১২:২৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬
বিএনপি নেতার ছেলেকে ইয়াবাসহ আটকের পর উত্তেজনা, ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ রাজ্যপালের সিদ্ধান্তে ভেঙে গেল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা, সরলেন না মমতা ৭১৫ কোটি টাকার ক্রয় প্রস্তাবে অনুমোদন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ব্যয় অমিত শাহ: যেভাবে বদলে দিলেন বাংলার নির্বাচনী মানচিত্র ইন্দোনেশিয়ায় এলপিজির বদলে সিএনজি পরিকল্পনা, প্রয়োজন হতে পারে শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ জ্বালানি সংকট ও মিয়ানমার ইস্যুতে উত্তপ্ত আসিয়ান সম্মেলন ঈদ কেনাকাটায় রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে দোকান-শপিংমল চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তিতে দোষী দুই কর্মকর্তা, যুক্তরাজ্যে প্রথম বড় রায় রাশিয়ার যুদ্ধের জন্য লোক পাঠানোর অভিযোগে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞায় বাংলাদেশি ট্রাভেল এজেন্সি ইরানের তেল রপ্তানি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, কিন্তু সমুদ্রপথে এখনও চলছে গোপন বেচাকেনা

অমিত শাহ: যেভাবে বদলে দিলেন বাংলার নির্বাচনী মানচিত্র

অবশেষে পশ্চিমবঙ্গকে গেরুয়া রঙে রাঙাতে সক্ষম হলো বিজেপি। ৪ মে ঘোষিত ফলাফলে দলটির এই বড় জয়ের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, যা প্রায় নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ভারতের রাজনীতিতে এমন ঘটনা বিরল, আর পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি রাজ্যে তো আরও বেশি, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় রাজনৈতিক প্রবণতার বাইরে নিজস্ব ধারা বজায় থেকেছে।

এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন অমিত শাহ। ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সাফল্যের পেছনে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত ও ব্যক্তিগতভাবে নিয়ন্ত্রিত।

কলকাতাভিত্তিক বিজেপির এক শীর্ষ নেতা জানান, “তিনি ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন, একটি মূল টিম গড়ে তুলেছেন, পুরো সংগঠন কাঠামো তদারকি করেছেন এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন এনেছেন।”

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সময় থেকে বাংলায় দক্ষিণপন্থী রাজনীতির যে স্বপ্ন ছিল, তা বহু বছর ধরেই বাধার মুখে পড়েছে। প্রথমে কংগ্রেস, পরে বামফ্রন্ট এবং শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস—সবাই জনমানসে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল কল্যাণমূলক রাজনীতি, আঞ্চলিক আবেগ ও সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে।

কিন্তু অমিত শাহ বুঝেছিলেন, শুধুমাত্র দলবদলকারী নেতাদের ভরসায় বা প্রচারের ঝড়ে ভেসে বিজেপি আর এগোতে পারবে না। তিনি এটাও উপলব্ধি করেন যে বাংলার সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব না দিলে সাফল্য আসবে না।

এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল দিল্লিতে। একের পর এক কৌশলগত বৈঠকে প্রতিটি কেন্দ্রকে বিশ্লেষণ করা হয় তথ্যভিত্তিক পদ্ধতিতে। বিজেপি নেতাদের ‘মাছ-ভাত’ খেতে পাঠানো হয় সাধারণ বাঙালি পরিবারের কাছে, যাতে এই ধারণা ভাঙা যায় যে দলটি বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির বিরোধী।

প্রতিটি আসনের ভোটের ইতিহাস বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। কোথাও কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ক্ষোভ, কোথাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ, আবার কোথাও সরকারি কর্মচারীদের ক্ষোভ—সব কিছুই আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়।

ভূপেন্দ্র যাদবসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে মাঠে নামানো হয়। ত্রিপুরা, আসামসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাংলা ভাষাভাষী নেতাকর্মীদের এনে সাংগঠনিক সমন্বয় জোরদার করা হয়।

