পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এতদিন মূলত জীবিত প্রাণীর বৈশিষ্ট্য হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু এবার বিজ্ঞানীরা এমন এক বিশেষ কৃত্রিম পদার্থ তৈরি করেছেন, যা নিজে নিজেই শিখতে পারে, নতুন আকার নিতে পারে, আবার পুরোনো আচরণ ভুলেও যেতে পারে। গবেষকদের দাবি, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতের রোবট প্রযুক্তি, কৃত্রিম অঙ্গ এবং অভিযোজিত যন্ত্র তৈরিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
ইউরোপের একদল গবেষক এই নতুন ধরনের পদার্থ তৈরি করেছেন, যাকে বলা হচ্ছে “মেটাম্যাটেরিয়াল”। এটি এমন এক বিশেষ পদার্থ, যার বৈশিষ্ট্য শুধু রাসায়নিক গঠন দিয়ে নয়, বরং এর ভেতরের কাঠামো ও বিন্যাস দিয়েও নির্ধারিত হয়। ফলে এটি সাধারণ পদার্থের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন আচরণ করতে পারে।
কীভাবে কাজ করে এই পদার্থ
গবেষকেরা একটি শৃঙ্খলাকৃতির কাঠামো তৈরি করেন, যেখানে একের পর এক ছোট ইউনিট যুক্ত ছিল। প্রতিটি ইউনিটে ছিল ক্ষুদ্র মোটর, কোণ মাপার সেন্সর এবং মাইক্রোকন্ট্রোলার। এই ইউনিটগুলো নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের বাঁকানোর ধরন বদলে ফেলতে পারে।
এর ফলে পুরো কাঠামো কখনও শক্ত ধাতব স্প্রিংয়ের মতো আচরণ করেছে, আবার কখনও রাবারের মতো নমনীয় হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানীরা এটিকে বিশেষ পদ্ধতিতে “শেখাতে” শুরু করেন। প্রথমে কাঠামোকে সোজা রাখা হয়, এরপর নির্দিষ্ট অংশে চাপ দিয়ে বিভিন্ন আকারে বাঁকানো হয়। প্রতিবার নতুন আকার তৈরি হওয়ার পর প্রতিটি ইউনিট নিজের অবস্থান বিশ্লেষণ করে এবং পরবর্তী ধাপে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে তা ঠিক করে নেয়।
ধীরে ধীরে এই কৃত্রিম পদার্থ কম ধাপে নতুন আকার নিতে শেখে। গবেষকদের ভাষায়, এটি প্রচলিত পদার্থের মতো স্থির নয়; বরং নতুন আকার শেখা, পুরোনো আকার ভুলে যাওয়া এবং একাধিক আচরণ একসঙ্গে আয়ত্ত করার ক্ষমতা রাখে।
‘লার্ন’ শব্দও বানিয়েছে
গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ছয়টি ইউনিটের একটি শৃঙ্খল কয়েকবার অনুশীলনের পর এক ধাপেই “ইউ” আকৃতি নিতে পেরেছে। আরও বড় একটি কাঠামো ধাপে ধাপে “এলইএআরএন” শব্দের প্রতিটি অক্ষরের আকৃতি তৈরি করেছে। প্রতিবার এটি পুরোনো আকার ভুলে গিয়ে নতুন আকার শিখেছে।
গবেষকদের মতে, এটি জীবিত প্রাণীর অভিযোজন ক্ষমতার একটি সরল কৃত্রিম সংস্করণের মতো। যদিও এটি মানুষের মস্তিষ্কের মতো জটিল নয়, তবুও আশপাশের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা দেখিয়েছে।
নিজেদের মধ্যে ‘কথা’ বলে ইউনিটগুলো
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রতিটি ইউনিটের পারস্পরিক যোগাযোগ। প্রথমদিকে প্রতিটি অংশ শুধু পাশের ইউনিটের তথ্য ব্যবহার করত। কিন্তু বড় কাঠামোয় এই সংকেত দুর্বল হয়ে পড়ায় শেখার গতি কমে যায়। পরে গবেষকেরা এমন ব্যবস্থা করেন যাতে প্রতিটি ইউনিট পাশের পাশাপাশি আরও দূরের ইউনিটের তথ্যও বুঝতে পারে। এতে পুরো কাঠামো দ্রুত নতুন আকার নিতে সক্ষম হয়।
এই পদ্ধতির মাধ্যমে ৪৮টি ইউনিটের একটি বড় কাঠামোকে বিড়ালের অবয়বে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। গবেষকদের মতে, এতে জটিল তথ্যপ্রবাহ বা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই স্থানীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করা সম্ভব হয়।
বস্তু আঁকড়ে ধরার ক্ষমতাও দেখিয়েছে
গবেষণার সময় বিজ্ঞানীরা আরও একটি বিস্ময়কর আচরণ লক্ষ্য করেন। একটি চলমান বস্তু ছয় ইউনিটের শৃঙ্খলের কাছে গেলে সেটি নিজে থেকেই বস্তুটিকে জড়িয়ে ধরে। পরে নির্দিষ্ট একটি অংশে সামান্য চাপ দিলেই আবার সেটি খুলে যায়।
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও উন্নত কৃত্রিম হাত-পা, নমনীয় রোবট এবং বাধা এড়িয়ে চলতে সক্ষম যন্ত্র তৈরি করা যেতে পারে। যদিও বর্তমানে এই প্রযুক্তি পরীক্ষাগার পর্যায়েই সীমাবদ্ধ, তবুও এটি অভিযোজিত রোবট প্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, একসময় এমন কৃত্রিম পদার্থ তৈরি হবে যা মানুষের মতো পরিবেশ বুঝে নিজের আচরণ পরিবর্তন করতে পারবে। আর সেই পথের গুরুত্বপূর্ণ এক ধাপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে এই নতুন আবিষ্কারকে।
শেখার ক্ষমতাসম্পন্ন কৃত্রিম পদার্থ তৈরি, রোবট প্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনা
শেখার ক্ষমতাসম্পন্ন কৃত্রিম পদার্থ
নতুন এক কৃত্রিম পদার্থ তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা, যা নিজে নিজেই শিখতে, আকার বদলাতে ও ভুলে যেতে পারে। রোবট প্রযুক্তিতে আসতে পারে বড় পরিবর্তন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















