০৯:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬
৩৯ কর্মকর্তার বড় রদবদল, এক দিনে বদলি ৯ ডিআইজি এক ভোটেই হার-জিত: তামিলনাড়ু ভোটে সাবেক মন্ত্রীর পরাজয়, ‘সারকার’-এর বার্তা ফের প্রমাণিত বাংলা-আসাম ফলাফল ঘিরে গণতন্ত্রে হুমকি, ঐক্যের ডাক রাহুল গান্ধীর সংসার যখন চালায় ভাগ্য, তখন অর্থনীতি কোথায় দাঁড়িয়ে? গ্রামেও ভ্যাট বসাতে চায় সরকার, টোকেন কর নিয়ে নতুন পরিকল্পনা ইন্দোনেশিয়ায় ম্যালেরিয়ার রেকর্ড সংক্রমণ, জলবায়ু ও মানুষের চলাচলে বাড়ছে ঝুঁকি টিসিবির পণ্য না পেয়ে ক্ষোভে ফুটছে কুড়িগ্রামের কার্ডধারীরা, তিন দিন লাইনে থেকেও মিলছে না সহায়তা গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ: জাহেদ উর রহমান নিজামীর ছেলের এনসিপিতে যোগ, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত ব্যাংককে তাপমাত্রা নয়, তাপ অনুভূতি ৫২ ডিগ্রি ছাড়াল, চরম বিপদের সতর্কতা জারি

সংসার যখন চালায় ভাগ্য, তখন অর্থনীতি কোথায় দাঁড়িয়ে?

ঢাকার এক কোণে বসে থাকা একজন সিএনজি চালকের কথায় আজকের নগর অর্থনীতির এক গভীর সংকট ধরা পড়ে। “সংসার তো এখন আল্লাহই চালায়”—এই বাক্যটি নিছক হতাশা নয়, বরং একটি ভেঙে পড়া জীবিকার প্রতীক। এটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়, বরং একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত, যেখানে শ্রম একই আছে, কিন্তু তার মূল্য ক্রমশ কমে যাচ্ছে।

এই বাস্তবতা বোঝার জন্য কেবল একজন চালকের দৈনন্দিন আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখলেই চলে না; এর পেছনে যে বড় অর্থনৈতিক প্রবাহ কাজ করছে, সেটিকে ধরতে হয়। শহরের পরিবহন ব্যবস্থায় যে অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, তা মূলত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তারের ফল। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দ্রুত বিস্তার একদিকে মানুষের যাতায়াত সহজ করেছে, কিন্তু অন্যদিকে প্রথাগত পরিবহন খাতকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

প্রতিযোগিতা অর্থনীতির স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু যখন সেই প্রতিযোগিতা নিয়মের বাইরে চলে যায়, তখন তা বাজারের ভারসাম্য নষ্ট করে। একজন সিএনজি চালক যখন নির্দিষ্ট ভাড়া, গ্যাসের খরচ এবং দৈনিক জমার চাপ নিয়ে রাস্তায় নামেন, তখন তার বিপরীতে যদি এমন একটি বাহন থাকে যা কম খরচে এবং কম নিয়মে চলতে পারে, তখন এই প্রতিযোগিতা আর সমান থাকে না। ফলে যাত্রী সস্তার দিকে ঝুঁকে পড়েন, আর প্রথাগত চালকরা ধীরে ধীরে বাজার থেকে সরে যেতে বাধ্য হন।

এখানে প্রশ্নটা কেবল আয়ের নয়, বরং জীবনের স্থিতিশীলতার। একজন চালক দিনে ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করেও যদি পরিবারের ন্যূনতম খরচ মেটাতে না পারেন, তাহলে সেটি ব্যক্তিগত পরিশ্রমের সীমাবদ্ধতা নয়—এটি নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতা। শহরের ভাড়া, জ্বালানি খরচ, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়—সবই বেড়েছে, কিন্তু আয়ের উৎস একই অনিশ্চয়তায় আটকে আছে।

আরও বড় সমস্যা হলো, এই পরিবর্তনটি ধীরে ধীরে ঘটছে, কিন্তু এর কোনো সুস্পষ্ট সমাধান সামনে আসছে না। একদিকে নতুন প্রযুক্তি ও সস্তা পরিবহন ব্যবস্থা মানুষের চাহিদা পূরণ করছে, অন্যদিকে পুরোনো পেশাগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ছে। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করার দায়িত্ব যে নীতিনির্ধারকদের, তা প্রায়ই অনুপস্থিত মনে হয়।

এই সংকটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষরা—যারা শহরের অর্থনীতিকে সচল রাখেন, কিন্তু নিজেরাই তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। তারা কোনো নীতিগত বিতর্কের অংশ নন, কোনো বড় সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে নেই; কিন্তু তাদের জীবনের ওপরেই সেই সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে।

