০৭:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হলিউডের মোহ, লস অ্যাঞ্জেলেসের রোদ আর কুতুরের জাদুতে ডিওর ক্রুজ ২০২৭ মসলাদার গরুর মাংসের টাকো বাটি যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ড্রোন ব্যবহারের পথ খুলল চীন, বদলাল প্রতিরক্ষা আইন বাংলাদেশের লাওয়াছড়ায় বনে ছেড়ে দেওয়া ৯ ধীরলোরির ৭টিই মারা গেল ঘরে দুই শিশুর নিথর দেহ, পাশে বাবার মরদেহ—যশোরে হৃদয়বিদারক ঘটনা নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে দেশজুড়ে সব এফআইআর বাতিল সুপ্রিম কোর্টের বৃদ্ধার চোখে বিজয়ের দামি চশমা, মানবিকতায় মুগ্ধ তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর ভক্ত নেপালের ভয়াবহ বন্যায় জলবায়ু সংকটের দায় এড়াচ্ছে পশ্চিমা গণমাধ্যম? হারাল্ডের মৃত্যুর পর নরওয়েতে রাজতন্ত্রের সমর্থন বেড়ে ৭২ শতাংশ, নতুন রাজার শপথ গোপন তহবিলের নামে জবাবদিহি এড়ানোর সুযোগ নেই

ইরানের সঙ্গে আমেরিকার দ্বন্দ্ব: শক্তির সীমা নাকি কৌশলের ব্যর্থতা?

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র যদি একটি অর্থনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ, সামরিকভাবে চাপে থাকা রাষ্ট্রকে নিজের শর্তে আনতে না পারে, তাহলে প্রশ্নটা কেবল সামরিক শক্তির নয়—কূটনৈতিক দর্শনেরও। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ নীতিগত সংকট আসলে এখানেই। ওয়াশিংটন কখনও স্পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, তারা ইরানের আচরণ বদলাতে চায়, নাকি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই মুছে ফেলতে চায়।

এই দ্বৈত অবস্থানই গত চার দশকের বেশি সময় ধরে আমেরিকার ইরাননীতিকে জটিল ও আত্মবিরোধী করে রেখেছে। সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, গোপন আলোচনার পাশাপাশি প্রকাশ্য হুমকি—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলোচনার টেবিলে বসতে চেয়েছে, অন্যদিকে সেই একই শাসনব্যবস্থাকে অবৈধ আখ্যা দিয়েছে। ফলে আলোচনার প্রতিটি উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত এসে ঠেকেছে অবিশ্বাসের দেয়ালে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নীতিতে এই সংকট আরও প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে। একদিন তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দেন, পরদিনই বলেন আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে। কখনও তিনি ইরানি জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান, আবার কয়েকদিন পরেই সম্ভাব্য সমঝোতার মাধ্যমে “উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ”-এর প্রতিশ্রুতি দেন। এতে শুধু বার্তার অসঙ্গতিই প্রকাশ পায় না, বরং বোঝা যায় যুক্তরাষ্ট্র এখনও ঠিক করতে পারেনি তারা আসলে কী চায়।

ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি অনেক সহজ। দেশটির শাসকগোষ্ঠীর কাছে এই সংঘাত অস্তিত্বের প্রশ্ন। তারা বিশ্বাস করে, পরাজয় মানে শুধু ক্ষমতা হারানো নয়; বরং গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন। ফলে ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতাও তাদের বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ব্যর্থ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা রাজনৈতিক অস্বস্তি হতে পারে, কিন্তু তেহরানের জন্য সেটি টিকে থাকার লড়াই। এই অসম মানসিক অবস্থানই অনেক সময় ছোট শক্তিকে বড় শক্তির বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিত দৃঢ়তা দেয়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন উদাহরণ নতুন নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় একই দ্বিধায় ভুগেছিল। একদিকে কমিউনিজমের বিরুদ্ধে আদর্শিক যুদ্ধ, অন্যদিকে পারমাণবিক ভারসাম্য রক্ষার বাস্তব প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন বুঝতে বাধ্য হয়েছিল, বিরোধিতা থাকলেও আলোচনার বিকল্প নেই। কারণ কিছু সংকট কেবল শক্তি দিয়ে নয়, সমঝোতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

