ওমান উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শুরু হওয়ার পরও ইরানের তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং হাজার মাইল দূরে ইন্দোনেশিয়ার রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের কাছে গোপনে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে সেই তেল এখনও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাচ্ছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের স্যাটেলাইট চিত্র ও জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ১৬ এপ্রিলের পর অন্তত ১৩টি ট্যাংকার এই ধরনের গোপন তেল স্থানান্তরে অংশ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরান এই পদ্ধতিতে তেল বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছে।
অবরোধের কারণে পারস্য উপসাগর থেকে নতুন চালানের পথ কঠিন হয়ে পড়লেও, আগে থেকেই সমুদ্রে থাকা তেলের চালান এখনও চীনসহ বিভিন্ন বাজারে পৌঁছাতে পারছে। ফলে তেহরানের অর্থপ্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, ইরানি পতাকাবাহী ছয়টি তেলভর্তি ট্যাংকার ছয়টি খালি জাহাজের পাশে অবস্থান নেয়। আরও সাতটি জাহাজ, যেগুলো ভুয়া পতাকা ব্যবহার করছিল বা যাদের মালিকানার তথ্য গোপন ছিল, সেগুলোকেও অন্য খালি ট্যাংকারের সঙ্গে দেখা গেছে।
তেল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাংকারট্র্যাকার্সের হিসাব অনুযায়ী, এসব জাহাজে মোট প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে যার মূল্য ২০০ কোটির বেশি ডলার হতে পারে।
রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জ বহু বছর ধরেই ইরানি তেলের গোপন বিনিময়কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনের পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, এখানে জাহাজে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে তেলের উৎস গোপন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তথ্য অনুযায়ী, চীন ইরানের মোট অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশের বেশি কিনে থাকে। ছাড়মূল্যে কেনা হলেও এই বেচাকেনা থেকে পাওয়া অর্থ ইরান সরকারের বাজেটের প্রায় অর্ধেক জোগান দেয়।
এ ধরনের গোপন স্থানান্তর শনাক্ত করার অন্যতম উপায় হলো স্যাটেলাইট নজরদারি। কারণ সংশ্লিষ্ট ট্যাংকারগুলো সাধারণত তাদের অবস্থান সম্প্রচার করে না। অনেক সময় একটি চালান গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে সমুদ্রে একাধিকবার জাহাজ বদল করে।
গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রিয়াউ অঞ্চলের আশপাশে প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল ইরানি তেলভর্তি ট্যাংকার অবস্থান করছে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে এই পরিমাণ প্রায় ৯ কোটি ব্যারেল ছিল।
উইন্ডওয়ার্ডের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মিশেল উইসে বকম্যান বলেন, “এখনও কিছু তেলের মজুত রয়েছে। কিন্তু নতুন সরবরাহ আসছে না।”
লন্ডনের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক পেত্রাস কাটিনাস বলেন, এসব গোপন লেনদেনের আর্থিক কাঠামো অত্যন্ত অস্পষ্ট। কিছু ক্রেতা আগাম অর্থ দেয়, আবার কেউ কেউ জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর পর মূল্য পরিশোধ করে।
অবরোধ শুরুর তিন দিন পর যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইরানি তেলবাহী জাহাজের বিরুদ্ধেও অভিযান সম্প্রসারণ করে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা ইরানকে সহায়তা করতে পারে এমন যেকোনো জাহাজ থামানোর ক্ষমতা এখন তাদের রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি দাবি করেন, “মার্কিন বাহিনীর কঠোর অবরোধের কারণে ৫০টির বেশি জাহাজ ফিরে যেতে বা বন্দরে ঢুকতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ সফল হয়েছে।”
তবে ওয়াশিংটন পোস্টের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়া জাহাজগুলোও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ছে কি না, সে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয়নি হোয়াইট হাউস।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক গ্রান্ট রামলি বলেন, সব ইরানি তেল চালান আটকে দিতে গেলে বিপুল সময় ও সম্পদের প্রয়োজন হবে। ফলে কোথায় কতটা চাপ প্রয়োগ করা হবে, সেটি কৌশলগত সিদ্ধান্তের বিষয়।
দুই সপ্তাহ আগে ভারত মহাসাগরে টিফানি ও ম্যাজেস্টিক এক্স নামের দুটি ট্যাংকারে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সেগুলোও রিয়াউ অঞ্চলের দিকেই যাচ্ছিল। উভয় জাহাজেই ইরানি তেল ছিল বলে জানিয়েছে ট্যাংকারট্র্যাকার্স।
এরপরও আরও পাঁচটি ইরানি পতাকাবাহী ট্যাংকার রিয়াউ অঞ্চলের কাছে পৌঁছেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, অন্তত একটি জাহাজ পরে খালি অবস্থায় পশ্চিমমুখে যাত্রা করেছে।
সাধারণত ওমান উপসাগর থেকে রিয়াউ অঞ্চলে যেতে জাহাজগুলো মালাক্কা প্রণালি ব্যবহার করে। এই সংকীর্ণ নৌপথে জাহাজগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে নিজেদের অবস্থান জানাতে হয়। ফলে স্বাভাবিক সময় ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা জাহাজগুলোকেও এখানে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইরানি ট্যাংকার মালাক্কা প্রণালি এড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার দিক ঘুরে লম্বক প্রণালি ব্যবহার করছে। এতে যাত্রাপথ দীর্ঘ হলেও নজরদারি এড়ানো সহজ হয়।
কেপলার তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, “লম্বক রুট কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি পরিকল্পিত অভিযোজনের পরবর্তী ধাপ।”
ইমোজেন পাইপার 


















