কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন প্রজন্মের সাইবার প্রযুক্তি ‘মিথোস’ ঘিরে ভারতে বাড়ছে উদ্বেগ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ধরনের উন্নত এআই মডেল ভবিষ্যতে ভারতের ব্যাংকিং, আর্থিক ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, টেলিকম, এমনকি প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়, রিজার্ভ ব্যাংক, সিইআরটি-ইন এবং প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তৎপরতা শুরু করেছে।
ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সম্প্রতি বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান, রিজার্ভ ব্যাংক এবং সিইআরটি-ইনের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানে রিয়েল-টাইম সাইবার হুমকি শনাক্ত ও তথ্য বিনিময় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়। প্রযুক্তিমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবও ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব প্রতিরক্ষামূলক এআই সফটওয়্যার তৈরি করার আহ্বান জানান।
এআইয়ের নতুন ঝুঁকি কোথায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের এআই টুলগুলো মূলত তথ্য বিশ্লেষণ বা সহায়ক কাজ করত। কিন্তু ‘মিথোস’-এর মতো মডেল এখন নিজে পরিকল্পনা করতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তব নেটওয়ার্কে কাজও করতে সক্ষম। এ কারণেই এর ঝুঁকি আরও বড়।
ফ্র্যাক্টাল অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী শ্রীকান্ত ভেলামাকান্নি বলেন, আধুনিক এআই এখন শুধু প্রশ্নের উত্তর দেয় না, বরং নিজে নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে কাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতাও অর্জন করছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই “এজেন্সি” বা স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই ধরনের এআই খুব দ্রুত সফটওয়্যারের দুর্বলতা শনাক্ত করে হামলা চালাতে পারে। আগে যে কাজ করতে মাসের পর মাস লাগত, এখন তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্ভব হয়ে যেতে পারে। ফলে প্রতিরোধের সময়ও দ্রুত কমে যাচ্ছে।
ব্যাংকিং ও ডিজিটাল অবকাঠামো ঝুঁকিতে
ভারতের ব্যাংকিং খাত এখন বিশাল ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। দেশটিতে ইউপিআইয়ের সক্রিয় ব্যবহারকারী প্রায় ৫০ কোটি এবং প্রতি মাসে ২২.৬ বিলিয়ন লেনদেন সম্পন্ন হয়। একই সঙ্গে বহু ব্যাংক এখনও পুরোনো প্রযুক্তি ও সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পুরোনো অবকাঠামোই বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
এছাড়া ব্যাংক, ফিনটেক, পেমেন্ট গেটওয়ে ও তৃতীয় পক্ষের অ্যাপ্লিকেশন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকায় একটি দুর্বলতা দ্রুত পুরো নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এআই-চালিত হামলা হলে সেটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় সংক্রমণের মতো প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিরক্ষা খাতে বাড়তি আশঙ্কা
ভারতের সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক, রাডার ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও এখন সফটওয়্যারনির্ভর। তাই মিথোসের মতো প্রযুক্তি যদি শত্রুপক্ষের হাতে পৌঁছে যায়, তবে তা সামরিক অবকাঠামোর জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ধরনের এআই খুব দ্রুত সামরিক সফটওয়্যারের দুর্বলতা শনাক্ত করে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত করতে, লজিস্টিক চেইন ভেঙে দিতে কিংবা রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ ঘটাতে সক্ষম হতে পারে। সংঘাতের সময় এমন হামলা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
ভারতের করণীয় কী
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রচলিত সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিয়ে ভবিষ্যতের এই হুমকি মোকাবিলা সম্ভব নয়। এজন্য ভারতকে নিজস্ব “সার্বভৌম সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা” গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা, ব্যাংকিং ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে এআইভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সিইআরটি-ইন ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্কতা বাড়াতে, ঝুঁকিপূর্ণ নেটওয়ার্ক সীমিত করতে এবং এআই-নির্ভর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতের সাইবার যুদ্ধ হবে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের, যেখানে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও মেশিনগত গতিতে কাজ করতে হবে।
ভারতের ডিজিটাল নিরাপত্তায় নতুন এআই হুমকি, ব্যাংক ও প্রতিরক্ষা খাতে বাড়ছে উদ্বেগ
ভারতের সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে ‘মিথোস’ নামের উন্নত এআই প্রযুক্তি। ব্যাংকিং থেকে প্রতিরক্ষা—সবখানেই বাড়ছে ঝুঁকি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















