ভারতীয় পুরুষ গলফ কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য কমে গেছে, বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে অবস্থানও হতাশাজনক। তবু অভিজ্ঞ গলফারদের বিশ্বাস, এই অন্ধকার সময় দীর্ঘস্থায়ী হবে না। নতুন প্রজন্মই কয়েক বছরের মধ্যে ভারতীয় গলফকে আবারও প্রতিযোগিতার শীর্ষে ফিরিয়ে আনতে পারে।
সিঙ্গাপুর ওপেনে অভিজ্ঞ গলফার জীব মিলখা সিংয়ের লড়াই যেন সেই সংকটের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ৫৪ বছর বয়সী এই গলফার অনেক তরুণ প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে খেলতে নেমে শারীরিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। গরম আবহাওয়ায় শরীর সাড়া দিচ্ছিল না, ঠিকমতো সুইং করতেও কষ্ট হচ্ছিল। তবু তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন।
জীবের কথায়, বয়সের সঙ্গে শরীর আর আগের মতো থাকে না। কিন্তু জয়ের ইচ্ছা এখনও অটুট। অবসরের আগে অন্তত একটি বড় শিরোপা জিততে চান তিনি। তাঁর মতে, বয়স কখনও সাফল্যের একমাত্র বাধা হতে পারে না।
ক্ষুধার অভাবই বড় সংকট
ভারতীয় গলফারদের বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ‘ক্ষুধার অভাব’। অভিজ্ঞ গলফারদের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য পেতে যে মানসিক তাড়না ও আত্মবিশ্বাস দরকার, তা এখন অনেক খেলোয়াড়ের মধ্যে কমে গেছে।
সবশেষ ২০২৩ সালে গগনজিৎ ভুল্লার এশিয়ান ট্যুরে শিরোপা জিতেছিলেন। এরপর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও ভারতীয়দের বড় কোনো সাফল্য আসেনি। বর্তমানে মাত্র ছয়জন ভারতীয় গলফারের হাতে এশিয়ান ট্যুর কার্ড রয়েছে। ইউরোপিয়ান ট্যুরেও নিয়মিতভাবে ভালো করা খেলোয়াড়ের সংখ্যা খুবই কম।
বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়েও ভারতের অবস্থা উদ্বেগজনক। দেশের শীর্ষস্থানীয় গলফার যুবরাজ সান্ধুর অবস্থানও অনেক নিচে। অভিজ্ঞদের মতে, প্রতিভার অভাব নেই, কিন্তু বড় লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা কমে গেছে।
আরামদায়ক অবস্থানে আটকে পড়া
ভারতের ঘরোয়া গলফ টুর্নামেন্টগুলো এখন বেশ লাভজনক। প্রফেশনাল গলফ ট্যুর অব ইন্ডিয়ার প্রতিটি প্রতিযোগিতায় বড় অঙ্কের পুরস্কার অর্থ থাকায় অনেক খেলোয়াড় দেশেই খেলে সন্তুষ্ট থাকছেন। বিদেশে গিয়ে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হওয়ার আগ্রহ কমে গেছে বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞরা।
গলফার এসএসপি চৌরাসিয়া ও শিব কাপুরের মতে, শুধুমাত্র দেশের ভেতরে খেললে আন্তর্জাতিক মানে উন্নতি সম্ভব নয়। নতুন প্রজন্মকে বিদেশে গিয়ে বড় টুর্নামেন্ট খেলতে হবে, নতুন পরিবেশে নিজেদের প্রমাণ করতে হবে।
শিব কাপুর বলেন, অনেকটা আগের জাপানি গলফারদের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঘরোয়া পর্যায়ে ভালো আয় থাকায় বিদেশে গিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার আগ্রহ কমে যায়। এতে একধরনের আত্মতুষ্টি তৈরি হয়।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার ওপর জোর
ভারতীয় গলফ প্রিমিয়ার লিগ এখন আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও প্রতিযোগিতা আয়োজন করছে। মরক্কো, দক্ষিণ আফ্রিকা, কঙ্গো ও মরিশাসে টুর্নামেন্ট আয়োজনের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
অভিজ্ঞদের মতে, শুধু পরিচিত মাঠে খেলে আন্তর্জাতিক মানে উন্নতি সম্ভব নয়। বিদেশের ভিন্ন ধরনের কোর্স ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে খেললেই একজন গলফার পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে সমস্যা শুধু মানসিকতায় নয়, অবকাঠামোগত দুর্বলতার কথাও উঠে এসেছে। অনেকের মতে, ভারতের অনুশীলন সুবিধা এখনও এশিয়ার সেরা গলফ কেন্দ্রগুলোর মতো উন্নত নয়।
তবু আশাবাদ হারাচ্ছেন না কেউ
দীর্ঘ আট বছর ধরে ভারতে অনুষ্ঠিত শীর্ষ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে কোনো ভারতীয় গলফার শিরোপা জিততে পারেননি। তবু গগনজিৎ ভুল্লার, শিব কাপুর ও করণদীপ কোচ্ছারের মতো অভিজ্ঞরা আশাবাদী।
তাদের বিশ্বাস, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে নতুন প্রজন্ম আরও পরিণত হয়ে উঠবে। বিদেশে গিয়ে কোয়ালিফাইং স্কুল খেলা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিলে ভারতীয় গলফ আবারও বড় মঞ্চে জায়গা করে নিতে পারবে।
শিব কাপুরের ভাষায়, প্রতিটি খেলাই উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যায়। ক্রিকেটের মতো গলফেও এমন সময় আসে। একসময় আবার ভারতীয় খেলোয়াড়রাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলো ছড়াবেন।
ভারতীয় গলফের দীর্ঘ খরা কাটাতে নতুন প্রজন্মের ওপরই এখন সবচেয়ে বেশি ভরসা
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















