০৭:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
মণিপুরে নতুন সহিংসতার আগুন, সংঘাতে জড়াচ্ছে নাগা অধ্যুষিত পাহাড়ও লরা উলভার্টের ব্যাটে দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন স্বপ্ন, বিশ্বকাপের আগে দারুণ ছন্দে প্রোটিয়া অধিনায়ক ভারত ভাগের সীমারেখা: মানচিত্র, রাজনীতি ও বাস্তবতার সংঘাত ভারতের ‘ইনভেসিভ’ উদ্ভিদ আতঙ্ক, প্রকৃত সংকট কি আরও গভীরে? ভারতে জুনে প্রথম ‘বিগ ক্যাট সামিট’, অংশ নেবে ৯৫ দেশ ভারত বলছে, অবৈধ বাংলাদেশিদের ফেরাতে দ্রুত পদক্ষেপ দরকার শেখা ও ভুলে যাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন পদার্থ তৈরি, রোবট প্রযুক্তিতে খুলতে পারে নতুন দিগন্ত খাবারের চিন্তার শব্দ থেমে গেলে: নতুন ওষুধে বদলে যাচ্ছে স্থূলতা বোঝার ধরণ ঘোষণাপত্রের অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি হাম পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক, ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ১২ জনের

হোটেল কক্ষে ‘আত্মহত্যা’ নয়, ছিল পরিকল্পিত ধর্ষণ ও হত্যা: পিবিআই তদন্তে চাঞ্চল্যকর সত্য

রাজশাহীর একটি হোটেল কক্ষ থেকে তরুণ-তরুণীর ঝুলন্ত ও নিথর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা প্রথমে আত্মহত্যা বলেই ধরে নিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু দীর্ঘ তদন্ত শেষে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ এক সত্য—আত্মহত্যার নাটকের আড়ালে লুকিয়ে ছিল পরিকল্পিত সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যা।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সম্প্রতি প্রকাশিত ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শীর্ষক বইয়ে ঘটনাটির বিস্তারিত তুলে ধরেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল ভোরে রাজশাহীর বোয়ালিয়া এলাকার হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনালের ৩০৩ নম্বর কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া নাসরীন ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিজানুর রহমানের মরদেহ।

ঘটনার শুরুতে এটিকে আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সুমাইয়ার বাবা মো. আ. করিম অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। প্রায় ১০ মাস তদন্তের পর থানা পুলিশ “তথ্যগত ভুল” উল্লেখ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবেই তুলে ধরা হয়।

তবে রাষ্ট্রপক্ষ সেই প্রতিবেদনে আপত্তি জানালে আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্তভার দেয় পিবিআই রাজশাহীকে। এরপরই মামলার মোড় ঘুরতে শুরু করে।

ক্রাইমসিনে মিলেছিল অসংগতি

পিবিআইয়ের ছায়া তদন্তে একের পর এক অস্বাভাবিক তথ্য সামনে আসে। কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় ছয় ধরনের সিগারেটের ফিল্টার, অথচ নিহত দুজনের কেউই ধূমপায়ী ছিলেন না। মিজানুর রহমানের দুই হাত বাঁধা অবস্থায় ছিল। সুমাইয়ার মাথার বালিশে পাওয়া যায় রক্তমাখা হাতের ছাপ, যদিও নিহতদের কারও হাতেই রক্ত ছিল না।

তদন্তকারীরা আরও দেখতে পান, সুমাইয়ার জিন্স অস্বাভাবিকভাবে ওপরে তোলা ছিল। একই সঙ্গে মিজানের হাতে থাকা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আত্মহত্যামূলক পোস্ট দেওয়ার বাস্তবতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়।

এসব অসঙ্গতিই তদন্তকে নতুন পথে নিয়ে যায়। কললিস্ট, প্রযুক্তিগত তথ্য ও স্থানীয় সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে পিবিআই একজন সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করেন এবং আরও কয়েকজনের নাম প্রকাশ করেন।

২০২১ সালে ধর্ষণের শিকার ১৩২১, ধর্ষণ-হত্যা ৪৭

প্রতিশোধের নীলনকশা

তদন্তে উঠে আসে, ত্রিভুজ প্রেমকে কেন্দ্র করে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে কয়েকজন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা হোটেল কক্ষের জানালা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর মিজানুর রহমানকে মারধর করে হত্যা করা হয় এবং সুমাইয়াকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।

ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখাতে পরে মিজানের মরদেহ সুমাইয়ার ওড়না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এমনকি মিজানের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকেও আত্মহত্যামূলক পোস্ট দেওয়া হয়, যাতে পুরো ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

তদন্তে আরও জানা যায়, আসামিরা হোটেলের পেছনের মার্কেটের ছাদ ও জানালা ব্যবহার করে কক্ষে প্রবেশ ও বেরিয়ে যায়। এ ঘটনায় এক হোটেল বয়ের সহযোগিতার বিষয়ও সামনে আসে।

অভিযোগপত্র ও পিবিআইয়ের পর্যবেক্ষণ

সব তথ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে পিবিআই ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল মোট ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। মামলাটি তদন্ত করেন পিবিআই রাজশাহীর এসআই (নিরস্ত্র) মহিদুল ইসলাম।

পিবিআই তাদের প্রকাশনায় উল্লেখ করেছে, প্রাথমিক তদন্তে যেসব বিষয় উপেক্ষা করা হয়েছিল, সেগুলোই শেষ পর্যন্ত মামলার মূল রহস্য উন্মোচন করে। বন্ধ দরজাকে আত্মহত্যার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া, জানালা দিয়ে প্রবেশের সম্ভাবনা না খতিয়ে দেখা, হাত বাঁধা অবস্থার ব্যাখ্যা না খোঁজা এবং রক্তমাখা হাতের ছাপকে গুরুত্ব না দেওয়ার মতো ভুল তদন্তকে ভিন্ন পথে নিয়ে গিয়েছিল।