তবে পুরো প্রচারযন্ত্র ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে। রাত গভীর পর্যন্ত পর্যালোচনা বৈঠক চলত, প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করা হতো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কৌশল পাল্টানো হতো। পুরো প্রচারাভিযান অনেকটা করপোরেট ধাঁচের অভিযানের মতো পরিচালিত হয়েছে।

দিল্লিতে বাংলা ভাষাভাষী কর্মীদের নিয়ে কল সেন্টার গড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণাও চালানো হয়।

তবে শুধু তথ্য-পরিসংখ্যান দিয়ে বাংলার ভোট জেতা যায় না। এখানে প্রতীকী বার্তাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই অমিত শাহ গঙ্গাসাগর ও কপিল মুনি আশ্রম সফর করেন, যা বিজেপিকে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অংশ হিসেবে তুলে ধরার কৌশল ছিল বলে দলীয় নেতারা মনে করেন।

মাঠপর্যায়েও কৌশলে পরিবর্তন আনা হয়। বাইরের তারকা নেতাদের বদলে বুথভিত্তিক স্থানীয় নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়। নারীদের নিরাপত্তা, শিল্পের স্থবিরতা, দুর্নীতির অভিযোগ—এসব ইস্যু সামনে আনা হয় পরিকল্পিতভাবে।

অমিত শাহ নিজেও একের পর এক জেলা সফর করেন। তার সভা ও রোডশোগুলো ছিল শুধু শক্তি প্রদর্শনের জন্য নয়, বরং ভোটের প্রবণতা বোঝারও একটি মাধ্যম।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য সপ্তম বেতন কমিশন বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে আরও স্বাধীনতা দেওয়ার মতো প্রতিশ্রুতিও প্রচারে গুরুত্ব পায়।

বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় মতুয়া সম্প্রদায়কেও। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এই জনগোষ্ঠীর জন্য শিবির খোলা হয়, যাতে তারা নাগরিকত্ব সনদ বা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ পায়।

শেষ পর্যন্ত ২৯৩ সদস্যের বিধানসভায় বিজেপি ২০৬টি আসনে জয় পায়, যা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল দেখিয়েছে যে বাঙালি ভোটাররাও জাতীয় রাজনৈতিক প্রবণতার প্রভাবের বাইরে নন, যদি স্থানীয় সমস্যা ও বৃহত্তর জাতীয় বয়ানকে একসঙ্গে তুলে ধরা যায়।

তবে এখন প্রশ্ন হলো, এই মডেল দীর্ঘমেয়াদে টিকবে কি না। কারণ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বরাবরই শাসকদের বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

তবুও আপাতত এটুকু স্পষ্ট যে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনের কৃতিত্ব অনেকটাই অমিত শাহের কৌশলী পরিকল্পনার ফল।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

বিএনপি নেতার ছেলেকে ইয়াবাসহ আটকের পর উত্তেজনা, ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ

অমিত শাহ: যেভাবে বদলে দিলেন বাংলার নির্বাচনী মানচিত্র

১২:০৪:০৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬

অবশেষে পশ্চিমবঙ্গকে গেরুয়া রঙে রাঙাতে সক্ষম হলো বিজেপি। ৪ মে ঘোষিত ফলাফলে দলটির এই বড় জয়ের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, যা প্রায় নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ভারতের রাজনীতিতে এমন ঘটনা বিরল, আর পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি রাজ্যে তো আরও বেশি, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় রাজনৈতিক প্রবণতার বাইরে নিজস্ব ধারা বজায় থেকেছে।

এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন অমিত শাহ। ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সাফল্যের পেছনে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত ও ব্যক্তিগতভাবে নিয়ন্ত্রিত।

কলকাতাভিত্তিক বিজেপির এক শীর্ষ নেতা জানান, “তিনি ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন, একটি মূল টিম গড়ে তুলেছেন, পুরো সংগঠন কাঠামো তদারকি করেছেন এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন এনেছেন।”

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সময় থেকে বাংলায় দক্ষিণপন্থী রাজনীতির যে স্বপ্ন ছিল, তা বহু বছর ধরেই বাধার মুখে পড়েছে। প্রথমে কংগ্রেস, পরে বামফ্রন্ট এবং শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস—সবাই জনমানসে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল কল্যাণমূলক রাজনীতি, আঞ্চলিক আবেগ ও সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে।

