০৯:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬
বাংলাদেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ নাকচ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর সীমান্তে সতর্ক বিজিবি, ‘পুশ-ইন’ ঠেকাতে আগাম প্রস্তুতি বক্স অফিসের নায়ক থেকে তামিল রাজনীতির বিস্ময়, কীভাবে ‘থালাপতি’ বিজয় বদলে দিলেন তামিলনাড়ুর সমীকরণ ক্রেনশর পথ ও “আন্তঃসংযোগ”-এর জন্ম চীনা কোম্পানির বৈশ্বিক আয় রেকর্ডে, শীর্ষে ফক্সকন ও বিওয়াইডি ভারসাম্যের কূটনীতিতে ভারত-ভিয়েতনাম ঘনিষ্ঠতা, সুপারপাওয়ার নির্ভরতা কমানোর বার্তা চিপ জুয়ার ধস: এআই বুমের মাঝেই শেনজেনের ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি ইউয়ান গায়েব মধ্যবিত্ত পৃথিবীর শেষ আশ্রয়: বারো বছরের কিশোরীরা কেন এখনও ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে চীনের ক্ষোভ, ৮০ বছর পর বিদেশে ‘অফেনসিভ’ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল জাপান বি পজিটিভ রক্তের জরুরি আহ্বান, সিজার-পরবর্তী সংকটে তরুণী মৌসুমির জন্য প্রয়োজন ৮ ব্যাগ রক্ত

মধ্যবিত্ত পৃথিবীর শেষ আশ্রয়: বারো বছরের কিশোরীরা কেন এখনও ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে

পৃথিবীকে নিয়ে আজকের প্রজন্মের হতাশা নতুন কিছু নয়। জলবায়ু সংকট, প্রযুক্তির আসক্তি, সামাজিক বিভাজন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে বড়দের পৃথিবী যেন ক্রমেই অস্থির ও ক্লান্ত হয়ে উঠছে। কিন্তু এই ভাঙাচোরা বাস্তবতার মাঝেও এক অদ্ভুত শক্তি নিয়ে টিকে আছে কৈশোরের শুরুতে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের জীবন। বিশেষ করে বারো বছরের মেয়েদের জগৎ— যেখানে একই সঙ্গে আছে শিশুসুলভ সরলতা, সামাজিক প্রতিযোগিতা, ডিজিটাল আত্মপরিচয় আর স্বাধীন হওয়ার গোপন উত্তেজনা।

সান ফ্রান্সিসকোর এক মধ্যবিদ্যালয়ের বাইরে দাঁড়ালে এই পরিবর্তনশীল বয়সের এক বিচিত্র সমাজচিত্র চোখে পড়ে। স্কুল ছুটির পর রাস্তায় বেরিয়ে আসে একদল কিশোর-কিশোরী— কারও হাতে দামি পানির বোতল, কারও ব্যাগে ঝোলানো ছোট ছোট খেলনা, কারও ঠোঁটে গাঢ় রঙের লিপ টিন্ট। তারা এমন এক বয়সে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শিশুকাল পুরোপুরি শেষ হয়নি, আবার বড় হওয়ার অভিনয়ও শুরু হয়ে গেছে।

এই বয়সের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত দ্বৈততা। তারা একই সঙ্গে নির্ভরশীল এবং স্বাধীন হতে চায়। দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে আইসক্রিম খেতে গিয়ে পকেটে খুচরা টাকা খোঁজে, আবার হাতঘড়ির মাধ্যমে পরিবারের কাছে ডিজিটাল অর্থও চেয়ে নেয়। তারা এখনও খেলাধুলার মাঠে সময় কাটায়, কিন্তু সেই মাঠের মূল আকর্ষণ আর দোলনা নয়— বরং সামাজিক সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, ছোট ছোট নাটক, আর নিজেদের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা।

আজকের শিশুদের বড় হয়ে ওঠা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। স্মার্টফোন না থাকলেও স্মার্টওয়াচ, গ্রুপ চ্যাট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারী— সবকিছুই তাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ। তারা তথ্য খোঁজে, ছবি দেখে, নতুন শব্দ শেখে, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে ডিজিটাল মাধ্যমে। কিন্তু এই প্রযুক্তি শুধু সুবিধা এনে দেয়নি; এটি তাদের শৈশবকে আরও দ্রুত প্রাপ্তবয়স্কতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