পিবিআই বলছে, এই মামলা আবারও দেখিয়েছে যে ক্রাইমসিনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ছাড়া সত্য উদঘাটন সম্ভব নয়। অনেক সময় আত্মহত্যা বলে মনে হওয়া ঘটনার আড়ালেও লুকিয়ে থাকতে পারে সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

জনপ্রিয় সংবাদ

মণিপুরে নতুন সহিংসতার আগুন, সংঘাতে জড়াচ্ছে নাগা অধ্যুষিত পাহাড়ও

হোটেল কক্ষে ‘আত্মহত্যা’ নয়, ছিল পরিকল্পিত ধর্ষণ ও হত্যা: পিবিআই তদন্তে চাঞ্চল্যকর সত্য

০৫:৪২:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬

রাজশাহীর একটি হোটেল কক্ষ থেকে তরুণ-তরুণীর ঝুলন্ত ও নিথর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা প্রথমে আত্মহত্যা বলেই ধরে নিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু দীর্ঘ তদন্ত শেষে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ এক সত্য—আত্মহত্যার নাটকের আড়ালে লুকিয়ে ছিল পরিকল্পিত সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যা।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সম্প্রতি প্রকাশিত ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শীর্ষক বইয়ে ঘটনাটির বিস্তারিত তুলে ধরেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল ভোরে রাজশাহীর বোয়ালিয়া এলাকার হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনালের ৩০৩ নম্বর কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া নাসরীন ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিজানুর রহমানের মরদেহ।

ঘটনার শুরুতে এটিকে আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সুমাইয়ার বাবা মো. আ. করিম অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। প্রায় ১০ মাস তদন্তের পর থানা পুলিশ “তথ্যগত ভুল” উল্লেখ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবেই তুলে ধরা হয়।

তবে রাষ্ট্রপক্ষ সেই প্রতিবেদনে আপত্তি জানালে আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্তভার দেয় পিবিআই রাজশাহীকে। এরপরই মামলার মোড় ঘুরতে শুরু করে।

ক্রাইমসিনে মিলেছিল অসংগতি

পিবিআইয়ের ছায়া তদন্তে একের পর এক অস্বাভাবিক তথ্য সামনে আসে। কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় ছয় ধরনের সিগারেটের ফিল্টার, অথচ নিহত দুজনের কেউই ধূমপায়ী ছিলেন না। মিজানুর রহমানের দুই হাত বাঁধা অবস্থায় ছিল। সুমাইয়ার মাথার বালিশে পাওয়া যায় রক্তমাখা হাতের ছাপ, যদিও নিহতদের কারও হাতেই রক্ত ছিল না।

তদন্তকারীরা আরও দেখতে পান, সুমাইয়ার জিন্স অস্বাভাবিকভাবে ওপরে তোলা ছিল। একই সঙ্গে মিজানের হাতে থাকা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আত্মহত্যামূলক পোস্ট দেওয়ার বাস্তবতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়।

এসব অসঙ্গতিই তদন্তকে নতুন পথে নিয়ে যায়। কললিস্ট, প্রযুক্তিগত তথ্য ও স্থানীয় সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে পিবিআই একজন সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করেন এবং আরও কয়েকজনের নাম প্রকাশ করেন।

২০২১ সালে ধর্ষণের শিকার ১৩২১, ধর্ষণ-হত্যা ৪৭

প্রতিশোধের নীলনকশা

তদন্তে উঠে আসে, ত্রিভুজ প্রেমকে কেন্দ্র করে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে কয়েকজন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা হোটেল কক্ষের জানালা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর মিজানুর রহমানকে মারধর করে হত্যা করা হয় এবং সুমাইয়াকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।

ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখাতে পরে মিজানের মরদেহ সুমাইয়ার ওড়না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এমনকি মিজানের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকেও আত্মহত্যামূলক পোস্ট দেওয়া হয়, যাতে পুরো ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

তদন্তে আরও জানা যায়, আসামিরা হোটেলের পেছনের মার্কেটের ছাদ ও জানালা ব্যবহার করে কক্ষে প্রবেশ ও বেরিয়ে যায়। এ ঘটনায় এক হোটেল বয়ের সহযোগিতার বিষয়ও সামনে আসে।

অভিযোগপত্র ও পিবিআইয়ের পর্যবেক্ষণ

সব তথ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে পিবিআই ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল মোট ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। মামলাটি তদন্ত করেন পিবিআই রাজশাহীর এসআই (নিরস্ত্র) মহিদুল ইসলাম।

পিবিআই তাদের প্রকাশনায় উল্লেখ করেছে, প্রাথমিক তদন্তে যেসব বিষয় উপেক্ষা করা হয়েছিল, সেগুলোই শেষ পর্যন্ত মামলার মূল রহস্য উন্মোচন করে। বন্ধ দরজাকে আত্মহত্যার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া, জানালা দিয়ে প্রবেশের সম্ভাবনা না খতিয়ে দেখা, হাত বাঁধা অবস্থার ব্যাখ্যা না খোঁজা এবং রক্তমাখা হাতের ছাপকে গুরুত্ব না দেওয়ার মতো ভুল তদন্তকে ভিন্ন পথে নিয়ে গিয়েছিল।

পিবিআই বলছে, এই মামলা আবারও দেখিয়েছে যে ক্রাইমসিনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ছাড়া সত্য উদঘাটন সম্ভব নয়। অনেক সময় আত্মহত্যা বলে মনে হওয়া ঘটনার আড়ালেও লুকিয়ে থাকতে পারে সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।