কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানবজাতির জন্য একদিকে যেমন অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি তৈরি করছে ভয়াবহ ঝুঁকিও। সাবেক গুগল নির্বাহী মো গাওদাত মনে করেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছর বিশ্বকে এক “গভীর ডিস্টোপিয়া”র মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে, যদি এআই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে যুদ্ধ, নজরদারি ও লোভের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
গাওদাত একসময় গুগলের গবেষণা ও উদ্ভাবনী বিভাগ গুগল এক্সের প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা ছিলেন। সেখানে কাজ করার সময়ই তিনি বুঝতে পারেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন এক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে যা মানুষের সক্ষমতাকে অতিক্রম করতে পারে। তাঁর ভাষায়, মানুষ এমন “কৃত্রিম বুদ্ধিমান শিশু” তৈরি করছে, যা একসময় নিজেরাই আরও উন্নত হয়ে উঠবে।
ছেলের মৃত্যু বদলে দেয় জীবন
২০১৪ সালে চিকিৎসাগত ভুলে গাওদাতের ছেলে আলির মৃত্যু তাঁর জীবনকে আমূল বদলে দেয়। সেই শোক থেকেই তিনি সুখ, মানবতা ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেন। পরে তিনি ‘সলভ ফর হ্যাপি’সহ একাধিক বই লেখেন এবং এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা তৈরিতে সক্রিয় হন।

সম্প্রতি তাঁর জীবন ও কাজ নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘চেজিং ইউটোপিয়া’ নামের একটি চলচ্চিত্র। গাওদাত আশা করছেন, জলবায়ু সংকট নিয়ে আল গোরের ‘অ্যান ইনকনভিনিয়েন্ট ট্রুথ’ যেমন বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল, এই চলচ্চিত্রও তেমনি এআই নিয়ে বৈশ্বিক বিতর্ক তৈরি করবে।
এআইয়ের অস্ত্র প্রতিযোগিতা
গাওদাতের মতে, এআই এখন এমন এক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে, যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকতে চায় না। আইন, ব্যবসা, সামরিক কৌশল—সবখানেই দ্রুত এআই ব্যবহারের চাপ বাড়ছে। একটি দেশ যদি উন্নত স্বয়ংক্রিয় সামরিক প্রযুক্তি তৈরি করে, তাহলে অন্য দেশগুলোকেও একই পথে হাঁটতে হবে। ফলে বিশ্ব ধীরে ধীরে “যন্ত্রনির্ভর সিদ্ধান্তের” দিকে এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা এআই উন্নয়নকে আরও দ্রুততর করছে। এই প্রতিযোগিতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে উন্নয়ন থামানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

মধ্যবিত্তের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
গাওদাত মনে করেন, এআইয়ের কারণে সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে। বিশেষ করে সাদা-কলারের চাকরিগুলো দ্রুত ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাঁর মতে, মানুষ যদি আয় হারায়, তাহলে ব্যয়ও কমবে এবং পুরো অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে হয়তো মধ্যবিত্ত শ্রেণিই আর থাকবে না।
তাঁর মতে, প্রযুক্তিনির্ভর অল্প কয়েকজন ব্যক্তি বিপুল সম্পদ ও ক্ষমতার মালিক হবে, আর বাকি মানুষকে টিকে থাকার জন্য মৌলিক আয়ের মতো ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
নজরদারি রাষ্ট্রের আশঙ্কা
গাওদাতের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো রাষ্ট্রীয় নজরদারি। তিনি মনে করেন, জৈব অস্ত্র, সাইবার হামলা বা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের মতো ঝুঁকি মোকাবিলার অজুহাতে সরকারগুলো আরও কঠোর নজরদারির পথে যেতে পারে। তাঁর ভাষায়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে পৃথিবী এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছাতে পারে, যেখানে মানুষকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকতে হবে।
তবে সবকিছুর পরও তিনি পুরোপুরি হতাশ নন। তাঁর বিশ্বাস, এআই নিজে স্বভাবগতভাবে খারাপ নয়। মানুষ যেভাবে এটি ব্যবহার করবে, ভবিষ্যৎও সেভাবেই গড়ে উঠবে। তিনি বিশ্বনেতা, প্রযুক্তি কোম্পানি ও সাধারণ মানুষকে এখনই দায়িত্বশীল অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

গাওদাতের মতে, এখন এআই মূলত কেনাকাটা, নজরদারি, যুদ্ধ এবং গেমিংয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু এই প্রযুক্তিকে যদি রোগ নিরাময়, দারিদ্র্য কমানো ও মানবকল্যাণে কাজে লাগানো যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ এখনও বদলানো সম্ভব।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে মো গাওদাতের সতর্কবার্তা, যুদ্ধ ও নজরদারির ঝুঁকিতে এআই ভবিষ্যৎ
এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে সাবেক গুগল নির্বাহী মো গাওদাতের উদ্বেগ বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
এআই, মো গাওদাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুগল, প্রযুক্তি, বিশ্বরাজনীতি, নজরদারি, চাকরি সংকট, এআই যুদ্ধ, প্রযুক্তি ভবিষ্যৎ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