The Iran war and the limits of American power | Euractiv

ইরান ইস্যুতেও সেই বাস্তবতা বহুবার সামনে এসেছে। এমনকি কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত রিপাবলিকান নেতারাও গোপনে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি রাজনীতি এবং বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বিষয়গুলোতে ইরানকে উপেক্ষা করা কার্যত অসম্ভব।

বারাক ওবামা প্রশাসন ছিল ব্যতিক্রম। তারা অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছিল—ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা পছন্দ না হলেও, পারমাণবিক সংকট মোকাবিলায় সেই সরকারের সঙ্গেই কাজ করতে হবে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই পরমাণু চুক্তি হয়েছিল। চুক্তিটি অন্তত একটি বড় ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে এনেছিল: ইরানের দ্রুত পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের সম্ভাবনা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনেকের কাছে এই চুক্তি ছিল “ইসলামিক রিপাবলিক”-কে বৈধতা দেওয়ার সমান।

ট্রাম্প যখন ক্ষমতায় এসে সেই চুক্তি বাতিল করেন, তখন শুধু কূটনৈতিক কাঠামোই ভাঙেনি; ইরানের মধ্যপন্থী রাজনীতিও দুর্বল হয়ে পড়ে। কঠোরপন্থীরা আবার শক্তিশালী হয়, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি গতি পায়, আর শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন আবার সেই পুরনো সংকটে ফিরে আসে—চুক্তি করবে, নাকি সংঘাত বাড়াবে?

বাস্তবতা হলো, ইরানকে ঘিরে আমেরিকার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সামরিক নয়; কৌশলগত। একটি রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে আলোচনার অংশীদার এবং অবৈধ শত্রু হিসেবে দেখলে টেকসই নীতি তৈরি হয় না। আলোচনায় বসলে প্রতিপক্ষ কিছুটা বৈধতা পায়ই। আর যদি সেই বৈধতাকেই অস্বীকার করা হয়, তাহলে কূটনীতির জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ে।

আজকের পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন আবারও সমঝোতার দিকে ঝুঁকছে বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু সেই সমঝোতা যদি শেষ পর্যন্ত হয়, তাহলে সম্ভবত সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লাভ পাবে তেহরান। কারণ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে যে স্বীকৃতি তারা খুঁজেছে—যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠোর মহলের কাছ থেকেও—সেটিই হয়তো শেষ পর্যন্ত তাদের হাতে এসে যাবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হলিউডের মোহ, লস অ্যাঞ্জেলেসের রোদ আর কুতুরের জাদুতে ডিওর ক্রুজ ২০২৭

ইরানের সঙ্গে আমেরিকার দ্বন্দ্ব: শক্তির সীমা নাকি কৌশলের ব্যর্থতা?

০৯:২৩:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র যদি একটি অর্থনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ, সামরিকভাবে চাপে থাকা রাষ্ট্রকে নিজের শর্তে আনতে না পারে, তাহলে প্রশ্নটা কেবল সামরিক শক্তির নয়—কূটনৈতিক দর্শনেরও। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ নীতিগত সংকট আসলে এখানেই। ওয়াশিংটন কখনও স্পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, তারা ইরানের আচরণ বদলাতে চায়, নাকি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই মুছে ফেলতে চায়।

এই দ্বৈত অবস্থানই গত চার দশকের বেশি সময় ধরে আমেরিকার ইরাননীতিকে জটিল ও আত্মবিরোধী করে রেখেছে। সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, গোপন আলোচনার পাশাপাশি প্রকাশ্য হুমকি—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলোচনার টেবিলে বসতে চেয়েছে, অন্যদিকে সেই একই শাসনব্যবস্থাকে অবৈধ আখ্যা দিয়েছে। ফলে আলোচনার প্রতিটি উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত এসে ঠেকেছে অবিশ্বাসের দেয়ালে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নীতিতে এই সংকট আরও প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে। একদিন তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দেন, পরদিনই বলেন আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে। কখনও তিনি ইরানি জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান, আবার কয়েকদিন পরেই সম্ভাব্য সমঝোতার মাধ্যমে “উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ”-এর প্রতিশ্রুতি দেন। এতে শুধু বার্তার অসঙ্গতিই প্রকাশ পায় না, বরং বোঝা যায় যুক্তরাষ্ট্র এখনও ঠিক করতে পারেনি তারা আসলে কী চায়।

ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি অনেক সহজ। দেশটির শাসকগোষ্ঠীর কাছে এই সংঘাত অস্তিত্বের প্রশ্ন। তারা বিশ্বাস করে, পরাজয় মানে শুধু ক্ষমতা হারানো নয়; বরং গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন। ফলে ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতাও তাদের বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ব্যর্থ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা রাজনৈতিক অস্বস্তি হতে পারে, কিন্তু তেহরানের জন্য সেটি টিকে থাকার লড়াই। এই অসম মানসিক অবস্থানই অনেক সময় ছোট শক্তিকে বড় শক্তির বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিত দৃঢ়তা দেয়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন উদাহরণ নতুন নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় একই দ্বিধায় ভুগেছিল। একদিকে কমিউনিজমের বিরুদ্ধে আদর্শিক যুদ্ধ, অন্যদিকে পারমাণবিক ভারসাম্য রক্ষার বাস্তব প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন বুঝতে বাধ্য হয়েছিল, বিরোধিতা থাকলেও আলোচনার বিকল্প নেই। কারণ কিছু সংকট কেবল শক্তি দিয়ে নয়, সমঝোতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

The Iran war and the limits of American power | Euractiv

ইরান ইস্যুতেও সেই বাস্তবতা বহুবার সামনে এসেছে। এমনকি কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত রিপাবলিকান নেতারাও গোপনে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি রাজনীতি এবং বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বিষয়গুলোতে ইরানকে উপেক্ষা করা কার্যত অসম্ভব।

বারাক ওবামা প্রশাসন ছিল ব্যতিক্রম। তারা অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছিল—ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা পছন্দ না হলেও, পারমাণবিক সংকট মোকাবিলায় সেই সরকারের সঙ্গেই কাজ করতে হবে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই পরমাণু চুক্তি হয়েছিল। চুক্তিটি অন্তত একটি বড় ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে এনেছিল: ইরানের দ্রুত পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের সম্ভাবনা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনেকের কাছে এই চুক্তি ছিল “ইসলামিক রিপাবলিক”-কে বৈধতা দেওয়ার সমান।

ট্রাম্প যখন ক্ষমতায় এসে সেই চুক্তি বাতিল করেন, তখন শুধু কূটনৈতিক কাঠামোই ভাঙেনি; ইরানের মধ্যপন্থী রাজনীতিও দুর্বল হয়ে পড়ে। কঠোরপন্থীরা আবার শক্তিশালী হয়, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি গতি পায়, আর শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন আবার সেই পুরনো সংকটে ফিরে আসে—চুক্তি করবে, নাকি সংঘাত বাড়াবে?

বাস্তবতা হলো, ইরানকে ঘিরে আমেরিকার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সামরিক নয়; কৌশলগত। একটি রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে আলোচনার অংশীদার এবং অবৈধ শত্রু হিসেবে দেখলে টেকসই নীতি তৈরি হয় না। আলোচনায় বসলে প্রতিপক্ষ কিছুটা বৈধতা পায়ই। আর যদি সেই বৈধতাকেই অস্বীকার করা হয়, তাহলে কূটনীতির জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ে।

আজকের পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন আবারও সমঝোতার দিকে ঝুঁকছে বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু সেই সমঝোতা যদি শেষ পর্যন্ত হয়, তাহলে সম্ভবত সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লাভ পাবে তেহরান। কারণ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে যে স্বীকৃতি তারা খুঁজেছে—যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠোর মহলের কাছ থেকেও—সেটিই হয়তো শেষ পর্যন্ত তাদের হাতে এসে যাবে।