০৯:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
সাগরে ১৬ ঘণ্টা ভেসে থাকার পর বাবা ও দুই ছেলেকে জীবিত উদ্ধার ব্রিটিশ ব্যবসার নীরবতা: রাজনীতিতে কথা না বলার খেসারত দিচ্ছে ব্যবসায়ীরা মোগাদিশুতে ফিরছে স্বস্তি, তবে শান্তির আড়ালে রয়ে গেছে বড় শঙ্কা জাম্বিয়ার তামার সমৃদ্ধি, কিন্তু মানুষের ঘরে স্বস্তি কোথায়? মক্কা চুক্তি: সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা জোটে বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ কলম্বিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে ২৬৫ মৃত্যু, উদ্ধার তৎপরতায় বৈষম্যের অভিযোগ মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ইসলামের পতন, তবু শেষ হয়ে যায়নি মুসলিম ব্রাদারহুড ইউরোপকে এক করার অদৃশ্য কারিগর কারা? লেবার ও ব্যবসা: অ্যান্ডি বার্নহামের সামনে সম্পর্ক মেরামতের নতুন সুযোগ শান্তির কথা বলাই এখন রাশিয়ায় অপরাধ, নির্বাচনের দৌড় থেকে বাদ উদারপন্থী ইয়াব্লোকো

মোগাদিশুতে ফিরছে স্বস্তি, তবে শান্তির আড়ালে রয়ে গেছে বড় শঙ্কা

একসময় সন্ধ্যার পর রাস্তায় বের হওয়াই ছিল মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানোর মতো। রাজধানীর কোনো ক্যাফে, বাজার কিংবা ব্যস্ত মোড়ে মুহূর্তেই নেমে আসতে পারত বিস্ফোরণ। সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুর মানুষের কাছে সন্ত্রাসী হামলা ছিল নিত্যদিনের আতঙ্কের নাম।

কিন্তু সেই মোগাদিশুই গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে বদলে গেছে। রাত গভীর পর্যন্ত এখন খোলা থাকে ক্যাফে। তরুণ-তরুণীদের ভিড়ে জমে ওঠে শহরের বিভিন্ন এলাকা। নতুন ভবন উঠছে, ব্যবসা বাড়ছে, মানুষের চলাচলও বেড়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে নিরাপত্তায়—রাজধানীতে আল-শাবাবের হামলা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।

তবে এই স্বস্তি কতটা স্থায়ী, তা নিয়ে প্রশ্নও বাড়ছে। কারণ রাজধানীতে হামলা কমলেও সোমালিয়ার রাজনৈতিক বিভাজন, আঞ্চলিক সংঘাত এবং বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

যে শহরে প্রতিদিনই ছিল মৃত্যুর ভয়

ছয় বছর আগে সাকিন আবদি নামের এক তরুণ সরকারি কর্মকর্তা মোগাদিশুর কেন্দ্রস্থলে একটি আইসক্রিমের দোকানে বসেছিলেন। পরদিন একই দোকানে তাঁর এক বন্ধু বসেছিলেন। হঠাৎ এক সশস্ত্র ব্যক্তি দরজা দিয়ে ঢুকে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে তাঁর বন্ধু ও আরও ছয়জন নিহত হন।

২০২০ সালে শুধু আল-শাবাবের হামলাতেই মোগাদিশুতে অন্তত ৩২০ জন প্রাণ হারান। দীর্ঘদিন ধরে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতা ও গৃহযুদ্ধের সঙ্গে মোগাদিশুর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে ছিল।

নব্বইয়ের দশকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর থেকেই রাজধানীটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, রাজনৈতিক সংঘাত ও সন্ত্রাসের মধ্যে ছিল। সন্ধ্যার পর রাস্তায় বের হওয়ার সাহস করতেন না অনেকে। সরকারি কর্মকর্তা থেকে সাধারণ নাগরিক—কেউই নিশ্চিত ছিলেন না, দিনের শেষে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবেন কি না।

