দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাংকে ঘিরে এক সময় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। পরিবারের কর সংকট, উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক এবং কারাদণ্ড—সব মিলিয়ে মনে করা হচ্ছিল, স্যামসাংয়ের ওপর লি পরিবারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের উত্থান এখন লি পরিবারকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক বছরে স্যামসাংয়ের প্রতিষ্ঠাতা পরিবার লি পরিবারের মোট সম্পদ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমানে তাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। এক বছর আগে যা ছিল প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। এর ফলে এশিয়ার ধনী পরিবারগুলোর তালিকায় তাদের অবস্থান এখন তৃতীয়।
সংকট থেকে পুনরুত্থান
২০২০ সালে স্যামসাংয়ের প্রভাবশালী প্রধান লি কুন-হির মৃত্যুর পর পরিবারটি বিশাল উত্তরাধিকার করের চাপে পড়ে। দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে এটিকে সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার করের একটি হিসেবে দেখা হয়। একই সময়ে তার ছেলে জে ওয়াই লি দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ড পান। সেই সময় অনেক বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন, পরিবারটি হয়তো স্যামসাংয়ের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে না।
কিন্তু পরিস্থিতি উল্টো দিকে মোড় নেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির বিস্ফোরক চাহিদার কারণে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বড় উত্থান শুরু হয়। এই বাজার বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটি হয়ে ওঠে স্যামসাং। ফলে কোম্পানির শেয়ারের মূল্য দ্রুত বাড়তে থাকে এবং পরিবারের সম্পদও বেড়ে যায়।
জে ওয়াই লির প্রত্যাবর্তন
এক সময় জনসমক্ষে খুব কম দেখা গেলেও এখন আবার সক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেখা যাচ্ছে জে ওয়াই লিকে। সম্প্রতি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একটি সেলফিতে তাকে দেখা যায়। গত এক বছরে তিনি ভারত, ভিয়েতনাম, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্র সফরেও অংশ নিয়েছেন।
বিশ্ব প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে তার একটি অনানুষ্ঠানিক ছবি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে স্যামসাং
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির বিস্তার এখন সেমিকন্ডাক্টর বাজারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। স্মার্টফোন থেকে ডেটা সেন্টার—সবখানেই উন্নত মেমোরি চিপের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্যামসাং বিপুল বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছর গবেষণা, উন্নয়ন ও অবকাঠামো খাতে ১১০ ট্রিলিয়ন ওনের বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এর লক্ষ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর চিপ বাজারে নিজেদের নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করা।
দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিতে স্যামসাংয়ের প্রভাব
স্যামসাং এখন শুধু একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নয়, দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কোম্পানিটির বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত আয় দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। গত এক দশকে এই প্রভাব আরও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক উত্থানের পেছনেও স্যামসাংয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে করপোরেট স্বচ্ছতা ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় আরও সংস্কারের দাবি উঠছে।
নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার কৌশল
লি পরিবারের সদস্যরা উত্তরাধিকার কর পরিশোধে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়েছেন। পরিবারের কিছু সদস্য শেয়ার বিক্রি করলেও জে ওয়াই লি মূলত ঋণ নিয়ে নিজের শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ার বড় ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর মধ্যে ভোটাধিকার ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রবণতা এখনও খুব শক্তিশালী।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, দক্ষিণ কোরিয়ার উচ্চ উত্তরাধিকার কর ব্যবস্থার মধ্যেও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটা সফলভাবে স্যামসাংয়ের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে।
স্যামসাং পরিবারের সম্পদ বৃদ্ধিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর সেমিকন্ডাক্টর বাজারের বড় উত্থান নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















