যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক কেবল একটি যুদ্ধ বা কূটনৈতিক মতপার্থক্যের প্রশ্ন নয়; এটি আসলে পশ্চিমা রাজনৈতিক মানসিকতার গভীরে থাকা এক জটিল সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন। গাজা যুদ্ধ এবং ইরান প্রসঙ্গে উত্তেজনা—এই দুই প্রেক্ষাপট একসঙ্গে এসে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে আমেরিকান জনমত দ্রুত বদলাচ্ছে এবং ইসরায়েল সম্পর্কে ধারণা নতুন করে গড়ে উঠছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু নীতিগত ভুল বা সামরিক সিদ্ধান্ত দায়ী—এমনটা বলা সহজ, কিন্তু পুরো সত্য নয়। বরং বিষয়টি আরও গভীর। ইসরায়েলের প্রতি সমালোচনার তীব্রতা অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য রাষ্ট্রের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি। অথচ বিশ্বজুড়ে এমন অনেক সংঘাত রয়েছে, যেখানে প্রাণহানি বেশি, মানবাধিকার লঙ্ঘন স্পষ্টতর—তবু সেগুলো নিয়ে পশ্চিমা সমাজে ততটা আলোড়ন দেখা যায় না।

কেন এই ব্যতিক্রম?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে ইতিহাস ও পরিচয়ের প্রশ্ন সামনে আসে। আমেরিকান সমাজে ইহুদি ইতিহাস, হলোকাস্টের স্মৃতি এবং ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা—এসব কেবল আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ নয়; বরং এগুলো পশ্চিমা সাংস্কৃতিক চেতনার ভেতর গভীরভাবে প্রোথিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা নৈতিক শিক্ষা, গণহত্যার স্মৃতি এবং ইহুদি জনগণের প্রতি সহানুভূতি—এসবই ইসরায়েলকে একটি ‘অন্যরকম’ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে, অন্তত আমেরিকার চোখে।
এই সম্পর্ক তাই কেবল কৌশলগত নয়; এটি আবেগ, ইতিহাস এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার মিশ্রণ। অন্যদিকে সৌদি আরব বা অনুরূপ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অনেক বেশি বাস্তববাদী—প্রয়োজনভিত্তিক, কখনো কখনো নির্লিপ্ত। সেখানে নৈতিক প্রত্যাশা কম, সমালোচনাও তুলনামূলকভাবে সীমিত।
এই পার্থক্যই আজ ইসরায়েলের জন্য এক ধরনের দ্বিধা তৈরি করেছে। একদিকে, ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাড়তি সমর্থন পায়। অন্যদিকে, একই কারণে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আরও কঠোরভাবে বিচার করা হয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ইসরায়েল কি এমন এক অবস্থানে যেতে চায়, যেখানে তাকে আর বিশেষভাবে দেখা হবে না, বরং অন্য সব রাষ্ট্রের মতোই ‘স্বাভাবিক’ দৃষ্টিতে বিবেচনা করা হবে?
এমন একটি পরিবর্তন কি সম্ভব?

বাস্তবতা বলছে, তা সহজ নয়। কারণ ইসরায়েলকে ঘিরে যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ, তা রাতারাতি মুছে ফেলা যায় না। এমনকি যদি রাজনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা শীতল হয়, তবুও সমাজের গভীরে থাকা এই সংযোগ বহাল থাকবে। আর সেই সংযোগই ইসরায়েলকে বারবার একটি ভিন্ন মানদণ্ডে বিচার করার দিকে ঠেলে দেবে।
তবে এই পরিস্থিতিকে শুধুই নেতিবাচক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটিকে এক ধরনের সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। কারণ কঠোর সমালোচনা অনেক সময় ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেরই প্রতিফলন—যেখানে প্রত্যাশা বেশি, তাই হতাশাও তীব্র। যদি ইসরায়েল এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে এবং নীতিনির্ধারণে তা বিবেচনায় নেয়, তাহলে সম্পর্কটি আরও পরিণত হতে পারে।
অবশেষে, প্রশ্নটি দাঁড়ায়—ইসরায়েল কি সেই বিশেষ সম্পর্কটি ধরে রাখতে চায়, যেখানে বন্ধুত্বের সঙ্গে সমালোচনাও অবিচ্ছেদ্য? নাকি সে এমন একটি অবস্থানে যেতে চায়, যেখানে তাকে আর আলাদা করে দেখা হবে না?
সম্ভবত, এই দ্বিধার উত্তরই আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করবে।
রস ডাউথাট 



















