তাইওয়ানের জন্য পরিকল্পিত প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্রচুক্তিকে ঘিরে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই অস্ত্রচুক্তি এখন চীনের সঙ্গে আলোচনায় একটি “গুরুত্বপূর্ণ দরকষাকষির হাতিয়ার” হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাঁর এই মন্তব্যের পর তাইওয়ানের নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান কতটা স্থির, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে তাইওয়ান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রস্তাবিত এই প্যাকেজে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র, অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মূল উদ্দেশ্য ছিল চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপের বিরুদ্ধে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করা।
চীনের সঙ্গে সমঝোতার ইঙ্গিত
বেইজিং সফরের সময় ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এই অস্ত্রচুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, চুক্তিটি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে এবং এর ভবিষ্যৎ অনেকটাই চীনের আচরণের ওপর নির্ভর করছে।

ট্রাম্পের ভাষায়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য “খুব ভালো একটি দরকষাকষির উপকরণ”। যদিও তিনি স্পষ্ট করে বলেননি, চীনের কাছ থেকে বিনিময়ে কী চান। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প চীনের কাছ থেকে মার্কিন কৃষিপণ্য ও শিল্পপণ্যের বড় আকারের ক্রয় নিশ্চিত করতে চাইছেন।
এই অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতর থেকেই দেওয়া পূর্ববর্তী আশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন অনেকে। মার্কিন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা এর আগে বলেছিলেন, তাইওয়ানের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অটল।
তাইওয়ানের উদ্বেগ বাড়ছে
ট্রাম্পের বক্তব্যের পর তাইওয়ান দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের দপ্তর জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের নীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে তারা মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বারবার আশ্বাস পেয়েছে।
তাইওয়ান সরকার আরও বলেছে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মতো তারাও নিজেদের প্রতিরক্ষা জোরদারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে। চীনের সামরিক চাপকে অঞ্চলটির প্রধান অস্থিতিশীলতার কারণ বলেও উল্লেখ করেছে তারা।
তবে রাজনৈতিকভাবে এই পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট লাইয়ের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। কারণ, তিনি বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিরোধীরা এখন দাবি করছে, ওয়াশিংটনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলেই তাইওয়ান এমন অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু তাইওয়ান
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ট্রাম্পকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাইওয়ান ইস্যুই বর্তমানে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁর ভাষায়, এটি ভুলভাবে পরিচালিত হলে দুই দেশের সম্পর্ক “অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে” পৌঁছাতে পারে।
ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি শির বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। এমনকি তিনি বলেন, তাইওয়ান সম্পর্কে এখন তিনি “প্রায় অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি জানেন”।
একই সঙ্গে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, তিনি চাইলে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও সরাসরি কথা বলতে পারেন। এমন কোনো যোগাযোগ হলে তা ১৯৭৯ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বর্তমান প্রেসিডেন্টের প্রথম সরাসরি যোগাযোগ হতে পারে, যা বেইজিংয়ের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই কৌশল উল্টো ফলও দিতে পারে। অস্ত্রচুক্তি অনুমোদন দিলে চীন ক্ষুব্ধ হতে পারে, আবার চুক্তি আটকে রাখলে মার্কিন কংগ্রেস থেকেই তাইওয়ানের পক্ষে চাপ বাড়তে পারে।
তাইওয়ান নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান আরও বিতর্ক তৈরি করেছে তাঁর আরেক মন্তব্যে। তিনি দাবি করেন, তাইওয়ান যুক্তরাষ্ট্রের চিপ শিল্প “ছিনিয়ে নিয়েছে” এবং দ্বীপটির উচিত পরিস্থিতি “শান্ত রাখা”। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় তাইওয়ানের বর্তমান অবস্থা বজায় থাকুক, অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার পথে যেন তারা না এগোয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব মন্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, চীনের উপস্থাপিত দৃষ্টিভঙ্গি ট্রাম্পের ওপর কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। আর সেটিই এখন তাইপের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