হামলায় বড় পতন

পরিস্থিতির পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে আল-শাবাবের হামলার পরিসংখ্যানে। ২০২২ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে, হাসান শেখ মোহামুদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় মোগাদিশুতে আল-শাবাবের হামলার সংখ্যা ছিল ১৪৪টি। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র পাঁচটিতে।

বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে রাজধানীতে আল-শাবাব-সংশ্লিষ্ট প্রাণহানি সংগঠনটির উত্থানের পর থেকে সবচেয়ে কম হতে পারে।

সোমালিয়ার সরকারের জন্য এটি বড় অর্জন। প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদের প্রশাসনের সবচেয়ে দৃশ্যমান সাফল্যগুলোর একটি হিসেবে নিরাপত্তার এই উন্নতিকে দেখা হচ্ছে।

একসময় মানুষ দিনের আলোতেও আতঙ্কে থাকত। এখন রাত পেরিয়ে গেলেও অনেক ক্যাফে খোলা থাকে। সেখানে তরুণ সোমালিরা আড্ডা দেন, ছবি তোলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের জীবনযাপনের দৃশ্য প্রকাশ করেন।

১ জুলাই সোমালিয়ার স্বাধীনতা দিবসে প্রেসিডেন্ট মোহামুদ রাজধানীর এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে প্রকাশ্যে ভাষণ দেন, যেখানে অতীতে বারবার হামলা হয়েছে। শত শত মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছিলেন। কয়েক বছর আগেও এমন দৃশ্য কল্পনা করা কঠিন ছিল।

নিরাপত্তার সঙ্গে বদলেছে শহরের অর্থনীতি

নিরাপত্তা বাড়ার প্রভাব শুধু মানুষের চলাচলে নয়, অর্থনীতিতেও স্পষ্ট। রাজধানীতে নির্মাণকাজ দ্রুত বাড়ছে। নতুন নতুন ভবন উঠছে। বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

বিলাসবহুল আবাসন, বিপণিকেন্দ্র, ব্যায়ামাগার ও মসজিদ নিয়ে নির্মিত ২৬ তলা দাহাব টাওয়ার চলতি বছর উদ্বোধনের কথা রয়েছে। ভবনটি এমন একটি জায়গার কাছে তৈরি হয়েছে, যা একসময় সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতির প্রতীক ছিল।

১৯৯৩ সালে সেখানে মার্কিন একটি সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর দুই মার্কিন সেনার মরদেহ রাস্তায় টেনে নিয়ে গিয়েছিল সশস্ত্র যোদ্ধারা। সেই ইতিহাসের পাশেই আজ গড়ে উঠছে আধুনিক বাণিজ্যিক ও আবাসিক স্থাপনা।

শহরের নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা একটি কফি প্রতিষ্ঠানও মোগাদিশুতে ব্যবসা করছে, যার প্রতিষ্ঠাতা এক সোমালি নাগরিক দীর্ঘদিন সুইডেনে থাকার পর দেশে ফিরে উদ্যোগটি গড়ে তোলেন।

কীভাবে কমল হামলা

মোগাদিশুর নিরাপত্তা উন্নতির পেছনে কোনো একক কারণ নেই। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, আল-শাবাবের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অনেক বেশি কার্যকর করা হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি ক্যামেরা বাড়ানো হয়েছে। পুলিশ তল্লাশিচৌকিতে সাধারণ মানুষের গাড়ি শনাক্ত করতে বৈদ্যুতিন তথ্যভান্ডার ব্যবহার করছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদেরও সাধারণ পোশাকে বিপুলসংখ্যায় মোতায়েন করা হয়েছে।

এসব আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ব্যবস্থা হলেও সন্ত্রাসী হামলা ঠেকাতে এগুলোর সম্মিলিত প্রভাব বড় হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

Mogadishu no longer deserves its deadly reputation

তুরস্কের বড় ভূমিকা

মোগাদিশুর নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে তুরস্কের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্ক সোমালিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগকারী হয়ে উঠেছে।

