ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অনেক সময় শুধু দিল্লির ক্ষমতার সমীকরণ বদলায় না, বদলে দেয় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কের ধরণ। বিশেষ করে সীমান্তঘেঁষা রাজ্যগুলোতে রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে পররাষ্ট্রনীতিতে। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিজেপির শক্ত অবস্থান এবং একই সময়ে বাংলাদেশ ও নেপালে নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাঞ্চলে নতুন এক কূটনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রশ্ন হলো, দিল্লি এবার কি সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে?
ভারতের প্রতিবেশী নীতি দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্র ও রাজ্যের টানাপোড়েনের মধ্যে আটকে ছিল। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম কিংবা তামিলনাড়ুর মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে স্থানীয় রাজনৈতিক হিসাব অনেক সময় জাতীয় কৌশলের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। ফলে দিল্লির নীতিনির্ধারকদের শুধু বিদেশি রাজধানীগুলোর সঙ্গে নয়, নিজেদের দেশের রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গেও সমঝোতা করতে হয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ইতিহাসে এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ তিস্তা চুক্তি। মনমোহন সিং সরকারের সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল। সীমান্ত সমস্যা সমাধান, নিরাপত্তা সহযোগিতা, বাণিজ্য বৃদ্ধি ও যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই দেশ একসঙ্গে এগোচ্ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের আপত্তিতে তিস্তা চুক্তি আটকে যায়। এতে শুধু একটি সমঝোতা ব্যর্থ হয়নি, ভারতের কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এই অভিজ্ঞতা দিল্লিকে বুঝিয়েছে যে প্রতিবেশী নীতি কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টেবিলে বসে পরিচালনা করা যায় না। সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের উদ্বেগ, অভিবাসন, পানিবণ্টন, নিরাপত্তা কিংবা জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের মতো বাস্তব প্রশ্নগুলোকে রাজনৈতিকভাবে সামলাতে না পারলে আঞ্চলিক সহযোগিতা টেকসই হয় না।

নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতিতে কিছু পরিবর্তন আসে। বিজেপির ভেতরের আগের আপত্তি উপেক্ষা করে তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি কার্যকর করেন এবং সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক রায়ও মেনে নেন। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত উষ্ণ হয়। দিল্লি এটিকে “সোনালি অধ্যায়” বলেও আখ্যা দেয়। কিন্তু ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার বিদায়ের পর সেই গতিতে ছেদ পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ঢাকায় নতুন নেতৃত্ব ভারতের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতে বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ায় দিল্লির জন্য অভ্যন্তরীণ বাধাও কিছুটা কমেছে। এর ফলে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা নতুনভাবে সক্রিয় করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ভারত বহুদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ আঞ্চলিক কাঠামো সার্ককে কার্যকর করতে পারেনি। পাকিস্তান-ভারত বৈরিতার কারণে সেই প্ল্যাটফর্ম প্রায় অচল। তাই মোদি সরকার বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালকে নিয়ে ছোট আকারের আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোর দিকে ঝুঁকেছিল। এখন সেই কৌশল নতুন গতি পেতে পারে।

তবে শুধু রাজনৈতিক মিল থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। সীমান্তে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, সন্ত্রাসবাদ, পানিবণ্টন, বাণিজ্য বাধা কিংবা অভিবাসন—এসব ইস্যু গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। এগুলোর সমাধানে কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয় যেমন জরুরি, তেমনি প্রতিবেশী দেশগুলোরও আন্তরিকতা প্রয়োজন।
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আস্থার ঘাটতি দূর করা। বাংলাদেশ, নেপাল কিংবা অন্য প্রতিবেশীরা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি কৌশলগত বিকল্প পাচ্ছে। চীন এই অঞ্চলে অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রভাব বাড়িয়েছে। ফলে দিল্লিকে শুধু রাজনৈতিক ভাষণ নয়, বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধা ও আঞ্চলিক সংযোগের মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্ত করতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই দিল্লির জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও পরীক্ষা। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমন্বয় যদি আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করে, তবে ভারত পূর্বাঞ্চলকে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রতিবেশীদের উদ্বেগকে সম্মান জানিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও বিশ্বাসভিত্তিক কূটনীতি গড়ে তুলতে হবে। নইলে রাজনৈতিক সুবিধার এই মুহূর্তও অতীতের অনেক অসমাপ্ত উদ্যোগের মতোই হারিয়ে যেতে পারে।
সি রাজমোহন 



















