এলপিজি আমদানির চাপ কমাতে এবার নতুন জ্বালানি পরিকল্পনার পথে হাঁটছে ইন্দোনেশিয়া। দেশটির সরকার ভর্তুকিযুক্ত ৩ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের বিকল্প হিসেবে কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস বা সিএনজি ব্যবহারের পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই রূপান্তর কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন হবে বিপুল বিনিয়োগ, উন্নত অবকাঠামো এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
ইন্দোনেশিয়ার জ্বালানিমন্ত্রী বাহলিল লাহাদালিয়া জানিয়েছেন, সরকার এখনো সিএনজি ভর্তুকি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। তার দাবি, এলপিজির তুলনায় সিএনজির দাম প্রায় ৩০ শতাংশ কম হতে পারে, কারণ এর কাঁচামাল দেশীয় উৎস থেকেই পাওয়া সম্ভব। এতে আমদানির প্রয়োজন কমবে এবং পরিবহন ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় বছরে প্রায় ৮ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন এলপিজি ব্যবহার হয়। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন মাত্র ১ দশমিক ৬ থেকে ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে বিশাল অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এই চাপ সামাল দিতে সরকার আগে থেকেই নগরভিত্তিক গ্যাস নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং কয়লা গ্যাসিফিকেশনের মাধ্যমে ডাইমিথাইল ইথার উৎপাদনের মতো বিকল্প ভাবছিল।
বাড়ছে ভর্তুকির চাপ
২০২৬ সালের বাজেটে সরকার ৩ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের ভর্তুকির জন্য ৮০ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন রুপিয়া বরাদ্দের পরিকল্পনা করেছে। তবে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, ব্যবহার বাড়তে থাকলে এই ব্যয় ৮৫ থেকে ৯৫ ট্রিলিয়ন রুপিয়ায় পৌঁছাতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সিএনজি বিকল্প হিসেবে সামনে এলেও বাস্তবতা অনেক জটিল। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রোল্যান্ড বার্গার সাউথইস্ট এশিয়ার জ্বালানি বিভাগের প্রধান ডিটার বিলেন বলেছেন, সিএনজি সাশ্রয়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে আমদানিকৃত এলপিজির দামের ওপর এবং অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় কতটা কম রাখা যায় তার ওপর।
তার মতে, শুধু জ্বালানির মূল দাম নয়, বরং গ্যাস কমপ্রেশন, সিলিন্ডার উৎপাদন, পরিবহন ও রিফিলিং ব্যবস্থার ব্যয়ও হিসাব করতে হবে। অথচ সরকার এখনো এসব বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করেনি।
![]()
উচ্চ ব্যয় ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, একটি পরিবারের জন্য সিএনজি ব্যবহারের পূর্ণ সেটআপে সিলিন্ডার, রেগুলেটর এবং চুলার পরিবর্তনসহ ৪৫ থেকে ১৭০ ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। অথচ বর্তমানে ভর্তুকিযুক্ত ৩ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহকদের খরচ হয় মাত্র প্রায় ২০ হাজার রুপিয়া।
অবকাঠামো ব্যয় আরও বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় গ্যাস কোম্পানি পিজিএনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মাত্র ১৪টি সিএনজি ডিপো পরিচালনা করছে, যা প্রায় ২ হাজার ২০০টি যানবাহনকে সেবা দেয়। কিন্তু দেশজুড়ে গৃহস্থালি পর্যায়ে সিএনজি পৌঁছাতে হলে প্রয়োজন হবে ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের জ্বালানি অর্থনীতিবিদ মুতিয়া ইউস্তিকা বলেছেন, বাস্তবে সিএনজির সরবরাহ ব্যবস্থা আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। কারণ উচ্চচাপ গ্যাস সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ধরনের ইস্পাত সিলিন্ডার প্রয়োজন, যার দাম সাধারণ এলপিজি সিলিন্ডারের তুলনায় অনেক বেশি।
তিনি আরও বলেন, এলপিজির তুলনায় সিএনজি অত্যন্ত উচ্চচাপে সংরক্ষণ করতে হয় এবং এটি প্রাকৃতিক অবস্থায় গন্ধহীন। ফলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় কঠোর নিরাপত্তা প্রটোকল নিশ্চিত করা জরুরি।
পাইলট প্রকল্পের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ ও শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, একসঙ্গে পুরো দেশে সিএনজি চালুর বদলে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করা উচিত। এতে ব্যয়, নিরাপত্তা ও সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা সহজ হবে।
ইন্দোনেশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব লিকুইড অ্যান্ড কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস কোম্পানিজের মহাসচিব থমাস নুরহাকিম বলেছেন, দেশটির বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। তবে পরিকল্পনা হতে হবে বাস্তবসম্মত ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য।
তার মতে, পাইপলাইন সুবিধা নেই এমন এলাকায় মোবাইল সিএনজি বা এলএনজি স্টোরেজ ব্যবহার করে সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হলে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি ও নীতিগত স্থিরতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ইন্দোনেশিয়ায় এলপিজির বিকল্প সিএনজি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিপুল বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