রাজধানীর বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর থেকে শুরু করে নতুন মহাকাশ উৎক্ষেপণকেন্দ্র এবং সমুদ্রভিত্তিক তেল-গ্যাস অনুসন্ধান—সোমালিয়ায় তুরস্কের অর্থনৈতিক স্বার্থের বড় অংশই মোগাদিশু ও তার আশপাশে কেন্দ্রীভূত।

২০১৭ সালে তুরস্ক মোগাদিশুতে তার সবচেয়ে বড় বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। এরপর তুর্কি বাহিনী সোমালিয়ার সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, আল-শাবাবের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং সোমালিয়ার জাতীয় বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রও গত কয়েক বছরে সোমালিয়ায় ব্যাপক বিমান অভিযান চালিয়েছে। ফলে রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক সামরিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাজধানীর বাইরে চিত্র ভিন্ন

তবে মোগাদিশুর নিরাপত্তার উন্নতি দেখে পুরো সোমালিয়াকে নিরাপদ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

রাজধানীর বাইরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ খুব বেশি বাড়েনি। মোগাদিশুর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনো আল-শাবাবের প্রভাব রয়েছে। ফলে রাজধানীতে হামলা কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে সংগঠনটি সামগ্রিকভাবে পরাজিত হয়েছে।

কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, আল-শাবাব হয়তো কৌশলগত কারণেই রাজধানীতে বড় ধরনের হামলা কমিয়েছে। ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা কমিয়ে সংগঠনটি নিজেদের ভাবমূর্তি কিছুটা বদলাতে চাইতে পারে।

আরেকটি কারণও গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানীতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের মাধ্যমে আল-শাবাব এখনো বিপুল অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। তাই সরাসরি হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার প্রয়োজন সংগঠনটি আপাতত অনুভব নাও করতে পারে।

রাজনৈতিক সংঘাত নতুন বিপদ

মোগাদিশুর সাম্প্রতিক শান্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়তো সন্ত্রাসী হামলা নয়, বরং রাজনৈতিক সংঘাত।

নির্বাচন নিয়ে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর বিরোধীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা চলছে। জুনে সেনাবাহিনী ও দুই বিরোধী নেতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মিলিশিয়াদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৩ জন নিহত হন।

এর পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রশাসনের বিরোধও তীব্র হচ্ছে। মার্চে তিনি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যের রাজধানী বাইদোয়ায় সেনা পাঠিয়ে গভর্নরকে সরানোর চেষ্টা করেন। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরের পুন্তল্যান্ড অঞ্চলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও স্থানীয় বাহিনীকে সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে।

ফলে যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আল-শাবাব মোকাবিলায় ব্যবহার হওয়ার কথা, তার একটি বড় অংশ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ব্যয় হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।

বিদেশি সহায়তা কমলে কী হবে

সোমালিয়ার নিরাপত্তার জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো আন্তর্জাতিক সহায়তার ভবিষ্যৎ।

১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, জাতিসংঘের সেই সরবরাহব্যবস্থাকে আর সহায়তা দেবে না, যার মাধ্যমে আফ্রিকান ইউনিয়নের শান্তিরক্ষী বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করা হতো। ইউরোপীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকেও সেই ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করার নিশ্চয়তা নেই।

ফলে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করা শান্তিরক্ষা ব্যবস্থা বড় সংকটে পড়তে পারে। বিকল্প ব্যবস্থা না হলে ২০২৭ সালের মধ্যেই এর কার্যক্রম ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শান্তি এসেছে, কিন্তু নিশ্চয়তা আসেনি

মোগাদিশুর পরিবর্তন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। যে শহরে রাত নামলেই মানুষ ঘরে ফিরতে চাইত, সেখানে এখন মধ্যরাত পর্যন্ত ক্যাফে জমজমাট। যে শহরের সঙ্গে আত্মঘাতী হামলা ও বিস্ফোরণের স্মৃতি জড়িয়ে ছিল, সেখানে এখন নতুন ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে।

