সমুদ্রের গভীর অন্ধকারে ডুবে থাকা স্পার্ম তিমিরা নিজেদের মধ্যে যে শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগ করে, সেই রহস্য এখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে। নতুন এক প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা এখন রিয়েল টাইমে তিমিদের এই ‘কথোপকথন’ অনুসরণ করতে পারছেন। এই কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে একটি স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের রোবট, যা তিমির শব্দ শুনে তাদের পিছু নিতে সক্ষম।
তিমির ভাষা: ক্লিকের গোপন সংকেত
স্পার্ম তিমি তাদের চলাচল ও শিকার ধরার জন্য বিশেষ ধরনের ক্লিক শব্দ ব্যবহার করে। পাশাপাশি তারা ছন্দবদ্ধ ক্লিকের ধারাবাহিকতা তৈরি করে, যাকে ‘কোডা’ বলা হয়, যা তাদের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করা হয়। যদিও বহু বছর আগে থেকেই জানা ছিল যে তিমিরা শব্দ করে, কিন্তু তাদের গভীর ডুব দেওয়ার অভ্যাসের কারণে এই যোগাযোগ পুরোপুরি বোঝা কঠিন ছিল।
রোবটের কাজের ধরন
নতুন এই আন্ডারওয়াটার গ্লাইডারটি চারটি হাইড্রোফোনের মাধ্যমে তিমির শব্দ শনাক্ত করে। শব্দ শনাক্ত করার পর এর সফটওয়্যার নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রোবটটিকে সেই দিকেই চালিত করে। ফলে এটি তিমির চলাচল অনুসরণ করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাদের কাছাকাছি থাকতে পারে।
এই গ্লাইডারটি খুব ধীরে চলাচল করে, কখনো ডুবে যায় আবার কখনো ভেসে ওঠে। এটি মোটরচালিত নয়, বরং পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলতে থাকে। ফলে এটি দীর্ঘ সময় ধরে নীরবে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
নতুন প্রযুক্তির বড় পরিবর্তন
আগে তিমি পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রগুলো কয়েক দিনের মধ্যেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত বা স্থির অবস্থানে থাকায় তিমি দূরে চলে গেলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কিন্তু এই নতুন রোবট পানির নিচেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং রিয়েল টাইমে তিমির গতিপথ অনুসরণ করতে পারে।

এর ফলে বিজ্ঞানীরা এখন একই তিমি বা তিমির দলের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারবেন। এতে তাদের সামাজিক আচরণ, সমন্বয় এবং পরিবেশের প্রতি প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া যাবে।
তিমির শেখার প্রক্রিয়া ও মানব প্রভাব
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মা ও বাচ্চা তিমির সম্পর্কও বোঝা সম্ভব হবে। বিজ্ঞানীরা দেখতে পারবেন কীভাবে ছোট তিমিরা তাদের মায়ের কাছ থেকে শব্দের ধরন শেখে।
এছাড়া মানুষের তৈরি শব্দ, যেমন জাহাজ চলাচল বা সমুদ্রের নির্মাণ কাজের প্রভাবেও তিমিরা কীভাবে তাদের যোগাযোগ পরিবর্তন করে, সেটিও বিশ্লেষণ করা যাবে। এই তথ্য ভবিষ্যতে পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
তবে এই প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। রোবটটি তিমির শব্দের দিক শনাক্ত করতে পারলেও সঠিক অবস্থান নির্ধারণে এখনো পুরোপুরি সফল নয়। এছাড়া নির্দিষ্ট সময় পরপর রোবটটিকে ভেসে উঠে তথ্য আদান-প্রদান করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণে কিছুটা বাধা সৃষ্টি করে।
তবুও বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই প্রযুক্তি পৃথিবীর আরেকটি বুদ্ধিমান প্রাণীর যোগাযোগ পদ্ধতি বোঝার পথে বড় অগ্রগতি এনে দিয়েছে।
সমুদ্রের গভীরে চলা এই নীরব অনুসন্ধান হয়তো একদিন আমাদের সামনে তিমির ভাষার সম্পূর্ণ নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















