ভারতে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি সংকট সাময়িক নয়—এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যার ফল। দেশটির চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে যে বড় ফারাক তৈরি হয়েছে, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা বিশেষ করে গৃহস্থালি পর্যায়ে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চাহিদা ও উৎপাদনের বড় ব্যবধান
গত বছরে ভারতে প্রায় ৩৩.১৫ মিলিয়ন টন এলপিজি ব্যবহার হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন পূরণ করেছে মাত্র ৪০ শতাংশ। বাকি ৬০ শতাংশ আমদানি করতে হয়েছে। অর্থাৎ, দেশের মোট চাহিদা দেশীয় উৎপাদনের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ, আর আমদানির পরিমাণ দেশীয় উৎপাদনের দেড় গুণ।
এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সাধারণ ঘাটতি নয়—এটি সরবরাহ ব্যবস্থার গভীর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। কারণ এই এলপিজির বড় অংশই ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালি রান্নায়, যেখানে বিকল্প বা সাময়িক সমাধানের সুযোগ খুবই সীমিত।
গৃহস্থালি নির্ভরতা কেন বড় ঝুঁকি

ভারতে এলপিজি ব্যবহার প্রধানত ঘরোয়া। বাণিজ্যিক খাতে এর ব্যবহার ১০ শতাংশেরও কম। ফলে আমদানিকৃত এলপিজি সরাসরি রান্নাঘরে যায়। শিল্পক্ষেত্রে জ্বালানি ঘাটতি হলে উৎপাদন কমানো বা বিকল্প ব্যবহার সম্ভব হলেও, গৃহস্থালি রান্না থামিয়ে রাখা যায় না।
এই কারণেই ভারতের এলপিজি নির্ভরতা একটি সাধারণ আমদানি সমস্যার চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর।
হরমুজ প্রণালীর উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
ভারতের এলপিজি আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালী হয়ে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এই রুটের অনিশ্চয়তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এখন আর এটিকে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহপথ হিসেবে ধরা যাচ্ছে না।
এই নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে বড় কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনা
অন্যান্য দেশও এলপিজি আমদানি করে, কিন্তু তাদের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। যেমন জাপানে এলপিজি ব্যবহার করে মাত্র ৪০ শতাংশ পরিবার। সেখানে বিদ্যুৎ ও সিটি গ্যাসের ব্যবহার অনেক বেশি। পাশাপাশি দেশটির কাছে প্রায় ১০৮ দিনের এলপিজি মজুত রয়েছে।
চীনে এলপিজির বড় অংশ ব্যবহার হয় পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে। দক্ষিণ কোরিয়ায়ও গৃহস্থালি জ্বালানিতে প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের ভূমিকা বেশি।
এর বিপরীতে ভারতে আমদানিকৃত এলপিজি প্রধানত রান্নাঘরেই ব্যবহৃত হয়, যা দেশটিকে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলে।

সংরক্ষণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা
ভারতের এলপিজি সংরক্ষণ ব্যবস্থাও দুর্বল। মোটামুটি ১৫ দিনের অপারেশনাল মজুত থাকলেও গভীর ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণ ক্ষমতা খুবই সীমিত—মাত্র ১.৫ দিনের জাতীয় চাহিদা পূরণের মতো।
এত বড় আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই সংরক্ষণ ক্ষমতা যথেষ্ট নয় এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশ্ববাজারেও সীমিত সরবরাহ
বিশ্বের এলপিজি রপ্তানি বাজারও খুব বড় নয়। কয়েকটি এশীয় দেশ মিলে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি এলপিজি আমদানি করে। ফলে নতুন করে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ খুব সীমিত।
এই অবস্থায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ ব্যাহত হলে দ্রুত বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে।
সমাধানের পথ কী হতে পারে
ভারতের জন্য এই সমস্যার সমাধান শুধু বেশি এলপিজি আমদানি নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস।
প্রথমত, দেশীয় উৎপাদিত এলপিজি এবং প্রোপেন-বিউটেন গ্যাসকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। শিল্প খাতকে তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি আলাদাভাবে আমদানি করতে উৎসাহিত করতে হবে।
&imwidth=800&imheight=600&format=webp&quality=medium)
দ্বিতীয়ত, এলপিজির বড় মজুত তৈরি করতে হবে। অন্তত দুই থেকে তিন সপ্তাহের নিরাপদ মজুত নিশ্চিত করা জরুরি, যা বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি।
তৃতীয়ত, শহর ও শহরতলিতে বিদ্যুৎচালিত রান্নার প্রসার বাড়াতে হবে। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, নিরাপদ তারের ব্যবস্থা এবং ইনডাকশন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে ধীরে ধীরে এলপিজির উপর নির্ভরতা কমাতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, গৃহস্থালি জ্বালানির একমাত্র উৎস হিসেবে এলপিজির উপর নির্ভরতা কমানোই হবে মূল লক্ষ্য।
শেষ কথা
ভারতের এলপিজি সংকট সাময়িক নয়—এটি একটি স্থায়ী কাঠামোগত সমস্যা। উৎপাদন কম, আমদানি নির্ভরতা বেশি এবং ব্যবহার প্রধানত গৃহস্থালি—এই তিনটি কারণ মিলেই বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে শুধু সরবরাহ বাড়ানো নয়, বরং পুরো জ্বালানি ব্যবস্থার নকশা পরিবর্তন করা জরুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















