মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ঘিরে জ্বালানি সরবরাহ সংকট, খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা—এসব ইস্যুকে সামনে রেখে ফিলিপাইনের সেবুতে শুরু হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জোট আসিয়ানের শীর্ষ সম্মেলন। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস আগেই জানিয়েছিলেন, এবারের সম্মেলন হবে “সংক্ষিপ্ত ও বাস্তবমুখী”, যেখানে মূল গুরুত্ব পাবে অর্থনৈতিক সংকট ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা।
এবারের সম্মেলনে নতুন সদস্য হিসেবে তিমুর-লেস্তে যোগ দেওয়ায় আসিয়ানের সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১-তে। তবে জোটের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ।
জ্বালানি সংকট নিয়ে উদ্বেগ
ফিলিপাইনের সরকার মার্চ মাসে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান হামলার পর বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
প্রেসিডেন্ট মার্কোস বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো। তার মতে, আসিয়ান নেতাদের এখন একসঙ্গে বসে ঠিক করতে হবে কীভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলো একে অপরকে সহায়তা করতে পারে।
যদিও আসিয়ান অতীতে জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে নানা ঘোষণা দিয়েছে, বাস্তবে কার্যকর বাধ্যতামূলক কোনো ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। বহু পুরোনো ‘পেট্রোলিয়াম সিকিউরিটি এগ্রিমেন্ট’ থাকলেও সেটি কখনো কার্যকর হয়নি এবং এটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাভিত্তিক।
ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া থেরেসা লাজারো বলেন, সংকট মোকাবিলায় আসিয়ানের সমন্বয় কাঠামো আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তার ভাষায়, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে যে অঞ্চলটির বাইরের ঘটনাও আসিয়ানের ওপর তাৎক্ষণিক ও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা
সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে একটি যৌথ প্রতিক্রিয়া বিবৃতি প্রকাশের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে ফিলিপাইন। যদিও আনুষ্ঠানিক খসড়ার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, তবে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান থাকতে পারে।
বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে উত্তেজনা বাড়লে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মিয়ানমার নিয়ে বিভক্ত আসিয়ান
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার কার্যত আসিয়ানের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন। সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখলের পর দেশটিতে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ ও দমন-পীড়ন এখনো থামেনি।
সম্প্রতি জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর আসিয়ানের সঙ্গে “স্বাভাবিক সম্পর্ক” পুনঃস্থাপনের আশ্বাস দিয়েছেন। একই সময়ে গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চিকে কারাগার থেকে গৃহবন্দি অবস্থায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
তবে মিয়ানমারকে পুনরায় পূর্ণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নে আসিয়ানের সদস্যদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। থাইল্যান্ড “পর্যায়ক্রমিক সম্পৃক্ততা” নীতির কথা বললেও কিছু সদস্য দেশ এখনো কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
ফিলিপাইন সরকার সু চিকে গৃহবন্দি করার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং আসিয়ানের বিশেষ দূতকে তার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে অচলাবস্থা
সম্মেলনে সামুদ্রিক সহযোগিতা নিয়ে একটি ঘোষণা আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বহু প্রতীক্ষিত দক্ষিণ চীন সাগর আচরণবিধি চুক্তি এবারও চূড়ান্ত হচ্ছে না।
চীন ও আসিয়ান দেশগুলো দুই দশকের বেশি সময় ধরে এ নিয়ে আলোচনা চালালেও এখনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। ব্রুনেই, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের দাবি থাকা সত্ত্বেও চীন প্রায় পুরো দক্ষিণ চীন সাগরের মালিকানা দাবি করে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন কোনো বাধ্যতামূলক আইনি চুক্তিতে সম্মত হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং তারা রাজনৈতিক ঘোষণার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে।
জ্বালানি সংকট, মিয়ানমারের অস্থিরতা এবং দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধ—এই তিন বড় ইস্যুই এবারের আসিয়ান সম্মেলনের আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে। তবে বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছাতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক ঐকমত্য কতটা তৈরি হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্য সংকট মোকাবিলায় আসিয়ান সম্মেলনে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের আলোচনা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















