মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার আগ্রহ ও চাপ উত্তর ইউরোপের ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে গ্রিনল্যান্ড, ফারো দ্বীপপুঞ্জ এবং ফিনল্যান্ডের অল্যান্ড অঞ্চলে। ডেনমার্কের অধীন এই অঞ্চলগুলো এখন আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দিকে এগোতে চাইছে।
বর্তমানে গ্রিনল্যান্ড ও ফারো দ্বীপপুঞ্জ নিজেদের অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ বিষয় পরিচালনা করলেও পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির বড় অংশ এখনো কোপেনহেগেনের নিয়ন্ত্রণে। তবে সাম্প্রতিক আলোচনায় নতুন এক কাঠামোর কথা উঠে এসেছে, যেখানে এই অঞ্চলগুলোকে ধীরে ধীরে প্রায়-রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হতে পারে। যদিও তা এখনই পূর্ণ স্বাধীনতায় রূপ নিচ্ছে না।
নর্ডিক কাউন্সিলে নতুন ভূমিকার পরিকল্পনা

উত্তর ইউরোপের প্রধান রাজনৈতিক ফোরাম নর্ডিক কাউন্সিলে গ্রিনল্যান্ড, ফারো দ্বীপপুঞ্জ ও অল্যান্ড অঞ্চলকে আলাদা ও সমমর্যাদার অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। বর্তমানে তারা ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদলের অংশ হিসেবে থাকে। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে তারা নিজস্ব প্রতিনিধিদল গঠন করতে পারবে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের খুঁটিনাটি নির্ধারণে পাঁচটি নর্ডিক দেশ ও তিনটি অঞ্চল থেকে কূটনীতিকদের নিয়ে একটি কমিশন এপ্রিলের মাঝামাঝি কাজ শুরু করেছে। যদিও এটি কাগজে-কলমে সীমিত পরিবর্তন বলে মনে হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন এর প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বেশি। এতে ভবিষ্যতে অলিম্পিক গেমসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে স্বতন্ত্র প্রতিনিধিত্বের পথ খুলে যেতে পারে।
ট্রাম্পের প্রভাব ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
নর্ডিক কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহ, রাশিয়া ও চীনের বাড়তি সক্রিয়তা এবং উত্তর মেরু অঞ্চলে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর প্রতিযোগিতা পরিস্থিতিকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। একসময় কম উত্তেজনার এলাকা হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চল এখন আন্তর্জাতিক কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
৫৭ হাজার মানুষের গ্রিনল্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরেই ডেনমার্ক থেকে আলাদা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। তবে ট্রাম্পের সরাসরি আগ্রহ ও সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের আশঙ্কা আপাতত স্বাধীনতার গতি কিছুটা মন্থর করেছে বলে কূটনীতিকরা মনে করছেন। অন্যদিকে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষের ফারো দ্বীপপুঞ্জ অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রস্তুত হলেও এতদিন পূর্ণ স্বাধীনতার বিষয়ে দ্বিধায় ছিল। এখন সেখানকার ইউনিয়নপন্থী দলও ডেনমার্কের সঙ্গে “সম্পূর্ণ নতুন সম্পর্কের মডেল” নিয়ে এগোতে সম্মত হয়েছে।

নতুন সাংবিধানিক সম্পর্কের খোঁজে
আলোচনায় একটি “কমপ্যাক্ট অব ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন” মডেলও উঠে এসেছে। এতে গ্রিনল্যান্ড ও ফারো দ্বীপপুঞ্জ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হবে, তবে প্রতিরক্ষা বা সামরিক স্থাপনার মতো বিষয়ে ডেনমার্ককে বিশেষ অধিকার দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় কয়েকটি দ্বীপ রাষ্ট্রের অনুরূপ ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। কারণ সাংবিধানিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে কিছু নর্ডিক কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলছেন, গ্রিনল্যান্ডের প্রশাসনিক সক্ষমতা আদৌ আরও বড় আন্তর্জাতিক দায়িত্ব নেওয়ার মতো প্রস্তুত কি না।
উত্তর ইউরোপে নতুন বাস্তবতা
গত কয়েক বছরে উত্তর ইউরোপের পুরোনো কূটনৈতিক ভারসাম্যও বদলে গেছে। সুইডেন ও ফিনল্যান্ড ন্যাটোতে যোগ দিয়েছে, আইসল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিষয়ে গণভোটের ঘোষণা দিয়েছে এবং নরওয়েতেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে ঝোঁক বাড়ছে। ফলে প্রথমবারের মতো পাঁচটি নর্ডিক দেশ একই সঙ্গে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আওতায় আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় প্রতিরক্ষা, কৌশল ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়াতে নর্ডিক দেশগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের আলোচনা জোরদার হচ্ছে। সেই বৃহত্তর পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবেই গ্রিনল্যান্ড ও ফারো দ্বীপপুঞ্জের নতুন অবস্থান নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















