের বাইরে তরুণদের প্রতিবাদ
আদালতের রায় ঘোষণার পর সুপ্রিম কোর্টের বাইরে থাকা তরুণেরা ‘লজ্জা, লজ্জা’ বলে স্লোগান দিতে শুরু করেন।
পুলিশও দ্রুত সতর্কবার্তা দেয়। এক কর্মকর্তা মেগাফোনে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে বলেন এবং সতর্ক করেন, তাদের ধরে নিয়ে সামরিক নিয়োগকেন্দ্রে পাঠানো হতে পারে।
এই হুমকির মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে রাশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতার আরেকটি দিক—যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলা শুধু রাজনৈতিক অধিকার হারানোর ঝুঁকি নয়, বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের আশঙ্কাও তৈরি করতে পারে।
নির্বাচনের আড়ালে আরও কঠোর দমন?
ইয়াব্লোকোকে নিষিদ্ধ করার ঘটনা রাশিয়ার নির্বাচনী ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
একদিকে সরকার নির্বাচনকে কার্যকর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। অন্যদিকে যে দলটি যুদ্ধ ও শান্তি নিয়ে ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন পাচ্ছে, তাকেই নির্বাচনী প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ক্ষমতাসীন মহল যদি মনে করে রুশ সমাজে প্রতিবাদের সম্ভাবনা বাড়ছে, তাহলে তারা আরও বেশি সেন্সরশিপ, রাজনৈতিক চাপ ও দমন-পীড়নের পথে যেতে পারে।
এমনকি সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর নতুন করে সামরিক সমাবেশ বা বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার আশঙ্কার কথাও উঠছে।
ইয়াব্লোকোর নিষেধাজ্ঞা তাই শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার হারানোর ঘটনা নয়। এটি এমন এক রাশিয়ার প্রতিচ্ছবি, যেখানে যুদ্ধের বিরোধিতা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের চোখে রাজনৈতিক অপরাধের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। আর আদালতের বাইরে তরুণদের আপেল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা যেন সেই বাস্তবতারই প্রতীক—শান্তির কথা বলা যত কঠিন হচ্ছে, সেই কথার প্রতি মানুষের আগ্রহও তত বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















