০৩:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
প্রদেশ নয়, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণই পাকিস্তানের প্রকৃত সংস্কার টাইটানিকের শতাধিক নিদর্শন নিলাম বন্ধ করলেন মার্কিন বিচারক আমদানি নীতিতে বড় পরিবর্তন, এলসি ছাড়াই সীমাহীন মূল্যের চুক্তিতে পণ্য আমদানির সুযোগ মহেশখালীর সাগরে নিউজিল্যান্ডের পরিবারের নৌকাডুবি, নিখোঁজ কিশোর চীনের জে-১০ সিই কিনছে বাংলাদেশ ডেঙ্গুতে আরও ৩ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ৯০৭; মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮৮ বুধবার বাংলাদেশে পালিত হবে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী, দেশজুড়ে নানা আয়োজন ঢাকা-যশোর রুটে আবার ইউএস-বাংলার ফ্লাইট, ৯ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিদিন দুই ট্রিপ মেঘনা ব্যাংকের ৪০০ কোটি টাকার সাব-অর্ডিনেটেড বন্ড অনুমোদন, মূলধন শক্তিশালী হবে প্রিন্স হ্যারি–মেগানের নতুন ব্রিটেনযাত্রা, পেছনে পড়ে থাকবে আর্চির প্রিয় ‘মুরগির বাড়ি’

সংযুক্ত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে অনিশ্চয়তা: অংশীদার ব্যাংকের বেরিয়ে যাওয়ার উদ্যোগে সংকট গভীর

দেশের পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একত্র করে গঠিত ‘সংযুক্ত ইসলামী ব্যাংক’ মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অংশীদার ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্তত একটি ইতিমধ্যে এই একীভূত কাঠামো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে, আরেকটি একই পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এতে পুরো উদ্যোগটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

একীভূতকরণের লক্ষ্য ও বাস্তবতা
গত বছরের ২১ ডিসেম্বর এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একত্র করে এই নতুন ব্যাংক গঠন করা হয়। মূল লক্ষ্য ছিল দুর্বল আর্থিক অবস্থার ব্যাংকগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে পুনর্গঠন করা, তারল্য সংকট কাটানো এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু বাস্তবে সেই অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। ব্যাংকের কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি, আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও ধীরগতির—ফলে আস্থার সংকট আরও বেড়েছে।

বেরিয়ে যাওয়ার আবেদন ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন
সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের বেরিয়ে যাওয়ার আবেদন। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল হক কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এই আবেদন করেন, যা ব্যাংক রেজোলিউশন অধ্যাদেশের একটি ধারার আওতায় করা হয়েছে। একই সময়ে এক্সিম ব্যাংকও একই ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে। এই অবস্থানগুলো একীভূত কাঠামোর ভেতরে আস্থাহীনতা ও সমন্বয়ের অভাবকে স্পষ্ট করছে।

খারাপ ঋণের ভারে চাপা ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪৮ শতাংশ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত। মোট ঋণের প্রায় ১.৫ লাখ কোটি টাকাই অনাদায়ী বা আদায়-অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একত্র করলেই সমস্যার সমাধান হয় না, বরং মৌলিক কাঠামোগত ও ব্যবস্থাপনাগত সংস্কার ছাড়া টেকসই উন্নতি সম্ভব নয়।

সরকারি সহায়তা ও নীতিগত প্রশ্ন
এই ব্যাংকগুলো টিকিয়ে রাখতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা দিয়েছে। একীভূতকরণ প্রক্রিয়াও সরকারি অর্থায়নে হয়েছে। কিন্তু এত সহায়তার পরও দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় নীতিগত সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গ্রাহক আস্থা ও বাস্তব সংকট
প্রায় ৯১.৫ লাখ হিসাব ও ১৫ হাজারের বেশি কর্মীর ওপর নির্ভরশীল এই ব্যাংকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন গ্রাহকদের আস্থা ফেরানো। অনেক শাখায় নতুন আমানত কমছে, গ্রাহক উপস্থিতিও হ্রাস পাচ্ছে। নগদ উত্তোলনের সীমাবদ্ধতা সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। এক গ্রাহকের ভাষায়, টাকা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে, আবার তুলতেও সমস্যা—এ অবস্থায় আস্থা রাখা কঠিন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অনিশ্চয়তা
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, পুরো প্রক্রিয়া এখনো চলমান এবং ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে। সরকারের পরিকল্পনা হলো পরিস্থিতি উন্নত হলে ব্যাংকগুলো আবার বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে দেওয়া। তবে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক আলাদাভাবে পরিচালনার পরিকল্পনায় খেলাপি ঋণ কমানো, মূলধন শক্তিশালী করা এবং তারল্য বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে—যা বাস্তবায়ন করা কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সব মিলিয়ে সংযুক্ত ইসলামী ব্যাংক এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অংশীদার ব্যাংকগুলো যদি একে একে সরে যেতে থাকে, তবে পুরো উদ্যোগের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়বে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন সরকারের—যা দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রদেশ নয়, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণই পাকিস্তানের প্রকৃত সংস্কার

