ভারতের ধানচাষকে কেন্দ্র করে করা অ্যামাজনের ৩ কোটি মার্কিন ডলারের কার্বন ক্রেডিট চুক্তি বিশ্বব্যাপী কার্বন বাজারে নতুন গতি আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই চুক্তিকে শুধু শিল্প খাত নয়, কৃষিকেও নির্গমন কমানোর বড় মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতের গুড রাইস অ্যালায়েন্সের সঙ্গে করা এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো ধানচাষে পানির ব্যবহার ও মিথেন গ্যাস নির্গমন কমানো। বায়ার-সমর্থিত এই উদ্যোগে জেনজিরো ও শেলের মতো প্রতিষ্ঠানও যুক্ত রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় হাজারো ক্ষুদ্র কৃষককে জলবায়ু-সহনশীল আধুনিক কৃষিপদ্ধতি ব্যবহারে সহায়তা করা হবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা ও সঠিক পুষ্টি প্রয়োগের মাধ্যমে ধানক্ষেত থেকে মিথেন নির্গমন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। বর্তমানে ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় চাল রপ্তানিকারক দেশ এবং দেশটির ৪২ থেকে ৪৪ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে ধানচাষ হয়। ফলে কৃষিখাত থেকে মিথেন নির্গমনে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৬ লাখ ৮৫ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমপরিমাণ নির্গমন কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কার্বন বাজারে নতুন বার্তা
এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ গবেষক বৈভব চতুর্বেদী এই চুক্তিকে “বড় ধরনের পদক্ষেপ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এটি প্রমাণ করতে পারে যে কার্বন বাজার শুধু শিল্পখাত নয়, কৃষির মাধ্যমেও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন সম্ভব করতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কৃষকরা বাস্তবে কতটা আর্থিক সুবিধা পান তার ওপর। মাঠপর্যায়ে কৃষি খাতে এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যয়বহুল। ফলে নিম্নআয়ের কৃষকদের হাতে অর্থ না পৌঁছালে এর মূল্য অনেকটাই কমে যাবে।
অন্যদিকে, অ্যামাজন ইতোমধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এর বড় অংশ যাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ডিজিটাল অবকাঠামো ও লজিস্টিক খাতে। এর আগে দেশটিতে আরও ৪ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে কার্বন নির্গমনও বাড়াতে পারে। তাই নির্গমন মোকাবিলায় কার্বন অফসেট পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হয়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

‘গ্রিনওয়াশ’ বিতর্ক
জলবায়ু কর্মী ও সাতত সম্পদা ক্লাইমেট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হারজিৎ সিং মনে করেন, এই ধরনের চুক্তি বড় কোম্পানিগুলোর জন্য নিজেদের নির্গমন আড়াল করার পথ তৈরি করতে পারে।
তাঁর ভাষায়, ভারতীয় ধানক্ষেতকে ব্যবহার করে অ্যামাজন তাদের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর সম্প্রসারণের দায় কমানোর সুযোগ পাচ্ছে। এতে পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর শিল্প নির্গমন কার্যত আড়াল হয়ে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে পানি সাশ্রয়ের মতো কিছু প্রযুক্তিগত সুবিধা এলেও এটি “দূষণকারীকে মূল্য দিতে হবে” — এই মূল নীতিকে স্পষ্টভাবে সামনে আনে না।
ধানচাষের পরিবেশগত চাপ
ধানচাষে শুধু মিথেন নির্গমন নয়, আরও নানা পরিবেশগত সমস্যা রয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে জমিতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার হয়, যা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ায়। পাশাপাশি রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটির স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি হয়। ফসল কাটার পর খড় পোড়ানো বায়ুদূষণের বড় উৎস।
ফ্লেম ইউনিভার্সিটির জননীতি বিভাগের অধ্যাপক অঞ্জল প্রকাশ বলেন, কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পগুলো যদি সতর্কভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে এগুলো উল্টো পানিনির্ভর ফসল চাষকে আরও লাভজনক করে তুলতে পারে। তাই কার্বন বাজার ও পানি সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা জরুরি।
নতুন আন্তর্জাতিক বাজারের ইঙ্গিত
কিছু বিশেষজ্ঞ আবার এই চুক্তিকে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার সম্প্রসারণের বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড পলিসির অধ্যাপক সুরঞ্জলি ট্যান্ডনের মতে, এটি সীমান্তপারের কার্বন ক্রেডিট ব্যবহারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে এবং ভবিষ্যতে ভারত ও চীনের মতো বাজারের মধ্যে সহযোগিতার পথও খুলে দিতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করেছেন, অতিরিক্ত কার্বন ক্রেডিট সুবিধা ধানচাষকে আরও লাভজনক করে তুললে পানি ব্যবহারের চাপ কমার বদলে বাড়তেও পারে।
অ্যামাজনের কার্বন চুক্তি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটি কৃষিখাতকে বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসার একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠছে।
অ্যামাজনের কার্বন চুক্তিকে ঘিরে ভারতের ধানচাষ, কৃষক আয় ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















