দীর্ঘ আড়াই মাস পর অবশেষে বাংলাদেশে পৌঁছেছে অপরিশোধিত তেলের নতুন চালান। যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে দীর্ঘদিন ধরে ক্রুড অয়েলের জাহাজ না আসায় সংকটে পড়েছিল দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। তবে নতুন করে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে জাহাজ আসায় আবারও স্বাভাবিক উৎপাদনে ফেরার আশা দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
চট্টগ্রাম বন্দরের কুতুবদিয়া পয়েন্টে বুধবার দুপুরে নোঙর ফেলে ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি ট্যাংকার। সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে আসা এই জাহাজে রয়েছে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল। বড় জাহাজ থেকে তেল খালাসের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়েছে দুটি লাইটার ট্যাংকার। এসব ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তর করে তা বন্দরের ডলফিন জেটিতে নেওয়া হবে। পরে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পৌঁছাবে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে।
ইআরএলের উৎপাদনের প্রাণ ফেরার আশা
ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য এই ক্রুড অয়েল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তেল পরিশোধন করেই ডিজেল, পেট্রোল, অকটেনসহ ১৩ ধরনের জ্বালানি উৎপাদন করা হয়। কিন্তু গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে নতুন কোনো চালান না আসায় কার্যত সংকটে পড়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি।
সর্বশেষ গত ১৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে ক্রুড অয়েলের একটি জাহাজ পৌঁছেছিল। এরপর দীর্ঘ সময় কোনো জাহাজ না আসায় ইআরএলকে সীমিত উৎপাদনে যেতে হয়। উৎপাদন দুই-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনা হয় এবং ১৩ ধরনের জ্বালানির পরিবর্তে মাত্র দুই ধরনের জ্বালানি উৎপাদন চালু রাখা হয়।
সংকট মোকাবিলায় এতদিন পাইপলাইনে জমে থাকা ‘ডেডস্টক’ তেল ব্যবহার করা হচ্ছিল। সাধারণত এই তেল উত্তোলন করা হয় না। কিন্তু জরুরি পরিস্থিতির কারণে সেই তলানির তেল দিয়েই কোনোভাবে উৎপাদন সচল রাখা হয়েছিল।
ডেডস্টক দিয়েই চলছিল উৎপাদন
ইআরএল কর্মকর্তারা জানান, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের আওতায় গভীর সমুদ্রের ভাসমান বয়া থেকে মহেশখালীর স্টোরেজ ট্যাংক এবং সেখান থেকে ইআরএল পর্যন্ত বিস্তৃত পাইপলাইনে সবসময় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল জমা থাকে। পাইপলাইনের কার্যকারিতা ও চাপ ধরে রাখতে এই তেল প্রয়োজন হয়। এই সর্বনিম্ন জমে থাকা তেলকেই ডেডস্টক বলা হয়।
দেড় মাস ধরে সেই ডেডস্টক ব্যবহার করেই সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। তবে নতুন চালান আসায় এখন আবার পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইআরএল।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর এম মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৭ মে থেকে আবারও পুরোদমে উৎপাদনে ফিরতে পারবে ইআরএল।
আরও এক লাখ টন তেল আনার পরিকল্পনা
শুধু এমটি নিনেমিয়াই নয়, আরও এক লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে ‘এমটি ফসিল’ নামের আরেকটি ট্যাংকার বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১০ মে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরে এই জাহাজে তেল লোড করা হবে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক ক্যাপ্টেন মো. মুজিবুর রহমান জানান, জাহাজটি ইতোমধ্যে আমিরাতের পথে রওনা দিয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মাসের মধ্যেই এটি বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারে। তাহলে মে মাসেই মোট দুই লাখ টন ক্রুড অয়েল দেশে আসবে।
তিনি আরও জানান, ফুজাইরা থেকে তেল আনতে হলে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে হবে না। ফলে যুদ্ধঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে সরাসরি ভারত মহাসাগর হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
যুদ্ধের কারণে আটকে আছে আরও জাহাজ
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় গত ৫ এপ্রিল থেকে ‘নর্ডিক পোলাক্স’ নামের আরেকটি ট্যাংকার আটকে আছে। সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে এটি বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু দুই মাস পার হলেও এখনো জাহাজটির যাত্রা শুরু অনিশ্চিত।
এছাড়া ‘ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামের আরেকটি ট্যাংকারও যুদ্ধঝুঁকির কারণে বাংলাদেশমুখী যাত্রা বাতিল করে। এর ফলে দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয় এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রায় বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতিতে পড়ে।
দীর্ঘ সংকটের পর নতুন চালান পৌঁছানোয় এখন কিছুটা স্বস্তি ফিরছে দেশের জ্বালানি খাতে।
দীর্ঘ আড়াই মাস পর এক লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে জাহাজ পৌঁছেছে চট্টগ্রামে। এতে আবারও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে যাচ্ছে ইস্টার্ন রিফাইনারি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