কিন্তু অমিত শাহ বুঝেছিলেন, শুধুমাত্র দলবদলকারী নেতাদের ভরসায় বা প্রচারের ঝড়ে ভেসে বিজেপি আর এগোতে পারবে না। তিনি এটাও উপলব্ধি করেন যে বাংলার সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব না দিলে সাফল্য আসবে না।

এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল দিল্লিতে। একের পর এক কৌশলগত বৈঠকে প্রতিটি কেন্দ্রকে বিশ্লেষণ করা হয় তথ্যভিত্তিক পদ্ধতিতে। বিজেপি নেতাদের ‘মাছ-ভাত’ খেতে পাঠানো হয় সাধারণ বাঙালি পরিবারের কাছে, যাতে এই ধারণা ভাঙা যায় যে দলটি বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির বিরোধী।

প্রতিটি আসনের ভোটের ইতিহাস বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। কোথাও কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ক্ষোভ, কোথাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ, আবার কোথাও সরকারি কর্মচারীদের ক্ষোভ—সব কিছুই আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়।

ভূপেন্দ্র যাদবসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে মাঠে নামানো হয়। ত্রিপুরা, আসামসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাংলা ভাষাভাষী নেতাকর্মীদের এনে সাংগঠনিক সমন্বয় জোরদার করা হয়।

তবে পুরো প্রচারযন্ত্র ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে। রাত গভীর পর্যন্ত পর্যালোচনা বৈঠক চলত, প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করা হতো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কৌশল পাল্টানো হতো। পুরো প্রচারাভিযান অনেকটা করপোরেট ধাঁচের অভিযানের মতো পরিচালিত হয়েছে।

দিল্লিতে বাংলা ভাষাভাষী কর্মীদের নিয়ে কল সেন্টার গড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণাও চালানো হয়।

তবে শুধু তথ্য-পরিসংখ্যান দিয়ে বাংলার ভোট জেতা যায় না। এখানে প্রতীকী বার্তাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই অমিত শাহ গঙ্গাসাগর ও কপিল মুনি আশ্রম সফর করেন, যা বিজেপিকে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অংশ হিসেবে তুলে ধরার কৌশল ছিল বলে দলীয় নেতারা মনে করেন।

মাঠপর্যায়েও কৌশলে পরিবর্তন আনা হয়। বাইরের তারকা নেতাদের বদলে বুথভিত্তিক স্থানীয় নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়। নারীদের নিরাপত্তা, শিল্পের স্থবিরতা, দুর্নীতির অভিযোগ—এসব ইস্যু সামনে আনা হয় পরিকল্পিতভাবে।

অমিত শাহ নিজেও একের পর এক জেলা সফর করেন। তার সভা ও রোডশোগুলো ছিল শুধু শক্তি প্রদর্শনের জন্য নয়, বরং ভোটের প্রবণতা বোঝারও একটি মাধ্যম।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য সপ্তম বেতন কমিশন বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে আরও স্বাধীনতা দেওয়ার মতো প্রতিশ্রুতিও প্রচারে গুরুত্ব পায়।

বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় মতুয়া সম্প্রদায়কেও। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এই জনগোষ্ঠীর জন্য শিবির খোলা হয়, যাতে তারা নাগরিকত্ব সনদ বা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ পায়।

শেষ পর্যন্ত ২৯৩ সদস্যের বিধানসভায় বিজেপি ২০৬টি আসনে জয় পায়, যা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল দেখিয়েছে যে বাঙালি ভোটাররাও জাতীয় রাজনৈতিক প্রবণতার প্রভাবের বাইরে নন, যদি স্থানীয় সমস্যা ও বৃহত্তর জাতীয় বয়ানকে একসঙ্গে তুলে ধরা যায়।

তবে এখন প্রশ্ন হলো, এই মডেল দীর্ঘমেয়াদে টিকবে কি না। কারণ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বরাবরই শাসকদের বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

তবুও আপাতত এটুকু স্পষ্ট যে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনের কৃতিত্ব অনেকটাই অমিত শাহের কৌশলী পরিকল্পনার ফল।