বিশ্বশক্তির ইতিহাসে পতন কখনও একদিনে ঘটে না। তা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়—অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা, সামরিক অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং রাজনৈতিক আত্মপ্রবঞ্চনার মধ্য দিয়ে। সাম্প্রতিক ইরান-সংকটকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে ওয়াশিংটন একটি ভুল যুদ্ধের পথে হাঁটছে কি না; বরং আরও গভীর প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি এমন এক বৈশ্বিক কাঠামো ধরে রাখতে চাইছে, যার আর্থিক, সামরিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা যে বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল, তার মূল শক্তি ছিল অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং সামরিক প্রভাব। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে সেই একক আধিপত্য আর আগের মতো অটুট নেই। চীনের উত্থান, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন এক ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় প্রতিটি আন্তর্জাতিক সংঘাত আর কেবল আদর্শিক লড়াই নয়; তা হয়ে উঠছে সীমিত সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থানও মূলত এই বাস্তবতার প্রতিক্রিয়া। তাঁর সমর্থকদের বড় অংশ মনে করত, যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ যুদ্ধ, গণতন্ত্র রপ্তানির ব্যর্থতা এবং বিপুল সামরিক ব্যয়—এসব থেকে সরে এসে আমেরিকাকে নিজের অর্থনীতি ও সীমান্তে মনোযোগী হওয়া দরকার। “আমেরিকাকে আবার মহান করা” স্লোগানের পেছনে তাই কেবল জাতীয়তাবাদী আবেগ ছিল না; ছিল এক ধরনের কৌশলগত প্রত্যাহারের প্রত্যাশাও।
কিন্তু বাস্তব রাজনীতি প্রায়ই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিপরীত দিকে চলে যায়। ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা সেই বিপরীতমুখী প্রবণতার উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই নিজস্ব ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকার পুনর্গঠন করতে চায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক জড়িয়ে পড়া তার ঘোষিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ ইরানের মতো একটি বৃহৎ ও জটিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংঘাত কেবল সামরিক শক্তির প্রশ্ন নয়; তা অর্থনীতি, জোটরাজনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সক্ষমতারও পরীক্ষা।

ইতিহাস এখানে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বুঝতে পেরেছিল, পুরোনো বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ আর ধরে রাখা সম্ভব নয়। তারা ধীরে ধীরে উপনিবেশ ছেড়ে দেয়, যদিও সেই প্রক্রিয়া ছিল বেদনাদায়ক। কিন্তু সেই প্রত্যাহার শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। শক্তির সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা কখনও কখনও দুর্বলতা নয়; বরং তা দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার শর্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সংকটের বড় অংশ এখানেই। ওয়াশিংটন এখনো এমন এক সামরিক ও রাজনৈতিক উপস্থিতি বজায় রাখতে চায়, যার জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থ, প্রযুক্তি এবং জনসমর্থন। অথচ আমেরিকার ভেতরেই অবকাঠামোগত সংকট, ঋণের বোঝা, শিল্পহ্রাস এবং সামাজিক মেরুকরণ বাড়ছে। একটি রাষ্ট্র যখন নিজের অভ্যন্তরীণ স্থিতি নিশ্চিত না করেই বহির্বিশ্বে আধিপত্য বজায় রাখতে চায়, তখন সেই ব্যবধান একসময় বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। এশিয়া, আর্কটিক অঞ্চল কিংবা পশ্চিম গোলার্ধ—সব জায়গায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এখন নতুন শীতল যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতিও বজায় রাখতে হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, একটি দেশ কি একসঙ্গে এতগুলো কৌশলগত ফ্রন্ট দীর্ঘ সময় ধরে সামলাতে পারে?
ইরান-সংকট সেই সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। আধুনিক যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের প্রদর্শনী নয়; তা সরবরাহব্যবস্থা, অর্থনৈতিক স্থিতি এবং রাজনৈতিক সহনশীলতারও লড়াই। বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার, মিত্রদের ওপর নির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রস্তুতির চাপ যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে প্রতিটি নতুন সংঘাত তার সামগ্রিক সক্ষমতাকে ক্ষয় করছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আমেরিকার নৈতিক অবস্থান। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু যখন সামরিক পদক্ষেপগুলোকে অনেক দেশ নিজেদের নিরাপত্তার বদলে ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন সেই নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়। বৈশ্বিক নেতৃত্ব কেবল অস্ত্র দিয়ে টিকে থাকে না; তা বিশ্বাসের ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে।
অবশেষে প্রশ্নটি সাম্রাজ্যের পতন নিয়ে নয়; বরং পরিবর্তিত বিশ্বে অভিযোজনের সক্ষমতা নিয়ে। একটি রাষ্ট্র কখন শক্তি প্রয়োগ করবে, কোথায় সীমা টানবে এবং কোন দায়িত্ব ছাড়বে—এই সিদ্ধান্তগুলোই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রতিটি সংকটকে পুরোনো আধিপত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, তবে তার ব্যয় ক্রমশ বাড়বে। কিন্তু যদি সে বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন ভারসাম্য খুঁজে নিতে পারে, তবে হয়তো পতনের বদলে এক নতুন ভূমিকায় রূপান্তর সম্ভব।
ক্রিস্টোফার ক্যাল্ডওয়েল 


















