করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ফেনীর শিক্ষা খাত। গত চার বছরে জেলায় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কমে গেছে, যা শতাংশের হিসাবে ৩৬ দশমিক ৩। এ প্রবণতা শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে জেলায় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ৩৭ হাজার ৮৫ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে এ সংখ্যা। ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ২৩ হাজার ৬০৯ জনে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল করোনাকালে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা এবং পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যাওয়া। ওই সময়ে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে, পরে তাদের কেউ শিশুশ্রমে, কেউবা অন্য কাজে যুক্ত হয়ে যায়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে গেলেও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে মহামারির সময়কার শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা এখনো পরীক্ষার্থী সংখ্যায় বড় প্রভাব ফেলছে।
ওঠানামার পরও কমেছে অংশগ্রহণ
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২০২২ সালের ৩৭ হাজার ৮৫ থেকে কমে ২৪ হাজার ৬০০ জনে নেমে আসে। ২০২৪ সালে তা সামান্য কমে হয় ২৪ হাজার ৫৫৫। ২০২৫ সালে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে এ সংখ্যা ২৯ হাজার ৬০৯ হলেও ২০২৬ সালে আবার বড় পতন ঘটে এবং পরীক্ষার্থী দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৬০৯ জনে।
এ বছরের হিসাব অনুযায়ী, ফেনীর ৩৬টি কেন্দ্রে মোট ২৩ হাজার ৬০৯ জন শিক্ষার্থী এসএসসি, দাখিল ও ভোকেশনাল পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ২১টি কেন্দ্রে এসএসসিতে অংশ নিচ্ছে ১৪ হাজার ৯৪৩ জন, ৯টি কেন্দ্রে দাখিলে ৫ হাজার ৯৭৭ জন এবং ৬টি কেন্দ্রে ভোকেশনালে ১ হাজার ১৬৯ জন।
ঝরে পড়া, মাদ্রাসামুখিতা ও অভিবাসনপ্রবণতা
জেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, মহামারির পর অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের কওমি মাদ্রাসায় পাঠাতে শুরু করেন। একই সময়ে মূলধারার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথেষ্ট উদ্যোগ দেখা যায়নি।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিউল্লাহর মতে, পরীক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ফেনীর অভিবাসনপ্রবণতা। অনেক পরিবার সন্তানদের এসএসসি শেষ হওয়ার আগেই বিদেশে পাঠানোর প্রস্তুতি নেয় অথবা কাজে যুক্ত করে। তিনি বলেন, ২০২০ সালের যে শিক্ষার্থীরা মহামারির সময় প্রাথমিক স্তরে ছিল, তাদের একটি অংশ পরে স্কুলে না ফিরে ঝরে পড়ে।
ফেনীর জেলা প্রশাসক মোনিরা হকও বলেছেন, করোনাকালে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বড় আকারে ঝরে পড়া তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব এখনো দৃশ্যমান। তিনি অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ, কওমি ও নূরানি মাদ্রাসার প্রতি অভিভাবকদের আগ্রহ এবং অভিবাসনপ্রবণতাকেও এই পতনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রশাসন এখন সামগ্রিক শিক্ষার হারও কমছে কি না, তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