কিন্তু এই পরিবর্তনকে স্থায়ী শান্তি হিসেবে দেখার সময় এখনো আসেনি।

আল-শাবাব রাজধানীতে দুর্বল হয়েছে কি না, নাকি কৌশল বদলে সাময়িকভাবে হামলা কমিয়েছে—তা স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ, আঞ্চলিক সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার সম্ভাব্য সংকোচন পরিস্থিতিকে আবারও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাগরে ১৬ ঘণ্টা ভেসে থাকার পর বাবা ও দুই ছেলেকে জীবিত উদ্ধার

মোগাদিশুতে ফিরছে স্বস্তি, তবে শান্তির আড়ালে রয়ে গেছে বড় শঙ্কা

০৮:৪৩:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

একসময় সন্ধ্যার পর রাস্তায় বের হওয়াই ছিল মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানোর মতো। রাজধানীর কোনো ক্যাফে, বাজার কিংবা ব্যস্ত মোড়ে মুহূর্তেই নেমে আসতে পারত বিস্ফোরণ। সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুর মানুষের কাছে সন্ত্রাসী হামলা ছিল নিত্যদিনের আতঙ্কের নাম।

কিন্তু সেই মোগাদিশুই গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে বদলে গেছে। রাত গভীর পর্যন্ত এখন খোলা থাকে ক্যাফে। তরুণ-তরুণীদের ভিড়ে জমে ওঠে শহরের বিভিন্ন এলাকা। নতুন ভবন উঠছে, ব্যবসা বাড়ছে, মানুষের চলাচলও বেড়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে নিরাপত্তায়—রাজধানীতে আল-শাবাবের হামলা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।

তবে এই স্বস্তি কতটা স্থায়ী, তা নিয়ে প্রশ্নও বাড়ছে। কারণ রাজধানীতে হামলা কমলেও সোমালিয়ার রাজনৈতিক বিভাজন, আঞ্চলিক সংঘাত এবং বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

যে শহরে প্রতিদিনই ছিল মৃত্যুর ভয়

ছয় বছর আগে সাকিন আবদি নামের এক তরুণ সরকারি কর্মকর্তা মোগাদিশুর কেন্দ্রস্থলে একটি আইসক্রিমের দোকানে বসেছিলেন। পরদিন একই দোকানে তাঁর এক বন্ধু বসেছিলেন। হঠাৎ এক সশস্ত্র ব্যক্তি দরজা দিয়ে ঢুকে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে তাঁর বন্ধু ও আরও ছয়জন নিহত হন।

২০২০ সালে শুধু আল-শাবাবের হামলাতেই মোগাদিশুতে অন্তত ৩২০ জন প্রাণ হারান। দীর্ঘদিন ধরে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতা ও গৃহযুদ্ধের সঙ্গে মোগাদিশুর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে ছিল।

নব্বইয়ের দশকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর থেকেই রাজধানীটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, রাজনৈতিক সংঘাত ও সন্ত্রাসের মধ্যে ছিল। সন্ধ্যার পর রাস্তায় বের হওয়ার সাহস করতেন না অনেকে। সরকারি কর্মকর্তা থেকে সাধারণ নাগরিক—কেউই নিশ্চিত ছিলেন না, দিনের শেষে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবেন কি না।

হামলায় বড় পতন

পরিস্থিতির পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে আল-শাবাবের হামলার পরিসংখ্যানে। ২০২২ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে, হাসান শেখ মোহামুদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় মোগাদিশুতে আল-শাবাবের হামলার সংখ্যা ছিল ১৪৪টি। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র পাঁচটিতে।

বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে রাজধানীতে আল-শাবাব-সংশ্লিষ্ট প্রাণহানি সংগঠনটির উত্থানের পর থেকে সবচেয়ে কম হতে পারে।

