ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বহুদিনের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়ে বড় জয় পেয়েছে নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসকে সরিয়ে রাজ্যের ক্ষমতায় উঠেছে বিজেপি। একই সময়ে আসামেও টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করছে দলটি। তবে এই জয় শুধু বিজেপির শক্তি বৃদ্ধির গল্প নয়, বরং দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা জনঅসন্তোষেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের এই ফলাফলকে ভারতের সাম্প্রতিক রাজনীতির অন্যতম বড় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে কলকাতায় বিশাল জনসভায় নরেন্দ্র মোদি তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ কেলেঙ্কারি এবং বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলেছিলেন। তার সেই আক্রমণাত্মক প্রচারণা শেষ পর্যন্ত বড় নির্বাচনী সাফল্যে রূপ নেয়। বিজেপি রাজ্যে ৪৫ শতাংশের বেশি ভোট এবং দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন জিতে নেয়।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই সাফল্যের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। দীর্ঘদিনের শাসনে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও কর্তৃত্ববাদী আচরণের অভিযোগ বাড়ছিল। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছিল প্রবল। পাশাপাশি শিল্প ও বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক হতাশাও তৈরি হয়েছিল। বিজেপি এই অসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে।
বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত ও হিন্দু ভোটারদের বড় অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ধর্মীয় বিভাজনের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক
তবে নির্বাচনকে ঘিরে বড় ধরনের বিতর্কও তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে লাখ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, মুসলিম, নারী ও দলিত ভোটারদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়েছে, যারা মূলত তৃণমূলের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। বিজেপি অবশ্য বলছে, আগের ভোটার তালিকায় অনিয়ম ছিল বলেই এই পরিবর্তন প্রয়োজন হয়েছিল।
নির্বাচনের সময় কেন্দ্রীয় বাহিনীর বড় উপস্থিতি এবং বিরোধী প্রার্থীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও উঠেছে। ভোটের পরও বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। এসব কারণে নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

দক্ষিণ ভারতেও পালাবদল
শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, দক্ষিণ ভারতেও বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। তামিলনাড়ুতে এম কে স্ট্যালিনকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হওয়া বিজয়। মাত্র দুই বছরের পুরোনো দল নিয়ে তার এই সাফল্য দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তরুণ ও শহুরে ভোটারদের সমর্থনই তাকে এগিয়ে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে কেরালায় দীর্ঘদিনের কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে প্রায় অর্ধশতাব্দীর মধ্যে প্রথমবার ভারতের কোনো রাজ্যে কমিউনিস্ট সরকার থাকছে না।
মোদির জন্য নতুন সুযোগ, নাকি নতুন চ্যালেঞ্জ
এই নির্বাচনের পর বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। বর্তমানে নির্বাচিত আইনসভা থাকা ৩১টি রাজ্য ও অঞ্চলের মধ্যে ২২টিতে বিজেপি বা তাদের মিত্ররা ক্ষমতায় রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার পর রাজ্যভিত্তিক এই সাফল্য মোদির জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে নির্বাচনের আরেকটি বার্তাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ভারতের ভোটাররা এখন ক্ষমতাসীনদের প্রতি দ্রুত বিরক্ত হয়ে উঠছেন। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার কারণে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কাও সামনে এসেছে। ফলে বর্তমান জয় সত্ত্বেও আগামী দিনে বিজেপির জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ কমছে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















