ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে প্রস্তাবিত ৯২ হাজার কোটি রুপির ‘গ্রেট নিকোবর আইল্যান্ড প্রকল্প’ ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বনাধিকার আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক ৫০ শতাংশ কোরাম পূরণ না করেই কয়েকটি গ্রামসভা থেকে প্রকল্পের জন্য বনভূমি হস্তান্তরের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে কলকাতা হাইকোর্টে বিচারাধীন।
দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দামান ও নিকোবর প্রশাসন আদালতে দাখিল করা এক হলফনামায় দাবি করেছে, মাত্র ২ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষের উপস্থিতিকেও তারা “যথাযথ কোরাম” হিসেবে বিবেচনা করেছে। অথচ বনাধিকার আইন বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্রীয় নিয়ম অনুযায়ী, কোনও গ্রামসভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট গ্রামের অন্তত অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ নারী থাকতে হয়।
কোন কোন গ্রামসভায় বৈঠক হয়েছিল
২০২২ সালের ১২ আগস্ট ক্যাম্পবেল বে, লক্ষ্মীনগর ও গোবিন্দনগর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় বিশেষ গ্রামসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েতের আওতায় মোট সাতটি গ্রামের প্রতিনিধিত্ব ছিল।
প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, ক্যাম্পবেল বে বৈঠকে ১০৫ জন, লক্ষ্মীনগরে ১৬৩ জন এবং গোবিন্দনগরে ৮১ জন অংশ নেন। তিনটি সভাতেই সর্বসম্মতভাবে প্রকল্পের পক্ষে প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং বনভূমি প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে ২০১১ সালের জনগণনার তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পবেল বে এলাকার মোট জনসংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৭৩৬ জন। সেখানে উপস্থিতির হার দাঁড়ায় মাত্র ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। লক্ষ্মীনগরে ১ হাজার ১০৭ জনের মধ্যে অংশ নেন ১৪ দশমিক ৭২ শতাংশ মানুষ। আর গোবিন্দনগরে ৬৭৬ জনের বিপরীতে উপস্থিতি ছিল ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
সব মিলিয়ে সাতটি গ্রামের মোট জনসংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৫১৯ জন। অথচ মাত্র ৩৪৯ জনের উপস্থিতিতে প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

হাইকোর্টে প্রশাসনের যুক্তি
হাইকোর্টে প্রশাসন দাবি করেছে, বনাধিকার আইন মেনে যথাযথ প্রক্রিয়াতেই বিশেষ গ্রামসভা আয়োজন করা হয়েছিল। তাদের বক্তব্য, আগাম নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং বৈঠকে “সঠিক কোরাম” নিশ্চিত করা হয়েছিল।
প্রশাসন আরও জানিয়েছে, গ্রামসভাগুলোতে স্থানীয় মানুষের বনাধিকার এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয় এবং পরে বনভূমি প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য সম্মতি দেওয়া হয়।
একদিনের নোটিশ নিয়েও প্রশ্ন
এই বৈঠকগুলোর জন্য মাত্র একদিন আগে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলেও আদালতে উঠে এসেছে। তবে প্রশাসন এটিকেও যথাযথ বলে দাবি করেছে।
একই সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আদিবাসী সম্প্রদায়কে বনাধিকার আইন প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ “অপ্রাসঙ্গিক”। কারণ, সাব-ডিভিশনাল লেভেল কমিটিতে তাদের “যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব” ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে মামলাকারীরা শুধু গ্রামসভার সিদ্ধান্ত নয়, সাব-ডিভিশনাল লেভেল কমিটির গঠন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, প্রকল্প অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়ায় বনাধিকার আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে।
গ্রেট নিকোবর প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের এই বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে বন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শহর উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে শুরু থেকেই পরিবেশ, বনভূমি এবং আদিবাসী অধিকার নিয়ে প্রকল্পটির বিরোধিতা করে আসছেন পরিবেশবিদ ও অধিকারকর্মীরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