একসময় কৈশোর মানে ছিল ধীরে ধীরে পৃথিবীকে আবিষ্কার করা। এখনকার কিশোরীরা একই সঙ্গে বাস্তব ও ভার্চুয়াল দুই পৃথিবীতে বাস করে। ফলে আত্মপরিচয়ের চাপও বেড়েছে। তারা জানে কোন পানীয় জনপ্রিয়, কোন ব্র্যান্ড গ্রহণযোগ্য, কোন ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভালো দেখাবে। বারো বছর বয়সেই তারা সামাজিক স্বীকৃতির ভাষা শিখে ফেলছে।

Latest Media Releases - Save the Children Australia

তবু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কৃত্রিমতা পুরোপুরি তাদের গ্রাস করতে পারেনি। এখনও তারা হঠাৎ নাচ শুরু করে, মাঠে দৌড়ায়, বন্ধুদের সঙ্গে এক কাপ আইসক্রিম ভাগাভাগি করে খায়। এখনও তারা এমনসব হাসিতে ফেটে পড়ে, যা কোনো প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে না। এই বয়সের প্রাণশক্তি এখনও বাজার অর্থনীতি বা অ্যালগরিদম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।

এক অর্থে, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। বড়রা যেখানে ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত, সেখানে শিশুরা এখনও ভবিষ্যৎকে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে বাঁচতে পারে। তারা এখনও সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করে সময় ভুলে যায়, কিংবা একটি স্কুল নাচের অনুষ্ঠানের জন্য দিন গুনতে থাকে। পৃথিবীর সংকট তাদের চারপাশে আছে, কিন্তু তা এখনও তাদের কল্পনাশক্তিকে হত্যা করতে পারেনি।

এই কারণেই হয়তো কৈশোরের শুরুটা এখনও মানবজীবনের সবচেয়ে আশাবাদী সময়গুলোর একটি। এখানে ভয় আছে, অনিশ্চয়তা আছে, সামাজিক চাপ আছে— কিন্তু একই সঙ্গে আছে অভিযানের অনুভূতি। বড় হওয়ার এই সীমান্তভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের মধ্যে এখনও পৃথিবীকে নতুনভাবে কল্পনা করার ক্ষমতা রয়ে গেছে।

সমস্যা হলো, বড়দের সমাজ সেই সম্ভাবনাকে কতটা রক্ষা করতে পারবে। কারণ প্রযুক্তি, ভোগবাদ আর সামাজিক প্রতিযোগিতার চাপ যদি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, তবে এই ছোট ছোট স্বাধীনতার মুহূর্তগুলোও একসময় হারিয়ে যেতে পারে। তখন হয়তো শিশুরা খুব দ্রুত বড় হয়ে যাবে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে বড় হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক বিস্ময়বোধ আর কৌতূহলটুকু হারিয়ে ফেলবে।

বারো বছরের এক কিশোরীর জীবন হয়তো পৃথিবীকে বদলে দেয় না। কিন্তু সেই জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়— মানুষ এখনও সম্পর্ক, খেলাধুলা, বন্ধুত্ব আর স্বপ্নের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি বেঁচে থাকে। আর যতদিন সেই সত্য টিকে থাকবে, ততদিন পৃথিবী পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না।

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ নাকচ ভারতের

মধ্যবিত্ত পৃথিবীর শেষ আশ্রয়: বারো বছরের কিশোরীরা কেন এখনও ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে

০৮:২৩:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬

পৃথিবীকে নিয়ে আজকের প্রজন্মের হতাশা নতুন কিছু নয়। জলবায়ু সংকট, প্রযুক্তির আসক্তি, সামাজিক বিভাজন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে বড়দের পৃথিবী যেন ক্রমেই অস্থির ও ক্লান্ত হয়ে উঠছে। কিন্তু এই ভাঙাচোরা বাস্তবতার মাঝেও এক অদ্ভুত শক্তি নিয়ে টিকে আছে কৈশোরের শুরুতে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের জীবন। বিশেষ করে বারো বছরের মেয়েদের জগৎ— যেখানে একই সঙ্গে আছে শিশুসুলভ সরলতা, সামাজিক প্রতিযোগিতা, ডিজিটাল আত্মপরিচয় আর স্বাধীন হওয়ার গোপন উত্তেজনা।

সান ফ্রান্সিসকোর এক মধ্যবিদ্যালয়ের বাইরে দাঁড়ালে এই পরিবর্তনশীল বয়সের এক বিচিত্র সমাজচিত্র চোখে পড়ে। স্কুল ছুটির পর রাস্তায় বেরিয়ে আসে একদল কিশোর-কিশোরী— কারও হাতে দামি পানির বোতল, কারও ব্যাগে ঝোলানো ছোট ছোট খেলনা, কারও ঠোঁটে গাঢ় রঙের লিপ টিন্ট। তারা এমন এক বয়সে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শিশুকাল পুরোপুরি শেষ হয়নি, আবার বড় হওয়ার অভিনয়ও শুরু হয়ে গেছে।