অতএব, “সংসার আল্লাহ চালাচ্ছেন”—এই কথাটি আসলে এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ। এটি এমন একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ, যেখানে পরিশ্রম আর নিশ্চয়তা দেয় না, আর জীবিকা ক্রমশ ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যদি এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে না দেখা হয়, তাহলে শহরের অর্থনীতি আরও বেশি অনিশ্চয়তার দিকে যাবে—আর সেই অনিশ্চয়তার ভার সবচেয়ে বেশি বহন করবে সেই মানুষগুলোই, যাদের কণ্ঠ সবচেয়ে কম শোনা যায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

৩৯ কর্মকর্তার বড় রদবদল, এক দিনে বদলি ৯ ডিআইজি

সংসার যখন চালায় ভাগ্য, তখন অর্থনীতি কোথায় দাঁড়িয়ে?

০৮:৪০:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬

ঢাকার এক কোণে বসে থাকা একজন সিএনজি চালকের কথায় আজকের নগর অর্থনীতির এক গভীর সংকট ধরা পড়ে। “সংসার তো এখন আল্লাহই চালায়”—এই বাক্যটি নিছক হতাশা নয়, বরং একটি ভেঙে পড়া জীবিকার প্রতীক। এটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়, বরং একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত, যেখানে শ্রম একই আছে, কিন্তু তার মূল্য ক্রমশ কমে যাচ্ছে।

এই বাস্তবতা বোঝার জন্য কেবল একজন চালকের দৈনন্দিন আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখলেই চলে না; এর পেছনে যে বড় অর্থনৈতিক প্রবাহ কাজ করছে, সেটিকে ধরতে হয়। শহরের পরিবহন ব্যবস্থায় যে অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, তা মূলত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তারের ফল। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দ্রুত বিস্তার একদিকে মানুষের যাতায়াত সহজ করেছে, কিন্তু অন্যদিকে প্রথাগত পরিবহন খাতকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

প্রতিযোগিতা অর্থনীতির স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু যখন সেই প্রতিযোগিতা নিয়মের বাইরে চলে যায়, তখন তা বাজারের ভারসাম্য নষ্ট করে। একজন সিএনজি চালক যখন নির্দিষ্ট ভাড়া, গ্যাসের খরচ এবং দৈনিক জমার চাপ নিয়ে রাস্তায় নামেন, তখন তার বিপরীতে যদি এমন একটি বাহন থাকে যা কম খরচে এবং কম নিয়মে চলতে পারে, তখন এই প্রতিযোগিতা আর সমান থাকে না। ফলে যাত্রী সস্তার দিকে ঝুঁকে পড়েন, আর প্রথাগত চালকরা ধীরে ধীরে বাজার থেকে সরে যেতে বাধ্য হন।

এখানে প্রশ্নটা কেবল আয়ের নয়, বরং জীবনের স্থিতিশীলতার। একজন চালক দিনে ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করেও যদি পরিবারের ন্যূনতম খরচ মেটাতে না পারেন, তাহলে সেটি ব্যক্তিগত পরিশ্রমের সীমাবদ্ধতা নয়—এটি নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতা। শহরের ভাড়া, জ্বালানি খরচ, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়—সবই বেড়েছে, কিন্তু আয়ের উৎস একই অনিশ্চয়তায় আটকে আছে।

আরও বড় সমস্যা হলো, এই পরিবর্তনটি ধীরে ধীরে ঘটছে, কিন্তু এর কোনো সুস্পষ্ট সমাধান সামনে আসছে না। একদিকে নতুন প্রযুক্তি ও সস্তা পরিবহন ব্যবস্থা মানুষের চাহিদা পূরণ করছে, অন্যদিকে পুরোনো পেশাগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ছে। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করার দায়িত্ব যে নীতিনির্ধারকদের, তা প্রায়ই অনুপস্থিত মনে হয়।

এই সংকটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষরা—যারা শহরের অর্থনীতিকে সচল রাখেন, কিন্তু নিজেরাই তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। তারা কোনো নীতিগত বিতর্কের অংশ নন, কোনো বড় সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে নেই; কিন্তু তাদের জীবনের ওপরেই সেই সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে।

অতএব, “সংসার আল্লাহ চালাচ্ছেন”—এই কথাটি আসলে এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ। এটি এমন একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ, যেখানে পরিশ্রম আর নিশ্চয়তা দেয় না, আর জীবিকা ক্রমশ ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যদি এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে না দেখা হয়, তাহলে শহরের অর্থনীতি আরও বেশি অনিশ্চয়তার দিকে যাবে—আর সেই অনিশ্চয়তার ভার সবচেয়ে বেশি বহন করবে সেই মানুষগুলোই, যাদের কণ্ঠ সবচেয়ে কম শোনা যায়।