পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই ভোটাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় প্রায় ৬০ লাখ নাগরিককে যাচাইয়ের আওতায় রাখা হয়েছে। পরিপূরক তালিকা প্রকাশ হলেও এখনও প্রায় ২৭ লাখ ভোটারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এই প্রক্রিয়া প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে এবং মানব উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে পিছনে ঠেলে দিয়েছে।
প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে বাস্তবতা
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে। এই তালিকা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও লিঙ্গের প্রতিনিধিত্ব কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বর্তমান বিধানসভার গঠন কেমন? ১৭তম পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার গঠন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাজ্যের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
রাজ্য সরকার কল্যাণমূলক নীতি বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রাখে। তাই বিধানসভায় সব শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব থাকলে নীতিনির্ধারণে সবার চাহিদা প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

উপস্থিতির রাজনীতি
রাজনৈতিক তত্ত্বে “উপস্থিতির রাজনীতি” ধারণা বলছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি, যাতে কেউ বঞ্চিত না হয়। প্রতিনিধিত্ব শুধু প্রতীক নয়—এটি নির্ধারণ করে কার কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণে শোনা হবে। দীর্ঘদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, বিধায়কদের মধ্যে উচ্চবর্ণ ও পুরুষদের প্রাধান্য বেশি।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই বৈষম্য বিধানসভার কমিটিগুলোতে আরও স্পষ্ট। এসব কমিটিতেই মূলত নীতি নিয়ে আলোচনা ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অথচ সেখানে সব গোষ্ঠীর সমান অংশগ্রহণ নেই, যা ন্যায্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা তৈরি করে।
মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি
২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৭ শতাংশ মানুষ মুসলিম। কিন্তু নীতিনির্ধারণের জায়গায় তাদের উপস্থিতি খুবই কম। গবেষণায় দেখা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোতে মুসলিমদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
১৭তম বিধানসভায় কমিটির সদস্যপদে মুসলিমদের অংশ মাত্র ১৪.৮ শতাংশ। সংখ্যালঘু বিষয়ক স্থায়ী কমিটি বাদ দিলে এই হার আরও কমে ১৪.৪ শতাংশে দাঁড়ায়।
২০১১ সালে বিধানসভায় মুসলিম বিধায়কের হার ছিল ২০.৪ শতাংশ, যা ২০২১ সালে কমে দাঁড়ায় ১৪.৭ শতাংশে। অর্থাৎ জনসংখ্যার তুলনায় প্রতিনিধিত্বে বড় ফারাক রয়ে গেছে।

তফসিলি জাতি ও উপজাতির চিত্র
তফসিলি জাতি ও উপজাতির প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে ভালো। ২০২১ সালে বিধানসভায় তাদের অংশ ছিল ৩৪.২ শতাংশ, যা তাদের জনসংখ্যার অনুপাতের চেয়েও বেশি।
তবে কমিটির চেয়ারম্যান পদে বৈষম্য রয়েছে। মুসলিমরা ১৮.৪ শতাংশ চেয়ারম্যান পদে থাকলেও বর্তমানে কোনো তফসিলি উপজাতি চেয়ারম্যান নেই। এমনকি স্কুল শিক্ষা বিষয়ক স্থায়ী কমিটিতে একজন মুসলিম সদস্যও নেই।
নারী প্রতিনিধিত্বে বড় ফাঁক
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে বলে ধারণা করা হলেও বাস্তবে তা গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে প্রতিফলিত হয়নি। অর্থ, পরিকল্পনা, উচ্চশিক্ষা বা স্কুল শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোতে কোনো নারী সদস্য নেই।

২০২১ সালে নারীদের জনসংখ্যার তুলনায় বিধানসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব ৩৬ শতাংশ পয়েন্ট কম ছিল।
অগ্রগতির ধারণা বনাম বাস্তবতা
পশ্চিমবঙ্গকে অনেকেই প্রগতিশীল রাজ্য হিসেবে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনও একটি ছোট গোষ্ঠীর হাতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বরকে সামনে আনতে হবে।
আগামী নির্বাচন: পরিবর্তনের সুযোগ?
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন এই বৈষম্য দূর করার সুযোগ হতে পারত। কিন্তু বিভিন্ন দলের প্রার্থী তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, এই সমস্যা দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















