পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত ভেঙে পড়ায় ভারতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি ভয়াবহভাবে কমে গেছে। মার্চ ও এপ্রিলে দেশটির এলপিজি আমদানি গড়ে ৫০ শতাংশেরও বেশি কমেছে বলে জাহাজ চলাচল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এতে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভারত তার মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ সরবরাহ আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে। কিন্তু মার্চের শুরু থেকে ইরান-ওমানের মধ্যবর্তী এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে জাহাজ চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত, বর্তমানে তা নেমে এসেছে দৈনিক ১০টিরও কমে।
আমদানি অর্ধেকে নেমে এলো
পণ্যবাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসে ভারতের গড় এলপিজি আমদানি ছিল প্রায় ২০ লাখ টন। কিন্তু মার্চে তা কমে দাঁড়ায় ১১ লাখ টনে। এপ্রিল মাসে আরও কমে তা হয় মাত্র ৯ লাখ ৫০ হাজার টন।
এলপিজি সরবরাহে এই বড় ধাক্কার কারণে সরকারকে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাস সরবরাহ সীমিত করতে হয়েছে, যাতে রান্নার কাজে ব্যবহৃত ৩৩ কোটি পরিবারের সরবরাহ অক্ষুণ্ণ রাখা যায়। একই সঙ্গে গৃহস্থালি গ্রাহকদের সিলিন্ডার রিফিল বুকিংয়ের মধ্যকার ন্যূনতম সময়ও বাড়ানো হয়েছে।
বিকল্প উৎস খুঁজছে ভারত
সরবরাহ সংকট সামাল দিতে ভারতের শোধনাগারগুলো দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়া থেকে বিকল্প উৎসে এলপিজি সংগ্রহের উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা নয়টি এলপিজিবাহী ট্যাংকারও উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে ভারত সরকার।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়া সংকটের আগের তুলনায় দেশীয় এলপিজি উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে বর্তমানে ভারতের নিজস্ব উৎপাদন মোট চাহিদার প্রায় ৫৫ শতাংশ পূরণ করছে, যা আগে ছিল ৪০ শতাংশ। তবে এই বৃদ্ধি আমদানি ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে পারছে না।
চাহিদাও কমছে
সরবরাহ সংকটের প্রভাবে ভারতের দৈনিক এলপিজি ব্যবহারও কমে গেছে। আগে যেখানে দৈনিক ব্যবহার ছিল প্রায় ৯০ হাজার টন, বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৮০ হাজার টনে। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্য বলছে, এপ্রিল মাসে এলপিজি ব্যবহার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ২ শতাংশ কমে ২২ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। মার্চেও ব্যবহার ছিল প্রায় ২৪ লাখ টন, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ দশমিক ৮ শতাংশ কম।
স্বল্পমেয়াদে সংকট কাটছে না
ক্লেপলারের মডেলিং ও রিফাইনিং বিভাগের ব্যবস্থাপক সুমিত রিটোলিয়ার মতে, স্বল্পমেয়াদে ভারতের এলপিজি সরবরাহ পরিস্থিতি চাপে থাকবে। যদিও ভারত ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কিছু জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে পেরেছে, তবু পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
তাঁর মতে, মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া থেকে বেশি এলপিজি আসতে পারে। এতে আমদানিতে কিছুটা উন্নতি হলেও সামগ্রিক সরবরাহ পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত এবং চাহিদার ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ভারতের বার্ষিক এলপিজি ব্যবহার বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ টন। কিন্তু হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে দেশটির জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতির ওপর আরও বড় চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি সংকটে ভারতের এলপিজি আমদানি অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা চললেও সরবরাহ চাপ এখনো কাটেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















