তামিল সিনেমার জনপ্রিয় তারকা জোসেফ বিজয় বহু বছর ধরেই দর্শকের ঘরের মানুষ ছিলেন। প্রথমে রোমান্টিক নায়ক, পরে গণমানুষের ‘থালাপতি’— এই দীর্ঘ যাত্রার পর তিনি এখন তামিল রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র। মাত্র দুই বছরের রাজনৈতিক পথচলায় তাঁর দল তামিলাগা ভেট্রি কাজগম (টিভিকে) রাজ্যের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ায় তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থান ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক নেতাদের মতো নয়। তিনি দীর্ঘদিন রাজপথের আন্দোলন, দলীয় প্রশিক্ষণ বা ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতর দিয়ে আসেননি। বরং সিনেমার জনপ্রিয়তা, ভক্তগোষ্ঠী এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের ওপর ভর করেই তিনি রাজনৈতিক জায়গা তৈরি করেন।
নায়ক থেকে জনতার আস্থার প্রতীক
১৯৯০-এর দশকে ‘পুভে উনাক্কাগা’, ‘কাধালুক্কু মরিয়াধাই’ বা ‘লাভ টুডে’র মতো সিনেমায় বিজয় ছিলেন মধ্যবিত্ত পরিবারের আবেগঘন রোমান্টিক নায়ক। পরে ‘ঘিল্লি’, ‘পোক্কিরি’, ‘থুপ্পাক্কি’, ‘মার্সাল’ কিংবা ‘লিও’র মতো ছবিতে তিনি পরিণত হন গণমানুষের শক্তিশালী নায়কে।
তবে তাঁর জনপ্রিয়তার বড় কারণ ছিল ভিন্ন ধরনের পর্দা-ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু ভিলেনকে হারানো নায়ক ছিলেন না; বরং এমন এক চরিত্র, যাকে পরিবার বিশ্বাস করতে পারত। বিশেষ করে তরুণ, নারী ও মধ্যবিত্ত দর্শকের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল ব্যতিক্রমী।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, বিজয়ের সিনেমার চরিত্রগুলো সাধারণত দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, দুর্বল মানুষের পাশে থাকে এবং ক্ষমতাবানদের চ্যালেঞ্জ করে। এই ভাবমূর্তি পরে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও মিলে যায়।

রাজনীতিতে প্রবেশের পথ
বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে তাঁর ভক্ত সংগঠন ‘অল ইন্ডিয়া থালাপতি বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কম’-এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথমে এটি ছিল ফ্যান ক্লাব, পরে ধীরে ধীরে সামাজিক কর্মকাণ্ড, জনসংযোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ের সংগঠনে রূপ নেয়।
২০২৪ সালে টিভিকে গঠনের পর বিজয় নিজেই বলেছিলেন, তিনি রাজনীতি শুরু করার আগেই মানুষের ঘরে জায়গা করে নিয়েছেন সিনেমার মাধ্যমে। তাঁর বক্তব্য ছিল, “আমি টিভিকে গঠন করার পর মানুষের ঘরে ঢুকিনি, বরং মানুষের ঘরে পৌঁছানোর পরই টিভিকে গঠন করেছি।”
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিজয়ের রাজনৈতিক কৌশলও ছিল ভিন্নধর্মী। নির্বাচনে তিনি খুব কম প্রচার করেছেন, সীমিত জনসভা করেছেন এবং প্রতিটি উপস্থিতিকে বিশেষ ঘটনায় পরিণত করেছেন। এতে সমর্থকদের মধ্যে তাঁর প্রতি রহস্যময় আকর্ষণ আরও বেড়েছে।
‘মার্সাল’ বিতর্ক ও বিজেপির বিরোধিতা
২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মার্সাল’ সিনেমা বিজয়ের রাজনৈতিক পরিচিতিকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। সিনেমাটিতে জিএসটি, ডিজিটাল ইন্ডিয়া এবং স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সংলাপ বিজেপির বিরোধিতার মুখে পড়ে। বিজেপির কিছু নেতা বিজয়ের ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও মন্তব্য করেন।
এই বিতর্কের পর বিজয় সরাসরি খুব বেশি কথা না বললেও, সাধারণ মানুষের চোখে তিনি এক ধরনের ‘প্রতিষ্ঠানবিরোধী’ তারকায় পরিণত হন। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘মার্সাল’ শুধু একটি সিনেমা ছিল না; এটি ছিল ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংঘর্ষের পূর্বাভাস।

বড় জয়ের রাত
নির্বাচনে বিজয়ের দল ব্যাপক সাফল্য পাওয়ার পরও তাঁর ঘনিষ্ঠদের অনেকেই এত বড় ফল আশা করেননি। ধারণা ছিল, দল হয়তো প্রধান বিরোধী শক্তি হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিভিকে রাজ্যের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
বিজয়ের প্রচারণার বড় শক্তি ছিল তাঁর বিশাল ভক্তনির্ভর নেটওয়ার্ক। তারা বছরের পর বছর সামাজিক কাজ করেছে, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছে এবং ভোটারদের মনোভাব বুঝেছে। নির্বাচনের সময় সেই সংগঠনই রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়।
তবে বিশ্লেষণে এটিও বলা হয়েছে, বিজয়ের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— তিনি কি সফল প্রশাসক হতে পারবেন? সমর্থকদের মতে, বড় বাজেটের চলচ্চিত্র শিল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকদের যুক্তি, সিনেমা আর প্রশাসন এক বিষয় নয়।
তবু এই নির্বাচনের মাধ্যমে তামিলনাড়ুর মানুষ যেন দীর্ঘদিনের পরিচিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে নতুন সম্ভাবনাকে সুযোগ দিয়েছে। আর সেই সুযোগের কেন্দ্রে এখন জোসেফ বিজয়— একসময়কার লাজুক নায়ক, যিনি এখন রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের অন্যতম মুখ।
বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থান ও তামিলনাড়ুর নতুন সমীকরণ
তামিল সিনেমার সুপারস্টার বিজয়ের রাজনৈতিক বিস্ময়কর উত্থান এখন তামিলনাড়ুর সবচেয়ে আলোচিত বাস্তবতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