সংযুক্ত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে অনিশ্চয়তা: অংশীদার ব্যাংকের বেরিয়ে যাওয়ার উদ্যোগে সংকট গভীর

০৪:৪৬:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ মে ২০২৬

দেশের পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একত্র করে গঠিত ‘সংযুক্ত ইসলামী ব্যাংক’ মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অংশীদার ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্তত একটি ইতিমধ্যে এই একীভূত কাঠামো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে, আরেকটি একই পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এতে পুরো উদ্যোগটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

একীভূতকরণের লক্ষ্য ও বাস্তবতা
গত বছরের ২১ ডিসেম্বর এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একত্র করে এই নতুন ব্যাংক গঠন করা হয়। মূল লক্ষ্য ছিল দুর্বল আর্থিক অবস্থার ব্যাংকগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে পুনর্গঠন করা, তারল্য সংকট কাটানো এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু বাস্তবে সেই অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। ব্যাংকের কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি, আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও ধীরগতির—ফলে আস্থার সংকট আরও বেড়েছে।

বেরিয়ে যাওয়ার আবেদন ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন
সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের বেরিয়ে যাওয়ার আবেদন। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল হক কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এই আবেদন করেন, যা ব্যাংক রেজোলিউশন অধ্যাদেশের একটি ধারার আওতায় করা হয়েছে। একই সময়ে এক্সিম ব্যাংকও একই ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে। এই অবস্থানগুলো একীভূত কাঠামোর ভেতরে আস্থাহীনতা ও সমন্বয়ের অভাবকে স্পষ্ট করছে।

খারাপ ঋণের ভারে চাপা ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪৮ শতাংশ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত। মোট ঋণের প্রায় ১.৫ লাখ কোটি টাকাই অনাদায়ী বা আদায়-অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একত্র করলেই সমস্যার সমাধান হয় না, বরং মৌলিক কাঠামোগত ও ব্যবস্থাপনাগত সংস্কার ছাড়া টেকসই উন্নতি সম্ভব নয়।

সরকারি সহায়তা ও নীতিগত প্রশ্ন
এই ব্যাংকগুলো টিকিয়ে রাখতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা দিয়েছে। একীভূতকরণ প্রক্রিয়াও সরকারি অর্থায়নে হয়েছে। কিন্তু এত সহায়তার পরও দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় নীতিগত সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গ্রাহক আস্থা ও বাস্তব সংকট
প্রায় ৯১.৫ লাখ হিসাব ও ১৫ হাজারের বেশি কর্মীর ওপর নির্ভরশীল এই ব্যাংকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন গ্রাহকদের আস্থা ফেরানো। অনেক শাখায় নতুন আমানত কমছে, গ্রাহক উপস্থিতিও হ্রাস পাচ্ছে। নগদ উত্তোলনের সীমাবদ্ধতা সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। এক গ্রাহকের ভাষায়, টাকা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে, আবার তুলতেও সমস্যা—এ অবস্থায় আস্থা রাখা কঠিন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অনিশ্চয়তা
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, পুরো প্রক্রিয়া এখনো চলমান এবং ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে। সরকারের পরিকল্পনা হলো পরিস্থিতি উন্নত হলে ব্যাংকগুলো আবার বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে দেওয়া। তবে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক আলাদাভাবে পরিচালনার পরিকল্পনায় খেলাপি ঋণ কমানো, মূলধন শক্তিশালী করা এবং তারল্য বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে—যা বাস্তবায়ন করা কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সব মিলিয়ে সংযুক্ত ইসলামী ব্যাংক এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অংশীদার ব্যাংকগুলো যদি একে একে সরে যেতে থাকে, তবে পুরো উদ্যোগের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়বে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন সরকারের—যা দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।