এই বয়সের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত দ্বৈততা। তারা একই সঙ্গে নির্ভরশীল এবং স্বাধীন হতে চায়। দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে আইসক্রিম খেতে গিয়ে পকেটে খুচরা টাকা খোঁজে, আবার হাতঘড়ির মাধ্যমে পরিবারের কাছে ডিজিটাল অর্থও চেয়ে নেয়। তারা এখনও খেলাধুলার মাঠে সময় কাটায়, কিন্তু সেই মাঠের মূল আকর্ষণ আর দোলনা নয়— বরং সামাজিক সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, ছোট ছোট নাটক, আর নিজেদের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা।

আজকের শিশুদের বড় হয়ে ওঠা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। স্মার্টফোন না থাকলেও স্মার্টওয়াচ, গ্রুপ চ্যাট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারী— সবকিছুই তাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ। তারা তথ্য খোঁজে, ছবি দেখে, নতুন শব্দ শেখে, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে ডিজিটাল মাধ্যমে। কিন্তু এই প্রযুক্তি শুধু সুবিধা এনে দেয়নি; এটি তাদের শৈশবকে আরও দ্রুত প্রাপ্তবয়স্কতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

একসময় কৈশোর মানে ছিল ধীরে ধীরে পৃথিবীকে আবিষ্কার করা। এখনকার কিশোরীরা একই সঙ্গে বাস্তব ও ভার্চুয়াল দুই পৃথিবীতে বাস করে। ফলে আত্মপরিচয়ের চাপও বেড়েছে। তারা জানে কোন পানীয় জনপ্রিয়, কোন ব্র্যান্ড গ্রহণযোগ্য, কোন ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভালো দেখাবে। বারো বছর বয়সেই তারা সামাজিক স্বীকৃতির ভাষা শিখে ফেলছে।

Latest Media Releases - Save the Children Australia

তবু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কৃত্রিমতা পুরোপুরি তাদের গ্রাস করতে পারেনি। এখনও তারা হঠাৎ নাচ শুরু করে, মাঠে দৌড়ায়, বন্ধুদের সঙ্গে এক কাপ আইসক্রিম ভাগাভাগি করে খায়। এখনও তারা এমনসব হাসিতে ফেটে পড়ে, যা কোনো প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে না। এই বয়সের প্রাণশক্তি এখনও বাজার অর্থনীতি বা অ্যালগরিদম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।

এক অর্থে, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। বড়রা যেখানে ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত, সেখানে শিশুরা এখনও ভবিষ্যৎকে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে বাঁচতে পারে। তারা এখনও সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করে সময় ভুলে যায়, কিংবা একটি স্কুল নাচের অনুষ্ঠানের জন্য দিন গুনতে থাকে। পৃথিবীর সংকট তাদের চারপাশে আছে, কিন্তু তা এখনও তাদের কল্পনাশক্তিকে হত্যা করতে পারেনি।

এই কারণেই হয়তো কৈশোরের শুরুটা এখনও মানবজীবনের সবচেয়ে আশাবাদী সময়গুলোর একটি। এখানে ভয় আছে, অনিশ্চয়তা আছে, সামাজিক চাপ আছে— কিন্তু একই সঙ্গে আছে অভিযানের অনুভূতি। বড় হওয়ার এই সীমান্তভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের মধ্যে এখনও পৃথিবীকে নতুনভাবে কল্পনা করার ক্ষমতা রয়ে গেছে।

সমস্যা হলো, বড়দের সমাজ সেই সম্ভাবনাকে কতটা রক্ষা করতে পারবে। কারণ প্রযুক্তি, ভোগবাদ আর সামাজিক প্রতিযোগিতার চাপ যদি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, তবে এই ছোট ছোট স্বাধীনতার মুহূর্তগুলোও একসময় হারিয়ে যেতে পারে। তখন হয়তো শিশুরা খুব দ্রুত বড় হয়ে যাবে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে বড় হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক বিস্ময়বোধ আর কৌতূহলটুকু হারিয়ে ফেলবে।

বারো বছরের এক কিশোরীর জীবন হয়তো পৃথিবীকে বদলে দেয় না। কিন্তু সেই জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়— মানুষ এখনও সম্পর্ক, খেলাধুলা, বন্ধুত্ব আর স্বপ্নের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি বেঁচে থাকে। আর যতদিন সেই সত্য টিকে থাকবে, ততদিন পৃথিবী পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না।