মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন করে অনিশ্চয়তার দিকে মোড় নিচ্ছে। কয়েকদিনের নাটকীয় উত্তেজনার পর আবারও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতকে আলাদা করে টার্গেট করার ঘটনায় নতুন কূটনৈতিক ও সামরিক হিসাব-নিকাশ সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সচল করতে একটি বিশেষ উদ্যোগ ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু মাত্র দুই দিনের মাথায় সেই পরিকল্পনা স্থগিত হয়ে যায়। একই সময়ে ইরান আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই হামলাকে বড় ধরনের ঘটনা হিসেবে দেখাতে চায়নি। এর মধ্যেই আবারও সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে।
অচলাবস্থা ভাঙার চেষ্টা

তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে ইরানের তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও ওয়াশিংটন দ্রুত বড় ধরনের ফল আশা করেছিল, বাস্তবে পরিস্থিতি ততটা নাটকীয় হয়নি।
ইরানের অর্থনীতি চাপে থাকলেও দেশটি এখনো বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি হয়নি। ফলে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা কাটাতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন পরিকল্পনা নেয়। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ দুটি আমেরিকান পতাকাবাহী জাহাজকে নিরাপদে পার করাতে সক্ষম হলেও অধিকাংশ আন্তর্জাতিক জাহাজ এখনো ঝুঁকির কারণে চলাচল এড়িয়ে যাচ্ছে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক হামলায় আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির একটি ট্যাংকার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার একটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
কেন আমিরাতকে টার্গেট করল ইরান
বিশ্লেষকদের মতে, এবার ইরান ইচ্ছাকৃতভাবেই আমিরাতকে আলাদা করে নিশানা বানিয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সব সদস্য দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও এবার মূল আঘাত গেছে আমিরাতের দিকে।

এর পেছনে দুটি বড় কারণ দেখা হচ্ছে। প্রথমত, ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে আমিরাতকে দেখা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব আরও বাড়াতে চাইছে তেহরান।
২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করে আমিরাত। এরপর থেকে দুই দেশের প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক দ্রুত গভীর হয়েছে। চলমান যুদ্ধে ইসরায়েল আমিরাতকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উন্নত সেন্সর ও লেজার প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করছে বলেও জানা গেছে।
উপসাগরে নতুন বিভাজন
এই সংঘাতের মধ্যেই সৌদি আরব ও আমিরাতের সম্পর্কেও টানাপোড়েন বাড়ছে। সম্প্রতি তেল উৎপাদন নিয়ে মতবিরোধের জেরে ওপেক ছাড়ার ঘোষণা দেয় আমিরাত। সুদান, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থানের পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আমিরাতের কিছু বিশ্লেষক এমনকি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা আরব লীগ থেকেও দূরে সরে যাওয়ার আলোচনা তুলেছেন। যদিও বাস্তবে এমন পদক্ষেপ এখনই সম্ভাব্য নয়, তবু এটি আঞ্চলিক রাজনীতিতে গভীর বিভক্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে চাইছে ইরান। সৌদি আরব এখন সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। অন্যদিকে আমিরাত হামলার জবাব চায়। এই দুই ভিন্ন অবস্থানকে সামনে এনে উপসাগরীয় জোটে চাপ তৈরি করতে চাইছে তেহরান।
শান্তির পথ এখনো অনিশ্চিত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার আলোচনা চললেও স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা এখনো দূরের বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। হরমুজ প্রণালির অবরোধ সাময়িকভাবে শিথিল করার আলোচনা থাকলেও পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ এখনো গভীর।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার বদলে আরও দীর্ঘ ও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















