দেশের কর ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়াতে এবার ভ্যাটকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য দেশের বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা এবং দীর্ঘদিনের নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রথমবারের মতো উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও সরাসরি ভ্যাটের আওতায় আসবেন। এতে সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
টোকেন ভ্যাট: সহজ পদ্ধতি নাকি পুরোনো অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি
ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য মাসিক ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার একটি ‘টোকেন ভ্যাট’ চালুর পরিকল্পনা করছে এনবিআর। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কর প্রদানে উৎসাহিত করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোই লক্ষ্য। তবে এই প্রস্তাব অনেকের কাছে অতীতের ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি মনে হচ্ছে। আগের সেই ব্যবস্থায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তা বাতিল হয়েছিল। ফলে একই ধরনের কাঠামো আবার চালু হলে সুশাসন নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বিআইএন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ
পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ব্যবসার জন্য বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা বিআইএন বাধ্যতামূলক করা। ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং ট্রেড লাইসেন্স পেতে এটি প্রয়োজন হবে। এর মাধ্যমে কর প্রশাসন সরাসরি ব্যবসার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারবে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৮ লাখ প্রতিষ্ঠানের বিআইএন থাকলেও নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন জমা দেয় পাঁচ লাখের কিছু বেশি প্রতিষ্ঠান। অথচ দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিট প্রায় ১.১৭ কোটি, যার বড় অংশই ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং অধিকাংশই গ্রামীণ এলাকায়। এই বাস্তবতায় গ্রামভিত্তিক অর্থনীতিকে করের আওতায় আনার মধ্যেই বড় সম্ভাবনা দেখছে এনবিআর।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর চাপ
বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম কম। আন্তর্জাতিক ঋণ কর্মসূচির শর্ত পূরণেও রাজস্ব বাড়ানো এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এনবিআরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, কর অব্যাহতি কমানোর পাশাপাশি নতুন করদাতা যুক্ত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই লক্ষ্য থেকেই গ্রামীণ ভ্যাট সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সমর্থন আছে, কিন্তু সতর্কতার আহ্বান
নীতিগতভাবে এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। তবে বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও সহজতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তাদের মতে, কর আদায়ের নামে অতিরিক্ত হয়রানি বা অনানুষ্ঠানিক খরচ বাড়লে পুরো উদ্যোগই ব্যাহত হতে পারে। একইভাবে হঠাৎ করে বিআইএন বাধ্যতামূলক করলে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবসা চালিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
রাজস্ব বৈষম্য কমানোর লক্ষ্য
বর্তমানে দেশের মোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ ঢাকার বাইরে হলেও রাজস্বের সিংহভাগ আসে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে। এই বৈষম্য কমাতে গ্রামীণ ভ্যাট সম্প্রসারণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এটি ধাপে ধাপে কয়েক বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য ও সক্ষমতার চ্যালেঞ্জ
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হতে পারে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব। দেশে বিপুল সংখ্যক ব্যাংক হিসাব থাকলেও কতগুলো ব্যবসায়িক হিসাব— তার সঠিক তথ্য নেই। একইভাবে সক্রিয় ব্যবসার সুনির্দিষ্ট সংখ্যাও পরিষ্কার নয়। তাই আগে একটি নির্ভরযোগ্য ডাটাবেজ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
সুযোগ ও ঝুঁকির সমন্বয়
গ্রামীণ অর্থনীতিকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনা সময়োপযোগী উদ্যোগ হলেও বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হলে এর নেতিবাচক প্রভাবও পড়তে পারে। এজন্য ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, ডিজিটাল ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
গ্রামীণ ভ্যাট বিস্তারের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে রাজস্ব বাড়ার পাশাপাশি অর্থনীতির আনুষ্ঠানিকীকরণও এগিয়ে যাবে— তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
গ্রাম পর্যায়ে ভ্যাট সম্প্রসারণে সরকারের নতুন উদ্যোগ, টোকেন ভ্যাট ও বিআইএন বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