সোমালিয়ার সরকারের জন্য এটি বড় অর্জন। প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদের প্রশাসনের সবচেয়ে দৃশ্যমান সাফল্যগুলোর একটি হিসেবে নিরাপত্তার এই উন্নতিকে দেখা হচ্ছে।

একসময় মানুষ দিনের আলোতেও আতঙ্কে থাকত। এখন রাত পেরিয়ে গেলেও অনেক ক্যাফে খোলা থাকে। সেখানে তরুণ সোমালিরা আড্ডা দেন, ছবি তোলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের জীবনযাপনের দৃশ্য প্রকাশ করেন।

১ জুলাই সোমালিয়ার স্বাধীনতা দিবসে প্রেসিডেন্ট মোহামুদ রাজধানীর এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে প্রকাশ্যে ভাষণ দেন, যেখানে অতীতে বারবার হামলা হয়েছে। শত শত মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছিলেন। কয়েক বছর আগেও এমন দৃশ্য কল্পনা করা কঠিন ছিল।

নিরাপত্তার সঙ্গে বদলেছে শহরের অর্থনীতি

নিরাপত্তা বাড়ার প্রভাব শুধু মানুষের চলাচলে নয়, অর্থনীতিতেও স্পষ্ট। রাজধানীতে নির্মাণকাজ দ্রুত বাড়ছে। নতুন নতুন ভবন উঠছে। বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

বিলাসবহুল আবাসন, বিপণিকেন্দ্র, ব্যায়ামাগার ও মসজিদ নিয়ে নির্মিত ২৬ তলা দাহাব টাওয়ার চলতি বছর উদ্বোধনের কথা রয়েছে। ভবনটি এমন একটি জায়গার কাছে তৈরি হয়েছে, যা একসময় সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতির প্রতীক ছিল।

১৯৯৩ সালে সেখানে মার্কিন একটি সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর দুই মার্কিন সেনার মরদেহ রাস্তায় টেনে নিয়ে গিয়েছিল সশস্ত্র যোদ্ধারা। সেই ইতিহাসের পাশেই আজ গড়ে উঠছে আধুনিক বাণিজ্যিক ও আবাসিক স্থাপনা।

শহরের নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা একটি কফি প্রতিষ্ঠানও মোগাদিশুতে ব্যবসা করছে, যার প্রতিষ্ঠাতা এক সোমালি নাগরিক দীর্ঘদিন সুইডেনে থাকার পর দেশে ফিরে উদ্যোগটি গড়ে তোলেন।

কীভাবে কমল হামলা

মোগাদিশুর নিরাপত্তা উন্নতির পেছনে কোনো একক কারণ নেই। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, আল-শাবাবের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অনেক বেশি কার্যকর করা হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি ক্যামেরা বাড়ানো হয়েছে। পুলিশ তল্লাশিচৌকিতে সাধারণ মানুষের গাড়ি শনাক্ত করতে বৈদ্যুতিন তথ্যভান্ডার ব্যবহার করছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদেরও সাধারণ পোশাকে বিপুলসংখ্যায় মোতায়েন করা হয়েছে।

এসব আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ব্যবস্থা হলেও সন্ত্রাসী হামলা ঠেকাতে এগুলোর সম্মিলিত প্রভাব বড় হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

Mogadishu no longer deserves its deadly reputation

তুরস্কের বড় ভূমিকা

মোগাদিশুর নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে তুরস্কের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্ক সোমালিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগকারী হয়ে উঠেছে।

রাজধানীর বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর থেকে শুরু করে নতুন মহাকাশ উৎক্ষেপণকেন্দ্র এবং সমুদ্রভিত্তিক তেল-গ্যাস অনুসন্ধান—সোমালিয়ায় তুরস্কের অর্থনৈতিক স্বার্থের বড় অংশই মোগাদিশু ও তার আশপাশে কেন্দ্রীভূত।

