ভারতজুড়ে তথাকথিত ‘ইনভেসিভ অ্যালিয়েন স্পিসিজ’ বা বহিরাগত আগ্রাসী উদ্ভিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অভিযান ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্যে এসব উদ্ভিদ শনাক্ত, মানচিত্রভুক্ত এবং অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে পরিবেশবিদদের একাংশ বলছেন, শুধু গাছ কেটে ফেললেই প্রকৃতি আগের অবস্থায় ফিরবে—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। বরং এই উদ্ভিদ বিস্তারের পেছনে বহু দশকের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন দায়ী।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রসোপিস জুলিফ্লোরা, ল্যান্টানা কামারা এবং সেনা স্পেকটাবিলিসের মতো উদ্ভিদকে এখন বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্প্রতি তামিলনাড়ুর একটি আদালত প্রসোপিস জুলিফ্লোরাকে রাজ্যজুড়ে হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে। সরকারি হিসাবে ৩২ জেলার ৫১৭টি গ্রাম থেকে এই উদ্ভিদ অপসারণের তথ্যও সামনে এসেছে।
কিন্তু পরিবেশবিদ সুপ্রভা সেশনের মতে, প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই উদ্ভিদগুলো ছড়িয়ে পড়ার আগেই ভূমির অবস্থা কী ছিল এবং কোন পরিবর্তন তাদের টিকে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে।
উপনিবেশবাদ থেকে কৃষি বিপ্লব
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের বনভূমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। ব্রিটিশ আমলে বন উজাড়, চা-কফি-রাবার বাগান সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্যিক বন ব্যবস্থাপনার কারণে বহু প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়। পরে রাস্তা নির্মাণ, খনি, রাসায়নিক কৃষি ও নগরায়ণ সেই ক্ষয় আরও বাড়ায়।
ওয়েনাড়ের মতো এলাকায় বনভূমির প্রান্তভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরই ল্যান্টানা কামারার বিস্তার দ্রুত বাড়তে শুরু করে। গবেষকদের মতে, জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়ার পর তৈরি হওয়া শূন্যস্থানই এসব উদ্ভিদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
প্রসোপিস জুলিফ্লোরাকে ১৮৭৭ সালে ভারতে আনা হয়েছিল একটি পরিবেশগত পরীক্ষার অংশ হিসেবে। প্রথমদিকে এটি বিমান থেকে বীজ ছড়িয়ে রোপণ করা হয়। পরে গবাদিপশুর মাধ্যমে তা আরও বিস্তৃত হয়। এরপর আসে ‘গ্রিন রেভল্যুশন’ বা সবুজ বিপ্লব। সেচব্যবস্থা, রাসায়নিক সার ও গভীর নলকূপের ব্যবহার বাড়তে থাকে। এর ফলে কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও ভূগর্ভস্থ পানির সংকট এবং অনাবাদি জমির পরিমাণ বাড়ে। গবেষকদের মতে, এই পরিবর্তিত মাটি ও জলব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই প্রসোপিস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
![]()
পরিবর্তিত জলবায়ু ও রাসায়নিক চাপ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত নাইট্রোজেন, রাসায়নিক দূষণ ও ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে বাস্তুতন্ত্র বদলে দিচ্ছে। ভারতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া ব্যবহার এবং বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন জমা হওয়ার কারণে কিছু উদ্ভিদ দ্রুত বাড়ার সুযোগ পাচ্ছে।
একই সঙ্গে ভারতে প্রায় ৫০ কোটি গবাদিপশুর চারণচাপ বন ও উন্মুক্ত জমিতে স্থায়ী প্রভাব ফেলছে। এতে সহজে খাওয়া যায় এমন উদ্ভিদ কমে যাচ্ছে, আর কাঁটাযুক্ত বা রাসায়নিকভাবে সুরক্ষিত উদ্ভিদ টিকে থাকছে বেশি।
পরিবেশবিদদের মতে, এই উদ্ভিদগুলোকে শুধু ‘শত্রু’ হিসেবে দেখলে পুরো সংকট বোঝা সম্ভব নয়। কারণ এগুলো অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তিত পরিবেশের প্রতিক্রিয়া হিসেবেও দেখা দিচ্ছে।
পুনরুদ্ধার কি শুধু গাছ কাটায় সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু যান্ত্রিকভাবে উদ্ভিদ অপসারণ করলেই পরিবেশ পুনরুদ্ধার হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে আবারও একই উদ্ভিদ ফিরে আসে। কারণ মূল সমস্যা থেকে যায়—মাটির গুণগত পরিবর্তন, পানির প্রবাহ, রাসায়নিক দূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো উদ্ভিদ অপসারণ করা যাবে না। বরং স্থানীয় পরিবেশ, সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্য বিবেচনায় ধীরে, পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও দীর্ঘমেয়াদি তদারকি ছাড়া প্রকৃত পুনরুদ্ধার সম্ভব নয় বলেও মত বিশেষজ্ঞদের।
তাদের আশঙ্কা, যদি মূল কারণগুলো মোকাবিলা না করা হয়, তাহলে ভারত তার সংরক্ষণ প্রচেষ্টার বড় অংশ ব্যয় করবে শুধু লক্ষণ দূর করতে গিয়ে, অথচ প্রকৃত সংকট থেকে যাবে অমীমাংসিত।
ভারতে ইনভেসিভ উদ্ভিদ সংকট ও পরিবেশ পরিবর্তন
ভারতে আগ্রাসী উদ্ভিদ অপসারণের উদ্যোগ নিয়ে নতুন বিতর্ক। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল সংকট পরিবেশগত পরিবর্তন ও ভূমি ব্যবস্থাপনায়।
ভারতজুড়ে আগ্রাসী উদ্ভিদ অপসারণ অভিযান বাড়ছে। কিন্তু গবেষকদের মতে, শুধু গাছ কেটে নয়, পরিবেশগত পরিবর্তনের মূল কারণ মোকাবিলা করেই প্রকৃতি রক্ষা সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