২০১৭ সালে তুরস্ক মোগাদিশুতে তার সবচেয়ে বড় বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। এরপর তুর্কি বাহিনী সোমালিয়ার সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, আল-শাবাবের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং সোমালিয়ার জাতীয় বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রও গত কয়েক বছরে সোমালিয়ায় ব্যাপক বিমান অভিযান চালিয়েছে। ফলে রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক সামরিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাজধানীর বাইরে চিত্র ভিন্ন

তবে মোগাদিশুর নিরাপত্তার উন্নতি দেখে পুরো সোমালিয়াকে নিরাপদ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

রাজধানীর বাইরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ খুব বেশি বাড়েনি। মোগাদিশুর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনো আল-শাবাবের প্রভাব রয়েছে। ফলে রাজধানীতে হামলা কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে সংগঠনটি সামগ্রিকভাবে পরাজিত হয়েছে।

কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, আল-শাবাব হয়তো কৌশলগত কারণেই রাজধানীতে বড় ধরনের হামলা কমিয়েছে। ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা কমিয়ে সংগঠনটি নিজেদের ভাবমূর্তি কিছুটা বদলাতে চাইতে পারে।

আরেকটি কারণও গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানীতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের মাধ্যমে আল-শাবাব এখনো বিপুল অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। তাই সরাসরি হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার প্রয়োজন সংগঠনটি আপাতত অনুভব নাও করতে পারে।

রাজনৈতিক সংঘাত নতুন বিপদ

মোগাদিশুর সাম্প্রতিক শান্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়তো সন্ত্রাসী হামলা নয়, বরং রাজনৈতিক সংঘাত।

নির্বাচন নিয়ে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর বিরোধীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা চলছে। জুনে সেনাবাহিনী ও দুই বিরোধী নেতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মিলিশিয়াদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৩ জন নিহত হন।

এর পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রশাসনের বিরোধও তীব্র হচ্ছে। মার্চে তিনি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যের রাজধানী বাইদোয়ায় সেনা পাঠিয়ে গভর্নরকে সরানোর চেষ্টা করেন। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরের পুন্তল্যান্ড অঞ্চলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও স্থানীয় বাহিনীকে সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে।

ফলে যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আল-শাবাব মোকাবিলায় ব্যবহার হওয়ার কথা, তার একটি বড় অংশ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ব্যয় হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।

বিদেশি সহায়তা কমলে কী হবে

সোমালিয়ার নিরাপত্তার জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো আন্তর্জাতিক সহায়তার ভবিষ্যৎ।

১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, জাতিসংঘের সেই সরবরাহব্যবস্থাকে আর সহায়তা দেবে না, যার মাধ্যমে আফ্রিকান ইউনিয়নের শান্তিরক্ষী বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করা হতো। ইউরোপীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকেও সেই ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করার নিশ্চয়তা নেই।

ফলে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করা শান্তিরক্ষা ব্যবস্থা বড় সংকটে পড়তে পারে। বিকল্প ব্যবস্থা না হলে ২০২৭ সালের মধ্যেই এর কার্যক্রম ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শান্তি এসেছে, কিন্তু নিশ্চয়তা আসেনি

মোগাদিশুর পরিবর্তন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। যে শহরে রাত নামলেই মানুষ ঘরে ফিরতে চাইত, সেখানে এখন মধ্যরাত পর্যন্ত ক্যাফে জমজমাট। যে শহরের সঙ্গে আত্মঘাতী হামলা ও বিস্ফোরণের স্মৃতি জড়িয়ে ছিল, সেখানে এখন নতুন ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে।

কিন্তু এই পরিবর্তনকে স্থায়ী শান্তি হিসেবে দেখার সময় এখনো আসেনি।

আল-শাবাব রাজধানীতে দুর্বল হয়েছে কি না, নাকি কৌশল বদলে সাময়িকভাবে হামলা কমিয়েছে—তা স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ, আঞ্চলিক সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার সম্ভাব্য সংকোচন পরিস্থিতিকে আবারও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।